হকের একটি কাফেলা সর্বদা উম্মতকে সত্যের পথে ডেকে যায়। পার্থিব লোভ-লালসা, ভয়-ভীতি কিংবা কারও চোখরাঙানি ক্ষণিকের জন্যও তাদের এ কাজ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। যাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে আজও হকের আওয়াজ সগৌরবে টিকে আছে এবং যাদের ত্যাগের বিনিময়ে ইসলামের সুশীতল শামিয়ানার নিচে এখনো আমাদের স্থান রয়েছে, সেসব ক্ষণজন্মা মনীষীর একজন হলেন শায়খ মাওলানা শাহ ইকবাল বিন হাশিম সুনামগঞ্জী হুজুর। তাকে নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ
যে সব পীর-বুজুর্গের পদচারণায় ধন্য হয়েছে বাংলার ভূমি, যারা নিজেদের সর্বস্ব মানবকল্যাণে উৎসর্গ করেছেন, ইলমের সাগর নিয়ে যারা এখনো আমাদের মধ্যে বেঁচে আছেন, আদর্শ শিক্ষক হিসেবে যারা দেশ জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের অন্যতম একজন হলেন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার সিনিয়র মুহাদ্দিস উস্তাযুল আসাতিযা শায়খে সুনামগঞ্জী হুজুর মাওলানা শাহ ইকবাল বিন হাশিম।
১৩৭৬ বাংলা ৮ চৈত্র মোতাবেক ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মার্চ বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার টিঘড় গ্রামে নানার বাড়িতে শাহ ইকবাল বিন হাশিমের জন্ম হলেও তার পৈতৃক নিবাস রাণীদিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম আলহাজ শায়খ শাহ আবুল হাশিম। মায়ের নাম আলেমা খাদিজা বেগম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার পিতা সপরিবারে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার থানাধীন এরুয়াখাই (তিলোরা কান্দি) গ্রামে চলে আসেন। সেই থেকে তারা সুনামগঞ্জেই থাকছেন।
শায়খ ইকবাল বিন হাশিম সুনামগঞ্জীর উপনাম আবু মাহমুদা। নানা আরিফ বিল্লাহ কারী আবদুল গফুর (রহ.) তার নাম রেখেছিলেন ইকবাল উদ্দিন। কিন্তু মাদ্রাসার ভর্তি রেজিস্টারে ভুলে ইকবাল হুসাইন লেখা হয়। ফলে সব ধরনের কাগজপত্রে ইকবাল হুসাইন হলেও তিনি ইকবাল উদ্দিন বা ইকবাল বিন হাশিম এবং দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে ছাত্রদের কাছে তিনি ‘সুনামগঞ্জী হুজুর’ নামে অধিক পরিচিত।
সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণের সুবাধে অল্প বয়সেই তার প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে শুরু করে। তার মা একজন আলেমা হওয়ায় শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় আপন মায়ের কাছে। তার কাছেই অক্ষরজ্ঞান এবং কায়দা ও আমপারা সমাপ্ত করেন। এরপর পিতার সঙ্গে দুবাজাইল গ্রামে চলে যান। সেখানে স্বীয় পিতার নিকট সকালে কোরআন এবং বিকালে উর্দু পড়েন। আর মাঝখানের এই সময়ে স্কুলশিক্ষার জন্য পিতা তাকে দুবাজাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানে মাত্র দেড় বছরে শিশুশ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ নেওয়ার পাশাপাশি দরসে নেজামির বেহেশতি গাওহার পর্যন্ত পড়েন।
