যা কিছু সাহিত্য, সবই আবৃত্তির যোগ্য

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৩৭ এএম

ঠিক অপরাহ্ণে এলেন। একগাল হেসে বললেন তাড়াতাড়ি চলো। পরনে পরিচিত পোশাকসজ্জা। কিছুক্ষণ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনের রুমে বসলেন। এরপর ছবি তোলা। শেষে এলেন ডিজিটাল রুমে। আড্ডায় রূপা চক্রবর্তীকে ঘিরে রয়েছেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, সিনিয়র সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শুভ্র এবং সহ-সম্পাদক এনাম-উজ-জামান বিপুল। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন নুরুস সাফা।

আড্ডা শেষের কথা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের রুমে গেলেন, বিদায় জানাতে। জানলেন, তাদের বাড়ি সিলেট। এরপর শুরু হলো সিলেটি ভাষায় দুজনের কথোপকথন। সে কী যে শব্দের নাচন! কিছু শব্দ বোঝা যায়। অধিকাংশ বাক্যের অর্থ পরিষ্কার না। সবাই শুনছেন, এক ধরনের ভালো লাগা নিয়ে। আরও কিছুক্ষণ কথা হলো বিভিন্ন বিষয়ে। এরপর বিদায় নিলেন। তখন ডিজিটাল রুমের প্রস্তুতি শেষ। তিনি বসলেন, মাঝখানে। অল্পক্ষণ এলোমেলো কথা হলো। অনেকেই হাসছেন। বললেন তাড়াতাড়ি শুরু করো। আলোচনার শুরুতেই, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, আবৃত্তিশিল্পী রূপা চক্রবর্তী বললেন ওমা, আমার জন্য এত্তো বড় ভূমিকা! বুঝতেই তো পারিনি, কার জন্য বলছ? হাহাহাহা। বলো, কী জানতে চাও?

তাপস রায়হান : আপনি তো সব বিদেশি শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন ১৫ ভাষা নিয়ে। কেমন লাগছে? 

