ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে। গতকালের নির্বাচনে মোটা দাগে বড় কোনো সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও আগের তিন ধাপের মতো অধিকাংশ উপজেলার ভোটকেন্দ্রে ছিল ভোটার খরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও তা উল্লেখযোগ্য ছিল না। অন্যদিকে কিছু কিছু কেন্দ্রে জাল ভোট প্রদান, ব্যালটে প্রকাশ্যে সিল মারা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর এক প্রার্থীর সমর্থকদের আনন্দ মিছিলে গুলিতে ওই প্রার্থীর এক তরুণ সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, চতুর্থ ধাপে ভোট পড়েছে ৩৩.৩৪ শতাংশ। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান তিনি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, চতুর্থ ধাপের ভোটে ২৬টি জেলার ৬০টি উপজেলায় নির্বাচন হয়েছে। এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের তিন পদে ৭২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মোট ৫ হাজার ১৪৬টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছে। মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪৩ লাখ ৫৭ হাজার ৮২০ জন। তিন পদে পাঁচ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্য চেয়ারম্যান পদে এক, ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিন এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে একজন নির্বাচিত হয়েছেন।
কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘এ পর্যন্ত ২ হাজার ৮৯ কেন্দ্রের তথ্য পেয়েছি। এতে ভোট পড়েছে ৩৪.৩৩ শতাংশ। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ মোট ২৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করেছেন। ২১ জনকে জরিমানা করা হয়েছে। ভৈরব উপজেলায় একটা ঘটনা ঘটেছে। সেখানে একটা ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা হয়েছে, সেটা খুলেও ফেলেছিল দুর্বৃত্তরা। ফলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল।’ সিইসি আরও বলেন, ‘সহিংসতার কথা যদি বলি তাহলে খুব মাইনর আহত হয়েছেন। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কারণে ১১ জন আহত হয়েছেন। বরিশালে পাঁচজন আহত হয়েছেন ওই ১১ জনের বাইরে। ওখানে একটু কোপাকুপির মতো হয়েছে। খুব গুরুতর নয়। তবে মাইনরের চেয়ে একটু বেশি। নেত্রকোনার কেন্দুয়াতে একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার নিজেই ব্যালট পেপারে সিল মেরেছিলেন। পরে সেটা উদঘাটিত হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টোটাল জাল ভোটের ইনসিডেন্ট ঘটেছে পাঁচটি। ইভিএমে কোনো ইনসিডেন্ট হয়নি।’
বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর বর্জনের মুখে ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচন শুরু হয়। ৪৯৫ উপজেলার মধ্যে নির্বাচন উপযোগী ৪৮৫ উপজেলায় চার ধাপে ভোট হয়েছে এবার। গত ৮ মে প্রথম ধাপে ১৩৯ উপজেলায় ভোট হয়। ওইদিন ভোট পড়েছিল ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ। ২১ মে দ্বিতীয় ধাপে ১৫৬ উপজেলার নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৩৮ শতাংশ। আর তৃতীয় ধাপে ২৯ মে ৯০ উপজেলার নির্বাচনে ভোট পড়ে ৩৬ শতাংশ।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গতকাল উপজেলা ভোটের চতুর্থ ও শেষ ধাপ হলেও ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য কারণে ২২ উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ৯ জুন এসব উপজেলায় ভোটগ্রহণ হবে।
জাল ভোট-অনিয়মে দণ্ড-জরিমানা : চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাহারছড়া কেন্দ্রে অনিয়েমের অভিযোগে চারজনকে আটক করে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে দুজনকে জাল ভোট দেওয়ার দায়ে এবং অন্য দুজনকে ভোট দেওয়ার পর ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করায় জরিমানা করা হয়।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও পুনরায় ভোট দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে মোশাররফ কাজী নামে একজনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সদর ইউনিয়নের গঙ্গিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।
বগুড়ার তিন উপজেলায় নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে ২১ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে শেরপুর ও ধুনট উপজেলায় ছয়জন করে এবং নন্দীগ্রামে নয়জনকে আটক করা হয়।
টাঙ্গাইলে প্রার্থীদের খুশি ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য সিলযুক্ত ব্যালট পেপারের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার হিড়িক পড়ে। নিজ নিজ কেন্দ্রে দায়িত্ব নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সিল মারা ব্যালট পেপার প্রার্থীদের ট্যাগ করে নিজেদের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন।
ফেনীর ছাগলনাইয়ায় সাংবাদিকের পরিচয় সংবলিত কার্ড গলায় ঝুলিয়ে নির্বাচনের কেন্দ্র ঘুরে বেড়িয়েছেন ফেনী পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইফুর রহমান।
অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটার খরা : বরিশালের বাবুগঞ্জ, উজিরপুর ও বানারীপাড়া উপজেলায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ হলেও কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নামেমাত্র। তাই কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে প্রার্থীরা কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন ভ্যানগাড়ি। প্রতিটি কেন্দ্রের আশপাশ এলাকায় ভ্যানগাড়ি দিয়ে কেন্দ্র পর্যন্ত ভোটারদের নিয়ে আসার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তারা।
ভোটকেন্দ্রের বাইরে উৎসুক মানুষের জটলা, তবে কেন্দ্রের মধ্যে ভোটারের উপস্থিতি কম। সারিবদ্ধ দীর্ঘ লাইনেরও দেখা মেলেনি। খুলনার রূপসা, বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলায় গতকাল ভোটকেন্দ্রগুলোর চিত্র ছিল এমনই।
বিচ্ছিন্ন সহিংসতা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর আনারস প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের আনন্দ মিছিলে গুলি করা হয়। এতে ওই চেয়ারম্যান প্রার্থীর এক তরুণ সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ওই চেয়ারম্যান প্রার্থীর অন্য এক সমর্থকের গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জেলা শহরের কলেজপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।
গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ওই তরুণের নাম আশরাফুর রহমান (২৩)। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কলেজপাড়ার আমিনুর রহমানের ছেলে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের স্নাতক (সম্মান) উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি জেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আনারস প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন শোভনের পক্ষের কর্মী ছিলেন। যার বিরুদ্ধে গুলি চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি হলেন জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি হাসান আল ফারাবী।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ছনুয়া খুদুকখালী নয়াপাড়া কেন্দ্রে প্রতিপক্ষের হামলায় আহমদ উল্লাহ (৫০) নামে একজন আহত হন।