এরপর ১৯৭৮ সালে তাকে বি-বাড়িয়া জেলার মদিনাতুল উলুম পাকশীমুল মাদ্রাসায় মুতাওয়াসসিতাহ প্রথম বর্ষে ভর্তি করা হয়। হেদায়াতুন্নাহুর বছর তার শিক্ষাগুরু শায়খ আলী আকবর (রহ.)-এর পরামর্শে ভর্তি হন এশাআতুল ইসলাম মুহিউস সুন্নাহ রাণীদিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে শরহে বেকায়া পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে চলে যান উম্মুল মাদারিস মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায়। সেখানে শরহে বেকায়া জামাতে ভর্তি হয়ে একাধারে তাকমিল ফিল হাদিস সম্পন্ন করেন। ১৯৮৮-৮৯ সালে তাকমিল ফিল হাদিসের ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি মোট ১০০০ নম্বরের মধ্যে ৯৯৬ পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
অনন্য মেধাবী এই আলেম কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়ার পাশপাশি আলিয়া মাদ্রাসাতেও লেখাপড়া করেন। চক চন্দ্রপুর কসবা বি-বাড়িয়া থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মাদ্রাসা বোর্ডে ১ম স্থান অর্জন করেন। এরপর দৌলতপুর সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় সারা বোর্ডে ষষ্ঠ স্থান এবং সিলেট বিভাগে ১ম স্থান অধিকার করেন। আর ফাজিল পরীক্ষা দেন সুনামগঞ্জের মেরওয়াখলা মাদ্রাসা থেকে। ফাজিল পরীক্ষাতেও তিনি মেধা তালিকায় বোর্ডে ৫ম স্থান অর্জন করেন। এরপর জামেয়া রাহিমিয়া তায়িদুল ইসলাম ফতেহপুর, সিলেট থেকে কামিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বোর্ডে ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
ধীমান এই আলেম তার কর্মজীবন শুরু করেন হাদিসে নববি পাঠদানের মাধ্যমে। হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরা পরীক্ষা দেওয়ার পর তার উস্তাদ ও মুর্শিদ শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) ও শেখ হাফিজ কাসেম (রহ.) তার ভর্তি ফরম থেকে ঠিকানা বের করে মানুষ পাঠান সুনামগঞ্জে। কারণ তখন যেহেতু যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো ছিল না, তাই ভর্তি ফরম থেকে তার বাড়ির ঠিকানা বের করা হয়। পরে উস্তাদদের নির্দেশে বরিশালের জামেয়া ইসলামিয়া চরখলিফা ভোলা মাদ্রাসায় হাদিসের পাঠদান শুরু করেন এবং প্রথম বছরেই তাকে সহিহ বুখারি ও সুনানে তিরমিজির মতো উঁচুস্তরের কিতাবাদি অধ্যাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।। এক বছর পর তার মায়ের অনুরোধে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসেন। কারণ তার মমতাময়ী মা তাকে বারবার বলছিলেন, ‘তুমি এখন যেখানে খেদমতে আছ, সেখানে জলোচ্ছ্বাস দেখতে পাচ্ছি আমি।’ ফলে মায়ের কথায় তিনি চলে আসেন। আর বাস্তবেও ১৯৯১ সালে সেই অঞ্চলে ভারী বন্যা হয়, যাতে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। সে বছরেই সুনামগঞ্জের মাওলানা শায়খ আবদুল হান্নানের আবেদনে ছাতক থানার তাকবিয়াতুল ইসলাম গণেশপুর মাদ্রাসায় খেদমতে নিয়োজিত হন।
ছাতকে এক বছর শিক্ষকতার পর চলে যান জামেয়া দ্বীনিয়া মৌলভীবাজারে। সেখানে দীর্ঘ সাত বছর সহিহ মুসলিম ১ম খণ্ডসহ দরসে নেজামির অন্যান্য কিতাবের দরস প্রদান করেন। এরপর চলে যান জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম দেউলগ্রাম সিলেটে। এখানে শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কাসিমুল উলুম মেওয়া, জামেয়া ইসলামি বুধবারীবাজার ও ফুলবাড়ী আলিয়া মাদ্রাসায় সহিহ বুখারি, সুনানে তিরমিজিসহ সিহাহ সিত্তার অন্যান্য কিতাবের দরস প্রদান করেন। সব শেষে চলে আসেন জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গায়। এখানেও সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে সুনানে তিরমিজি ১ম খণ্ডের দরস দিচ্ছেন। পাশাপাশি সুনামগঞ্জের খাদিমুল কোরআন মহিলা মাদ্রাসা জামালগঞ্জ, জামেয়া আমবাড়ি গোপালপুর, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ, সাবীলুর রাশাদ পৈলনপুর তাহিরপুর, ঢাকা উত্তরার দারুল আরকামসহ আরও কয়েকটি মাদ্রাসায় শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম হিসেবে দারুস সুন্নাহ হুসাইনিয়া এরুয়াখাই এবং দারুস সালাম হুসাইনিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা দোয়ারাবাজারের দায়িত্ব পালন করছেন।
সুনামগঞ্জী হুজুরের বেশকিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাকে অন্যদের চেয়ে একটু আলাদাভাবে পরিচিত করেছে। সহজ-সরল ও দিলখোলা ছাত্রবান্ধব হিসেবে তাকে সবাই জানে। তিনি কথা কম বলেন, কী নিয়ে যেন সব সময় ভাবনায় থাকেন। হাতে তাসবিহ, মাথায় পাগড়ি, লম্বা জুব্বা, এ যেন সত্যিকার একজন নায়েবে নবী। তার তাকওয়া, সততা, পরহেজগারি, স্বচ্ছতা, আত্মসচেতনা ও সময়ানুবর্তিতা প্রবাদতুল্য।
হাদিসের দরসে রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করে হাদিস শুরু করেন। তার দরসে ভালোলাগার এমন একটা মোহ তৈরি হয় যে, ছাত্ররা তন্ময় হয়ে তার কথা শোনে। জটিল-কঠিন মাসআলাগুলো তিনি সহজ ও সাবলীলভাবে হাতে-কলমে দেখিয়ে দেন। ফলে একেবারে দুর্বল ছাত্রও তার দরস থেকে উপকৃত হয়।
শায়খ ইকবাল বিন হাশিম ইলমে হাদিসের খেদমতের পাশাপাশি ইলমুস সরফ, ইলমুন নাহু, ইলমুল বালাগাত, ইলমুত তাফসির ও ইলমুল ফিকহেও গভীর পাণ্ডিত্য রাখেন। তার লেখালেখির হাতও বেশ ধারালো। আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় সমানভাবে বলতে ও লেখতে পারেন। ইতিমধ্যে তিনি ‘তালখিসু সাহিহিল বুখারি ওয়া আসানিদিস সিহাহ’, ‘আত তিবইয়ান ফি বায়ানে মাজামিনিল কোরআন’, ‘আল কালামুল মুফিদ ফি বাহসিত তাকলিদ’, ‘শামসুল উলুম ফি শারহে সুল্লামুল উলুম’, ‘কাইফা নাতাআল্লামুল হাদিস ওয়া কাইফা নুআল্লিমুহু’, ‘অভিনব পদ্ধতিতে নকশায়ে নাহবেমির ওয়া ইলমুল ইরাব’ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন।
ইমান বিধ্বংসী বিভিন্ন এনজিওর আগ্রাসী অপশক্তির মোকাবিলায় আলেম সমাজ ও জনতাকে নিয়ে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। গরিব-এতিম, অসহায়-অনাথদের সেবার জন্য তার একান্ত প্রচেষ্টায় গঠিত হয় ‘ইখওয়ানুল উলামা ওয়াত তুলাবা’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন। এ ছাড়া পারস্পরিক ঐক্য এবং সাধারণ জনতাকে দ্বীনমুখী করতে ‘এরুয়াখাই ইসলামি সমাজকল্যাণ যুবসংঘ’-এর মাধ্যমে তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালারও আয়োজন করেন।
সুনামগঞ্জী হুজুর ১৯৯২ সালে বি-বাড়িয়া জেলার বিজেশ্বর গ্রামের দ্বীনদার এক পরিবারে বিয়ে করেন। তার স্ত্রীও একজন আলেমা। দাম্পত্যজীবনে তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে শায়খুল ইসলাম আল্লাম শাহ আহমদ শফি (রহ.)-এর প্রথম সারির খলিফা তিনি। মহান আল্লাহ তাকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন। আমিন।