রূপা চক্রবর্তী : আসলে ভাষার প্রতি আমাদেরই কেবল দুর্বলতা, তা কিন্তু নয়। ব্রিটিশরা যেখানে তাদের কলোনি করেছে, সেখানেই ইংরেজিকে আলাদা একটা মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অনেকেই তখন বাধ্য হয়ে তার পেশার ভাষা ‘ইংরেজি’, অনেকটা বাধ্য হয়েই শিখে নেয়। বাংলা ভাষার জন্য আমরা সংগ্রাম করেছি, রক্ত দিয়েছি। আপন করে নিয়েছি। এটা আমাদের মাতৃভাষা। পাকিস্তানিরা  চেয়েছিল উর্দু ভাষাকে যেন আমরা গ্রহণ করি, তা হয়নি। পৃথিবীর বুকে বাঙালিরাই রক্ত দিয়ে নিজের ভাষায় কথা বলা, কাজ করা, সাহিত্য রচনা করার অধিকার আদায় করে নেয়। আমাদের একটা পরিচয় দাঁড়িয়েছে। এটা কিন্তু অনেক বড় ব্যাপার। এই বাংলা ভাষার জন্য একটা বাংলা একাডেমি হলো। সেই ভাষার আন্দোলন, কীভাবে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ পায়, তা অনেক বড় ব্যাপার। এটা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বিষয়। সেই বাংলা ভাষা আন্দোলনের পথপরিক্রমায় দেশে মুক্তিযুদ্ধ হলো, আমরা স্বাধীন হলাম। এটি অনেক ব্যাপক আলোচনা। একটা কথা বলি। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন বাংলায় সবকিছুর পরিভাষা সম্ভব না হলেও, বাংলা ভাষায় তোমরা লেখা শুরু করো। ক্রমে ক্রমে এটা হবে। অনুবাদ হতে থাক একদিকে, বাংলায় কাজ চলুক আরেক দিকে। কিন্তু আমরা তো সেই কথা মান্য করতে পারিনি। সেখান থেকে দূরে, অনেক দূরে সরে গেছি। আমি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হই, ৭৮-৭৯ শিক্ষাবর্ষে। যখন এলিফ্যান্ট রোড দিয়ে নিউ মার্কেটের দিকে যেতাম, দেখতাম প্রতিটি সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা। কোথাও ইংরেজি নেই। আর আজ? আমরা আসলে ভেতর থেকেই বদলে যাচ্ছি। একটা তীব্রতা দিয়ে আমরা বাংলাকে ভালোবেসেছিলাম, রক্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন সব অধিকার পেলাম তখন দায়িত্বশীল আচরণ করলাম না। এটাই দুঃখ। তবে অবাক বিষয় হচ্ছে, আমাদেরই বাঙালিরা, যারা বিদেশে রয়েছেন তারা যখন বিদেশে কথা বলছেন, তখন কিন্তু অযথা বা অকারণে কোনো ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছেন না। কিন্তু আমরা যখন বিভিন্ন টক শোতে বাংলার সঙ্গে মিশিয়ে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছি এবং এটা যখন ওই অভিবাসী দেখতে পায় তখন ওরা অনেক দুঃখ পায়। বাংলা ভাষার একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে খুব লজ্জিত হই। যখন তারা বলে বাঙালিরা ঠিকমতো বাংলাটা বলছে না। তারা বাংলার মধ্যে অন্য ভাষার শব্দ বলছে। এ রকম কথা আমাদের ব্যথিত করে, খারাপ লাগে। কখনো কি বিবিসি বা সিএনএনে দেখেছেন, তারা যখন তাদের ভাষার কোনো অনুষ্ঠান করে, সেখানে স্প্যানিশ বা ফ্রেঞ্চ শব্দ ব্যবহার করছে? এটা হয় না। কেউ এ রকম করে না। কেবল আমরা করি। আমরা তো জানি, ইংরেজি ভাষার আগত শব্দের প্রায় ৭০ ভাগ হচ্ছে ফ্রেঞ্চ শব্দ। তবু তারা কিন্তু কোনো শব্দ ব্যবহার করতে গেলে, জোর করে অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করে না অকারণে যা আমরা করি।

সাহাদাত পারভেজ : আমরা এটাকে স্টাইল হিসেবে নিয়েছি?

রূপা চক্রবর্তী : এটা স্টাইল না। মানুষকে বোঝাতে চাই, আমি শিক্ষিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তুমি ইংরেজি ভাষা জানো না, আমি জানি। শোনো হে, যখন আমি বাংলাটা বলি তখন ইংরেজি ভাষা আমি ভুলে থাকতে পারি না। আমরা যদি বাংলা ভাষার দিকে তাকাই, দেখি সে তো অগণিত বিদেশি ভাষা দিয়ে আকীর্ণ। সমৃদ্ধ একটি ভাষা। বাংলার তো নিজস্ব শব্দভা-ার খুবই কম। যখন মেঝে, জানালা, দরজা, দেয়াল, ছাদ, ছিটকিনি, কলম বা কাগজ বলি কোনোটাই তো বাংলা শব্দ না। এসব তো অন্য ভাষার শব্দ। তবু অন্য ভাষার রূপ বদল করে আমরা তার বাঙালিকরণ করেছি। আমরা যেভাবে এসব শব্দের উচ্চারণ করি, আসলে তো এসবের উচ্চারণ তেমন নয়। আমেরিকা, ব্রিটেন বা অস্ট্রেলীয়রা যেভাবে ইংরেজি বলে আমরা তো সেভাবে বলি না। এমনকি ভারতের মতো নয়। আমরা একদম আমাদের মতো করে এসবের বাঙালিকরণ করেছি। এটা সময়ের হুজুগ। বর্তমান প্রজন্ম অযথা যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছে, সেটা বয়সের ধর্ম। ঠিক হয়ে যাবে। এক সময় ‘ ডিজুস’ ছিল। এখন নেই। এটাও থাকবে না। জনসংখ্যার দিক থেকে, ব্যবহারকারীদের দিক থেকে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা হচ্ছে- বাংলা। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বাংলা ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করা প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীতে একজন বাঙালি বেঁচে থাকলেও, বাংলা ভাষা থাকবে।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আমাদের আড্ডাটা মনে হচ্ছে, একটু কঠিন আলোচনার দিকে যাচ্ছে। একটু সহজ করি। আমরা আপনার সম্পর্কে জানতে চাই। আপনি কীভাবে এই পথে এলেন, এটাও শুনব। আগে শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য...?

রূপা চক্রবর্তী : (মুচকি হাসলেন। বললেন) প্রায় সবাই জানে, আমি সিলেটি মেয়ে। শহরেই আমাদের বাসা। গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে। সিলেটের এমন একটি পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে, সেখানে যারই জন্ম হোক না কেন, সে কোনো না কোনো কিছু করবে। হাহাহাহাহা। সুনামগঞ্জের গ্রামে আমরা থাকিনি। বড় হয়েছি সিলেট শহরে। সেখান থেকেই আমি এসএসসি পাস করেছি। এরপর এইচএসসি। সেটা ১৯৭৬ এবং ৭৮ সালের কথা। এরপর  ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে। মজার বিষয় কি জানেন, আমার বাবা যখন স্কুলে ছিলেন সরাসরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছাত্র। তিনি শান্তি নিকেতনে গিয়েছিলেন পড়তে। দাদু পাঠিয়েছিলেন। তখন বাবার বয়সী বা একটু বড়, সেই সৈয়দ মুজতবা আলী, হীরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত ছিলেন। তাদের একটা যাতায়াত ছিল আমাদের বাসায়। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গেলে বাবা চলে আসেন। বড় কাকা ছবি আঁকতেন। আমাদের একটা ঘর ছিল, তার চারদিকে কাকার পেইন্টিংয়ে ভরা।  সেসব মুক্তিযুদ্ধের সময় জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়। আমার সেজো কাকা ছিলেন সুবিনয় রায়ের ছাত্র। খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। ১৯৬১ সালে সিলেটে যে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী হয়, সেটা হয় শহরের সারদা হলে। কবি সুফিয়া কামাল সেই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু বিভিন্ন গানের যে মহড়া হয়, সেট হয়েছিল আমাদের বাড়িতে। মহড়ার জন্য দুটো ঘর ছড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে রাখী চক্রবর্তী, সঞ্জয় মজুমদারসহ অনেকেই ছিলেন। আমি তখন মাতৃগর্ভে। আমার জন্মও তখন। শুনেছি, তখন কলিম ভাই মাকে বলেছিলেন বৌদি, একটু দাঁড়াও। আমি একটা গান গাই। তোমার পেটে যে ছেলে বা মেয়ে রয়েছে, দেখবে সে রবীন্দ্রপ্রেমিক হবে। এটা শুনে মা ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলেন। হাহাহাহা। এই ঘটনা পরে শুনেছি।

সাহাদাত পারভেজ : আপনার ভাইবোন?

রূপা চক্রবর্তী : আমরা ৭ ভাইবোন। আমি পঞ্চম। আমার বড় দাদা, রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ডাক নামে পরিচিত, সবাই বলে  টিপু মজুমদার। তার ভালো নাম- দেবাশীষ মজুমদার। সিলেটের প্রাচীন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘যুগভেরী’তে প্রথম খেলার পাতা তৈরি করেন। আগে খেলার কোনো পাতা ছিল না। তখন সম্পাদক আমিনুর রশীদ চৌধুরীকে বলে সেই পাতা করেন। তখন দাদা, ক্লাস নাইনে পড়েন। সম্পাদককে অনেক বলে সেই পাতাটা করেন। লেখা, ছবিসহ সব দাদাই করতেন। দাদা সেই পত্রিকায় কর্মরত অবস্থাতেই মারা যান। তিনি ভীষণ ক্রীড়া অনুরাগী ছিলেন। তাকে বলা হতো সিলেটের ক্রীড়া সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তখন কিন্তু দাদা ক্লাস নাইনে পড়েন। সেটা পাকিস্তান আমলের কথা। আমার বড় দিদি গান গাইতেন। ছোট বোন ভালো ছবি আঁকত। এসব বললাম এ কারণেই যে, আমাদের পরিবারটাই ছিল এমন। সবাই কিছু না কিছু করছে। আমার ছোটবেলা থেকেই কবিতা ভালো লাগত। আর আমার মা খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। তিনি সংস্কৃত ভাষাও জানতেন। সেটা আমাদের জন্য বেশ ইতিবাচক ছিল। এরপর তো সবকিছু থেকে কিছু নেইয়ে চলে এলাম। মুক্তিযুদ্ধের আগে আগে আমরা বিশাল বাসায় আলাদা আলাদা কোঠায় থাকতাম। দেশ স্বাধীনের পর ১ কোঠায় ১৭ জন মানুষ। আমরা এও জানি দারিদ্র্য কাকে বলে? সম্পদ থাকা কাকে বলে, সেটা যেমন জেনেছি সম্পদহীনতার বেদনাও জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমাদের বাড়িটা জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়। তার আগে চলে লুটতরাজ। আমাদের ৭ পুরুষের যাবতীয় সম্পদ লুট করা হয়েছে। ভারত থেকে ফিরে এসে যা দেখেছি, তার কাহিনি দীর্ঘ। এরপর তো...! এখনো মা, ভাই, বৌদি আছেন। তারপর তো ঢাকায়। থাকতাম শামসুন্নাহার হলে। বাংলায় পড়তাম। 

তাপস রায়হান : আবৃত্তি কবে শুরু করলেন?

রূপা চক্রবর্তী : যখন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু। যখন থার্ড ইয়ারে পড়তাম, তখনই বিটিভিতে আবৃত্তি করি। এটা হলো ১৯৮১। এর আগে যখন একদিন টিএসসিতে একটা অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করি, তখন দর্শক সারির সামনেই ছিলেন বিটিভির অনুষ্ঠান প্রযোজক আবু জাফর সিদ্দিকী। পরে তিনি ডিজি হন। আমি যে কবিতাটা আবৃত্তি করি, সেখানে একটা লাইন ছিল উষা দিশাহারা, নিবিড় তিমির আঁকা। তিনি ‘উষা’ শব্দের উচ্চারণ শুনে ভেতরে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন। বলেন তুমি কী পড়? বললাম বাংলায়। কোথাকার মেয়ে তুমি? বললাম, সিলেট। তিনি কপালে হাত দিয়ে চাপড় মেরে বললেন- তুমি সিলেটের মেয়ে, ‘উষা’ উচ্চারণ করতে পারলে! এটা উচ্চারণ করা তো কঠিন। তুমি কীভাবে পারলে! এটা শুনে তো আমি নার্ভাস। ভাবলাম, আমি কি ভুল বলেছি? তিনি বললেন না না, তুমি ঠিক বলেছ। এরপর বললেন জয়ন্তকে  চেন? বললাম, কোন জয়ন্ত? তিনি বললেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। বললাম হ্যাঁ, জয়ন্ত দাকে চিনি। ও তোমাকে নিয়ে যাবে। আগামী পরশু তোমার রেকর্ডিং। এই কবিতাটাই পড়বে ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’। টিভিতে গিয়ে দেখলাম, অনুষ্ঠানের নাম ‘বাংলার মুখ’।

এটাই টেলিভিশনে প্রথম অনুষ্ঠান। তখন আমি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। আর ’৮৪ সালে পরীক্ষা দিলাম। তখন আমার বয়সী এবং বড়রা টিএসসিতে বসি। ১৯৮৫ সাল। একজন আরেকজনকে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাই। তখনই মাথায় এলো একটা আবৃত্তি দল করার। জন্ম নিল সংগঠন ‘স্বনন’। এটার আহ্বায়ক হলাম আমি। তখন ছিল আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বরিত’, ‘কণ্ঠশীলন’। তখন সেখানে প্রশিক্ষণ দিতেন ওয়াহিদুল হক, নরেন বিশ্বাস আর বিপ্লব বালা। এরা ৩ জন প্রশিক্ষণ দিতেন। তারা একটা সিলেবাসও করেছিলেন। আমরা সেখানে অনেক ক্লাস করেছি।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনি তো শিক্ষক হিসেবে হুমায়ুন আজাদকে পেয়েছেন?

রূপা চক্রবর্তী : অবশ্যই। শুধু হুমায়ুন আজাদ না। আমি দেশবরেণ্য শিক্ষকদের পেয়েছি। নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন আমার শিক্ষক। সনজীদা খাতুন, আবু হেনা মোস্তফা কামালকে পেয়েছি। অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান স্যারকে পেয়েছি। আবুল কাশেম ফজলুল হক স্যারকে পেয়েছি। আর তাদের জুনিয়র অনেক স্যার ছিলেন। কত নাম বলব?

তাপস রায়হান : তাহলে স্বননের কত বছর হলো?

রূপা চক্রবর্তী : ৩৯ বছর পূর্ণ হবে এ বছর, সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে।

সাহাদাত পারভেজ : এর সদস্য কেমন?

রূপা চক্রবর্তী : কত জনই তো আসে-যায়। মোট হিসাব করলে কয়েক হাজার হবে। বর্তমানে সঙ্গে রয়েছে প্রায় ১৫০ জন।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আরেকটা ‘স্বনন’ ছিল না, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়কেন্দ্রিক?

রূপা চক্রবর্তী : আছে। কিন্তু ওটা তো দাঁড়ায় না। ওদের সব শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। সংগঠনে থেকে কেউ করে না। আমি যেমন এখনো আছি। এটা কিন্তু  ৩৯ বছর ধরেই। এটা কিন্তু ওদের নেই।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : হাসান আজিজুল বলেন আবৃত্তি এক ধরনের শিল্প। এই শিল্পের চর্চা সবারই করা উচিত। কোনো শিল্প একক ও বিচ্ছিন্ন নয়। আবৃত্তির একমাত্র উদ্দেশ্য শুধু শুদ্ধ উচ্চারণ নয়, মানুষের সঙ্গে শুদ্ধভাবে কথা বলাই আবৃত্তির একমাত্র উদ্দেশ্য। আপনি কী বলেন?

রূপা চক্রবর্তী : এই কথা হয়তো কোনো কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন। আমার ধারণা, তিনি শেষের দিকে এটাকে ধরে রাখেননি। কারণ তার মতো অনন্য উচ্চতার মানুষ, শুধু ‘শুদ্ধভাবে’ কথা বলার জন্য আবৃত্তি শিল্পকে বাঁধতে চাইবেন না। এটা আমি বিশ^াস করি না। আমার মনে হয়, কোনো না কোনো প্রেক্ষাপটে এই কথা বলেছেন। তিনি বিশ^াস করতেন, আবৃত্তি হচ্ছে সেই মাধ্যম যেখানে সাহিত্যের সব উপাদানকে মানুষের শ্রবণের মধ্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সব উপাদান বলছি এই কারণেই যে, আবৃত্তি করতে গিয়ে আমরা বিশেষ কিছু উপাদানকে সামনে নিয়ে এসেছি। একটি চিঠি, আবৃত্তি করা। বিভিন্ন কবির চিঠি আমরা আবৃত্তি করেছি। শিল্পের কোনো সীমারেখা নেই। যা কিছু সাহিত্য, সবই আবৃত্তির যোগ্য। এই কথাটা আমরা বলছি।

সাহাদাত পারভেজ : আর উচ্চারণ?

রূপা চক্রবর্তী : উচ্চারণ না জানলে তো আমি বাচনিক শিল্পের কাছেই যেতে পারব না। ধারা বর্ণনা, ঘোষণা, সংবাদ পাঠ, নাটক, সংগীত সবকিছুই তো সঠিক উচ্চারণের বিষয়। ধ্বনি উচ্চারণ করলেই, সুন্দর করে শুদ্ধ করে প্রমিত বাংলায় বলতে হবে। এমনকি বক্তৃতার সময়েও বলতে হবে।

তাপস রায়হান : বাংলা ভাষায় আবৃত্তির যে মাধুর্য, অন্য ভাষায় সেটা সম্ভব?

রূপা চক্রবর্তী : পৃথিবীর সব ভাষায় ধ্বনির মাধুর্য রয়েছে। প্রতিটি ভাষাই পৃথিবীর সম্পদ। ‘বাংলা’ আমাদের প্রাণের ভাষা। তাই মধুর লাগে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যারা স্প্যানিশ তারা কিন্তু তাদের ভাষাকেই প্রাণের মনে করে। এটা সবার এমনই মনে হয়, শুধু আমাদের না।

তাপস রায়হান :  শিল্প এবং রাজনীতি একসঙ্গে চলতে পারে?

রূপা চক্রবর্তী : এটা আপেক্ষিক। একটা স্রোতে মণি-মুক্তাও থাকে, শ্যাওলাও থাকে।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনার ব্যক্তিজীবন?

রূপা চক্রবর্তী : আমার ১ ছেলে। স্বামী হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। ছেলে লন্ডনে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছে। এখন বাংলাদেশে।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র :  সব চাওয়া পূর্ণ হয়েছে!

রূপা চক্রবর্তী : অনেক অপূর্ণ! হাহাহাহা। যা আলোর মুখ দেখবে না, তা আর কেন বলব? ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে, বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।’ একজন মানুষ জীবনে সবকিছু পায় না। প্রকৃতি মানুষকে কিছু জিনিস দেবে, কিছু দেবে না এটাই জীবন। এখান থেকেই সুখ খুঁজে নিতে হয়। 

অ ল্প স্ব ল্প

আবৃত্তিশিল্পের বিষয় পরিধিকে প্রসারণ ও আবৃত্তি শিল্পসৌন্দর্যের বহুমাত্রিকতাকে প্রতিষ্ঠাদান (১৯৮৫-চলমান)

২০২১ সালে বাংলাদেশ আবৃত্তিশিল্পী সংসদের আবৃত্তি উৎসবে ৮টি বিভাগে ২০০০+ তরুণ আবৃত্তিশিল্পীদের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণ

২০২৩ সাল থেকে জাতীয় ভাষাশহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের মধ্যে বিরতিহীন ১২ ঘণ্টার একমাত্র আবৃত্তি অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও আয়োজন

সদস্য সচিব, বাংলাদেশ আবৃত্তিশিল্পী সংসদ, ২০২০-চলমান

সভাপতিম-লীর সদস্য, বঙ্গীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি সংসদ, ২০১৮-চলমান

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, রবীন্দ্র একাডেমি, ২০১৫ চলমান

প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, পুনশ্চ লন্ডন, ইউকে, ২০০৮

দলীয় সদস্য, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ১৯৮৭-চলমান

প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, স্বনন, ১৯৮৫-৮৭;

অনুষ্ঠান ও বার্তা বিভাগের প্রধান, দেশ টিভি ইউকে, ২০১১-১২

বরেণ্য নারী সম্মাননা, ২০২৪

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী মহিলা কল্যাণ সমিতি ও আদার্স উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন’স ক্লাব।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত