রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার দ্বিতীয়তলার একটা বাড়িতে বসবাস করেন শহিদুল আলম ও মাহফুজা নাসরীন দম্পতি (ছদ্মনাম)। তাদের ৫ বছরের ছেলে সৌহার্দ। তারা যে ভাড়া বাসায় থাকেন সেখানে ৪টা ইউনিটে সব মিলিয়ে ৪ পরিবারের বসবাস। শহিদুল-মাহফুজা দম্পতি এবার আর্থিক টানাপোড়নে কোরবানি দিতে না পারলেও অন্য ৩ পরিবার ৩টি গরু কোরবানি দিয়েছে। কোরবানির মাংস কাটাকাটি শেষে বণ্টন করা হলেও তাদের বাসায় কেউ কোরবানির মাংস দেয়নি।
মাহফুজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল আধা কেজি গরুর মাংস কিনে এনেছিলাম, আজ দুপুরে রান্নাও করি। কিন্তু সৌহার্দ বায়না ধরেছে সে বাজার থেকে কিনে আনা মাংস খাবে না, পাশের বাসায় জবাই করা গরুর মাংস খাবে।
রাজধানীতে বসবাস করা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা কোরবানির এই সময়ে এক ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েন। বাসার নিচে গরু কাটাকাটি ও বণ্টন চেয়ে চেয়ে দেখতে হয়, কোরবানি দাতার বাসায় রান্না করা তরকারীর ঘ্রাণ তাদের বাসায় গেলেও মাংসের অংশ তারা পায় না। নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই মানুষেরা কারও বাসায় মাংস চাইতে যেতেও পারে না, কোরবানিদাতা অনেকেই হয়তো ভাবেন না তাদের কথা।
যারা নিম্নব্ত্তি তারা বাসায় বাসায় মাংস চাইতে বের হয়। সারাদিন ঘুরে ঘুরে তারা যে গোশত পায় তা পরিবারের জন্য যেমন নিয়ে যায় তেমনি বাড়তি উপার্জনের আশায় বাজারেও বিক্রি করে। অপরদিকে যারা কোরবানি দেয় তারা তো গোশত পাচ্ছেই। কিন্তু কোরবানির গোশত পায় না সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্তরা। তারা কেবল মুখ বুঝে কষ্ট সহ্য করে আফসোস করে।
রাজধানীর সুবাস্তু এলাকার একটা ব্যাচেলর বাসায় থাকেন গণমাধ্যমকর্মী আসাদুজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি যে বাসায় থাকি সেই বাসার মালিক একটা বড় গরু কোরবানি দিয়েছেন। গতকাল আমাদের সঙ্গে দেখা হলে তিনি খোঁজখবরও নিয়েছেন। কিন্তু আজ কোরবানির মাংস বণ্টন শেষ হলেও আমাদের বাসায় তিনি কোনো মাংস দেননি।
দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদুল আজহা যা কোরবানির ঈদ হিসাবে সমাদৃত। বছরের এই একটা দিনে সামর্থ্যবান মুসলমানরা কোরবানি দেয় এবং গরিব মানুষদের মধ্যে মাংস বণ্টন করে। দীর্ঘকাল ধরে এটাই বাঙালি সমাজের চিরাচরিত নিয়ম এটি। সামর্থ্যবানের কোরবানির মাংসের ওপর গরিবের হক থাকার কারণে বছরের এই একটা দিনে ধনী-গরিব, উচ্চ-নিম্ন কিংবা মধ্যবিত্তরাও মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়।
কোরবানির মাংস বণ্টনের নিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে হাফিজ মাওলানা কাজী মশহুদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোরবানির মাংস বণ্টনের একটা নিয়ম আছে। কোরবানির মাংস এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য রাখা যায়। বাকি দুই ভাগ থেকে প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে এবং অন্য ভাগ গরিব-মিসকিনদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দিতে হবে। এখন কেউ যদি লাখ লাখ টাকা খরচ করে গরু কিনে কোরবানি দিয়ে অল্প কিছু গরিব মানুষকে দিয়ে বাকি মাংস ফ্রিজে রেখে দেন তাহলে কোরবানি কবুল হবে না।
তিনি বলেন, কোরবানি দেওয়া হয় আল্লাহকে খুশি করার জন্য। কোরবানির মাংস, রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বান্দার তাকওয়া পৌঁছায়।
