আমেরিকা অভিযান সমাপ্ত। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে দুটো ম্যাচে হেরে সুপার এইটে যাওয়ার সব সম্ভাবনা হাডসন নদীতে জলাঞ্জলি দিয়েই ক্যারিবিয়ানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। সেটা হয়নি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাওয়া ২ উইকেটের জয় এবং প্রকৃতির সহায়তা ভালোভাবেই বাংলাদেশকে টিকিয়ে রেখেছে পরের ধাপে যাওয়ার লড়াইতে। উইন্ডিজে দুই ম্যাচের প্রথমটিতে আজ বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস। ওয়ানডে বিশ্বকাপে এই নেদারল্যান্ডসই ইডেনে বলে কয়ে হারিয়েছিল বাংলাদেশকে, তাতে ম্যাচ নিয়ে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ আছে দলে। ছোট সংস্করণে ডাচরা যে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, সেটা তো জানাই আছে বাংলাদেশের। খেলা হবে সেন্ট ভিনসেন্টের আর্নোস ভেল মাঠে। যে মাঠে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটো আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়েছে এবং গত ১১ বছরে কোনো আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়নি। তারপরও মাঠটা বাংলাদেশের চেনাই বলা যায়, কারণ বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞতম দুই ক্রিকেটারের এই মাঠের সঙ্গে অনেক সুখস্মৃতি জড়িয়ে। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এসে এই মাঠেই টেস্ট জিতেছিল বাংলাদেশ। বোর্ডের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে খেলেননি মূল দলের ক্রিকেটাররা, এখান থেকে ওখান থেকে খেলোয়াড় কুড়িয়ে এনে একটা দল দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল ক্যারিবীয় ক্রিকেট বোর্ড। যে দলের অধিকাংশ ক্রিকেটারকে পরবর্তী সময়ে আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলতে দেখা যায়নি। সেই দলের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের কীর্তি গড়া বাংলাদেশ দলে ছিলেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে থাকা সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ।
বছর পাঁচেক পর সেই একই মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ফের টেস্ট খেলে বাংলাদেশ, এবার আর পাড়ার ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া দল নয় মূল দলই নামিয়েছিল ক্যারিবীয়রা। ফল, বাংলাদেশের ১০ উইকেটে হার। দুটো ওয়ানডে খেলে দুটোতেই হার এই মাঠে। তাই বলা যায় অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হলেও ফল ইতিবাচক নয়। আর যারা সেই সময়টায় খেলেছেন, সাকিব আর মাহমুদউল্লাহ বাদে তাদের কেউই জাতীয় দলে অবশিষ্ট নেই।
ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের সবশেষ ৩ মৌসুমেও খেলা হয়নি সেন্ট ভিনসেন্টে। হবেই বা কীভাবে, সেইন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড গ্রেনাডিসে এর কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজিই তো নেই সিপিএলে! এই মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৫টা ম্যাচ আয়োজন করা হবে, তার মধ্যে বাংলাদেশেরই দুটো। এমনকি বাংলাদেশ যদি সুপার এইটে উঠতে পারে তাহলে ডি গ্রুপের দ্বিতীয় দল (ডি২) হিসেবে সি গ্রুপের শীর্ষ দলের সঙ্গে ম্যাচ এখানেই খেলতে হবে বাংলাদেশকে। ক্যারিবিয়ানের উইকেটগুলোর সাধারণ যে চরিত্র, তার অনেকটাই মেলে বাংলাদেশের সঙ্গে। তাই ডাচদের বিপক্ষে বাংলাদেশকে একটু এগিয়ে রাখা যায়, আসলেই কি তাই?
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম কলকাতার ইডেন গার্ডেনস। আবহাওয়া, সমর্থন সবই অনুকূলে ছিল গত অক্টোবরে। মাত্র ২২৯ করেও ম্যাচটা নেদারল্যান্ডস জিতেছিল ৮৭ রানে, ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে। পল ভ্যান মিকারেন বাংলাদেশে বিপিএল খেলতে এসে বলেছিলেন এখানকার ক্রিকেটারদের সৌভাগ্যের কথা, জানিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসে তাকে ক্রিকেটের বাইরের সময়টায় ফুড ডেলিভারি অ্যাপে খাবার দিয়ে আসতে হয় রোজগারের জন্য। সেই মিকারেন ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা। বাংলাদেশ থেকে যাকে রীতিমতো তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই রায়ান কুক নেদারল্যান্ডসের কোচ এবং তার দল দেখিয়েছিল উজ্জীবিত ফিল্ডিং। অথচ বাংলাদেশের ফিল্ডিং কোচ থাকার সময় ২০২১ সালের পর অপবাদ নিয়েই চাকরি ছাড়তে হয় এই দক্ষিণ আফ্রিকানকে, তার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়নি বাংলাদেশ।
অক্টোবরে যে দলটা বাংলাদেশকে হারিয়েছিল, প্রায় একই দলটা এসেছে বিশ্বকাপেও। সেই পল ফন মিকারেন, এঙ্গেলব্রেখট, বাস ডি লিডি, ম্যাক্স ও’ডুডরা আছেন। নেপালকে হারিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দক্ষিণ আফ্রিকাকেও কঠিন চাপে ফেলে দিয়েছিল ১২ রানে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে। রেজা হেনড্রিক্স, কুইন্টন ডি কক আর এইডেন মার্করামদের যে বোলিং আক্রমণ এত অল্পে গুটিয়ে দিতে পারে, তাদের বিপক্ষে নাজমুল হোসেন শান্ত, তানজিদ হাসান তামিম, লিটন দাসরা কেমন করবেন সেটা ভেবেই কারও গায়ে কাঁটা দিতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাটিংটা হৃদরোগের কারণ, ফিল্ডিংও অসাধারণ নয়। বোলিংটা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দারুণ হয়েছে, তবে আজ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হয়তো বাড়তি একজন স্পিনার লাগবে। জাকের আলিকে বসিয়ে হয়তো খেলানো হবে শেখ মেহেদি হাসানকে, যাতে ব্যাটিংয়েও শেষ দিকে কেউ ৮-১০টা রান করবার মতো থাকে। সাকিব যদি ৪ ওভার শেষ না করেন সেটা হবে দুঃখজনক। শ্রীলঙ্কা-নেপাল ম্যাচটা লঙ্কানদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে, তবে তাতে বাংলাদেশের খুব একটা লাভ নেই। কারণ আজ নেদারল্যান্ডসকে হারাতে না পারলে ৩ ম্যাচে ২ পয়েন্ট নিয়ে শ্রীলঙ্কা আর নেপালের ঠিক ওপরেই থাকতে হবে বাংলাদেশকে আর ৩ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শেষ আটের দিকে এগিয়ে যাবে নেদারল্যান্ডস। এই সব সমীকরণই সহজ হয়ে যেত, যদি কেশব মহারাজের ফুলটস বলটায় ঠিকঠাক ৬ মেরে দিতে পারতেন মাহমুদউল্লাহ।
