বিদ্যুৎ জ্বালানিতে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার বার্তা

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪, ০৫:৩৬ এএম

ঋণ পেতে আইএমএফের শর্ত মেনে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার, তার প্রতিফলন দেখা গেল আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ কিছুটা কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে উপস্থাপন করা বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩০ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। চলতি বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে ৪ হাজার ৫০২ কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ২৯ হাজার ২৩০ টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। আর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে মাত্র ১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৯৯৪ কোটি কোটি টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেওÑ এবার এ খাতে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন ও ব্যবহার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।’

এরই মধ্যে সরকার স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরু করেছে।

বছরে চারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে আগামী তিন বছরে ভর্তুকি কমিয়ে উৎপাদন খরচের কাছাকাছি নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে সরকারের। গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

অন্যদিকে ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে। গত বছরের শুরুর দিকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়ে শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। যদিও গ্যাসের সংকট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন প্রকট।

দেশ জুড়ে গ্যাস-সংকট সমাধানে জ্বালানি খাতে বড় বরাদ্দের প্রত্যাশা করেছিলেন শিল্পোদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞারা। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের মতোই কম বরাদ্দ পেয়েছে এ খাত। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জ্বালানি বিভাগের বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে জ্বালানি তেল-গ্যাস ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আসন্ন নতুন অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়ছে। এতে করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান আরও বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু বিদ্যুৎ খাতে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। একইভাবে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও চলতি অর্থবছর শেষে পিডিবির নিট লোকসান ৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, শুধু বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ১ লাখ ৪৪৮ কোটি টাকা। আসন্ন অর্থবছরে বিক্রয় রাজস্ব আসবে ৬৯ হাজার ৫৫ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা বেশি।

বাজেট প্রস্তাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, আসন্ন অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে অপরিচালন আয় হবে ৪২ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। তবে উৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়ার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির নিট লোকসান চলতি অর্থবছরের চেয়ে তিন গুণ বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ হাজার ১০৬ কোটি টাকায়। এ ছাড়া প্রস্তাবিত অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত