দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগের এক দফার আন্দোলন করেছে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। সে আন্দোলনের প্রধান শরিক বিএনপি রাজপথে সেভাবে জোরদার আন্দোলন করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। এ অভিযোগের পাশাপাশি দলের পক্ষ থেকে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের কেন্দ্রে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল বিএনপির হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যর্থদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের দিয়ে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা। এদিকে আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যর্থ হওয়া নেতাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণসহ চারটি মহানগরে বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। অন্য দুটি কমিটি হলো চট্টগ্রাম ও বরিশাল মহানগর কমিটি। একই সঙ্গে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে গভীর রাতে বিশেষ করে কোরবানির ঈদের আগে বিদ্যমান কমিটি বিলুপ্ত করে দেওয়ায় বিলুপ্ত কমিটির নেতারা বিস্মিত হয়েছেন। তাদের দাবি তারা আন্দোলন সংগ্রামে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিক মামলার আসামি হয়েছেন। এখন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের সুযোগ না দিলে, দমনপীড়ন চালালে কী করার আছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত আহ্বায়ক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর ২৮ অক্টোবর থেকে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর দমনপীড়ন চালিয়েছে। ওইদিন আমার বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করেছে পুলিশ। আমরা দায়িত্ব পালন করেছি এবং আমরা সফল বলে মনে করি।’ তিনি বলেন, ‘দলের কমিটি বিলুপ্ত কিংবা নতুন কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। দল যা ভালো মনে করেছে, তাই করেছে। ভবিষ্যতে আমাকে যে দায়িত্ব দেবে তা যথাযথভাবে পালন করব।’
কমিটি বিলুপ্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ করে নয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচনের আগে ও পরের আন্দোলন সংগ্রামের বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আরও আগে। এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে ছাত্রদলের আগের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এবার বিএনপির চারটি মহানগর, যুবদল কেন্দ্রীয় সংসদ ও ছাত্রদল ঢাকা মহানগরের চারটি ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিগত আন্দোলনে যারা ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের সরিয়ে দিয়ে যোগ্যদের দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল দলের স্থায়ী কমিটির সভায়। এখন তার বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। কারণ চলতি বছরের শেষের দিকে আবার সরকারের পদত্যাগের এক দফার আন্দোলন শুরু হবে। তার আগে যেখানে যেখানে দুর্বলতা রয়েছে, তা দূর করা হবে।
তিনি বলেন, গত মাসে বিএনপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আগামীর আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে কথা বলেছেন। এ সময় বিএনপি নেতারা রাজপথে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি বলে অভিযোগ ছিল। তাদের অভিযোগের পাশাপাশি দলের মধ্য থেকে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে যে প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতে দলের বিভিন্ন ইউনিটের পুনর্গঠনের কাজ চলছে। কমিটি বিলুপ্ত ও নতুন কমিটি গঠনের কাজ এগিয়ে যাবে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। পাশাপাশি যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম শাখার কমিটির বিলুপ্ত করা হয়। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিএনপির চারটি মহানগর ও যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর ও বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। উল্লিখিত বিলুপ্তকৃত কমিটিগুলো পরবর্তী সময়ে নতুন করে ঘোষণা করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৭ মে যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। আট সদস্যের কমিটিতে সভাপতি করা হয় সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে, যিনি আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক করা হয় মোনায়েম মুন্নাকে, যিনি বিগত কমিটির সহসভাপতি।
যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করার পর গতকাল শুক্রবার যুবদলের পদবঞ্চিত নেতারা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হয়েছিলেন। এ সময় তাদের মধ্যে খুশির আমেজ বিরাজ করছিল। পদবঞ্চিত এসব নেতা বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের চতুর্থ তলায় দীর্ঘক্ষণ যুবদল অফিসে বসেছিলেন। পদবঞ্চিত এক নেতা বলেন, ‘দীর্ঘদিন আমাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। এখন দলের হাইকমান্ড বিদ্যমান কমিটি বিলুপ্ত করায় আমরা খুশি। তাই বাইরে থেকে বিরিয়ানি আনিয়ে সবাই মিলে খেয়েছি।’
এ ছাড়া পৃথক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম শাখার কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১ মার্চ বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করে দলটি। রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া কমিটিতে আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, শ্যামল মালুমকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আমানউল্লাহ আমানকে সাংগঠনিক সম্পাদক, মো. জাহাঙ্গীর আলমকে দপ্তর সম্পাদক এবং শরিফ প্রধান শুভকে প্রচার সম্পাদক করা হয়।
বিএনপির চারটি মহানগর, যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের চারটি ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত করার বিষয়ে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিজ নিজ বিভাগের জেলাগুলোর নেতাদের আন্দোলন-সংগ্রামে কার কী ভূমিকা ছিল তা পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন পেশ করতে বলেছিলেন। তারই ভিত্তিতে এখন কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন করে কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কুমিল্লা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে দলের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন করা হবে। সে কার্যক্রমও চলছে।’
