প্যাডেল চললেও, পেট চলে না

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৫:৪২ পিএম

‘সারা দিন রিকশা চালাইয়া ২০০ টাকার খ্যাপ মারছি। রিকশা মালিকরেই জমা দিতে হইব দেড়শ টাকা। বাকি টাকায় বাচ্চার দুধ কিনমু, না অন্য সদাই কিনমু, তা ভাইবা দিশা পাই না।’ গতকাল সোমবার দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর কলাবাগানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ক্ষেদোক্তি প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে কথাগুলো বলছিলেন রিকশাচালক মোহাম্মদ মোশারফ। ক্যানসারের রোগী হওয়া সত্ত্বেও সংসারের চাকা সচল রাখতে প্রায়ই যাকে পা রাখতে হয় রিকশার প্যাডেলে।

গত পাঁচ বছর ধরে রাজধানী ঢাকায় রিকশা চালিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে ছয় সদস্যের সংসার চালাচ্ছেন মোহাম্মদ মোশারফ। দেশের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তার জীবনযাপনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ-সহিংসতার কারণে গত পাঁচ দিন ধরে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হননি তিনি। ঘরে খাবারের মজুদ ফুরিয়ে আসায় গতকাল শেষমেশ ঝুঁকি নিয়েই রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হন। দিনের অর্ধেক সময় এদিক-সেদিক করে তার আয় হয় মাত্র ২০০ টাকা।
মোশারফ বলেন, ‘আমি ক্যানসারের রোগী। মাঝেমধ্যে প্রায়ই অসুস্থ হইয়া বাসায় পইরা থাকি। ঘরে শুইয়া থাকলে তো আর সংসার চলব না। ঘরে খাবার-দাবার যা ছিল তাও শ্যাষ। ঘরে দুধের বাচ্চা আছে। নিজেরা কম খাইয়া থাকতে পারমু, বাচ্চারে তো আর না খাওয়াইয়া রাখতে পারমু না।’

মোশারফের মতো প্রায় একই দশা রাজধানীর অধিকাংশ রিকশাচালকের।গতকাল বেলা ৩টায় যাত্রীর জন্য রাজধানীর বাংলা মোটর মোড়ে অপেক্ষা করছিলেন বেশ কয়েকজন রিকশাচালক। তাদের কেউবা মুখ ভার করে রিকশার চালকের আসনের ওপর বসেছিলেন, আবার কেউবা বসেছিলেন হাত-পা গুটিয়ে।

সেখানে আলিম নামে শারীরিক প্রতিবন্ধী এক রিকশাচালক জানান, সকাল ৯টায় রিকশা নিয়ে বের হয়ে পাঁচ ঘণ্টায় আয় করেছেন ২৫০ টাকা। কিন্তু তার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জমা (ভাড়া) বাবদই মহাজনকে দিতে হবে ৩৫০ টাকা। এখনো রিকশা জমার টাকাই ওঠেনি। এদিকে রিকশার ব্যাটারির চার্জ প্রায় শেষ। গ্যারেজে গিয়ে ভাড়ার টাকা কীভাবে দেবেন, আবার পরিবারের সদস্যদের জন্য বাজার-সদাই কীভাবে করবেন তা ভেবে দিশা পাচ্ছেন না।

আলিম বলেন, ‘ভাই আমরা আছি বিপদে। আমার পা নাই। সকাল থেইকা ঘুরতাছি, কিন্তু যাত্রী নাই। আমি সারা দিন ঘুইরা জমার টাকাই উঠাইতে পারি নাই। জমার টাকা না দিতে পারলে কালকে আর রিকশা পামু না। জমার টাকা দিলে বাজার করতে পারমু না, আবার বাজার করলে জমার টাকা দিতে পারমু না। করোনার পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতে পড়লাম।’

মোশারফ বা আলিমের মতো আরও কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা সবাই দেশে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তাদের টানপোড়েনের কথা তুলে ধরেন। কারফিউর জন্য অফিস-আদালত সবকিছুই বন্ধ, যার ফলে সাধারণ মানুষ বাসা থেকে কম বের হচ্ছেন। সাধারণ সময়ে যেখানে একজন রিকশাচালক দিনে কমপক্ষে ১ হাজার টাকা আয় করতেন, সেখানে এখন টেনেটুনে ৫০০ টাকা আয় করাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।

মনজুর হোসেন নামে একজন রিকশাচালক বলেন, ‘রিকশার চাকা ঘুরলেই আমাদের সংসার চলে। গত তিন দিন ধরে পেটের দায়ে বের হই, কিন্তু ভাড়া নাই, থাকলেও যাত্রী ভাড়া কম কয়। এমন চলতে থাকলে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’ 
আরেক রিকশাচালক হোসেন বলেন, ‘আন্দোলন হলে আমাদের সমস্যা। আমরা দিন আনি দিন খাই, এখন ইনকাম না থাকলে খাব কী। দেশের এই অবস্থায় আমরা আছি বিপদে।’

গত ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে এলেও গত ১৩ জুলাই থেকে এই আন্দোলন ঘিরে টানা কয়েক দিন সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হলেও তেমন কোনো সুফল মেলেনি। শেষে গত ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে দেশ জুড়ে কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

গতকাল টানা তৃতীয় দিনের কারফিউ চলাকালে দেশ জুড়ে সহিংসতাময় পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হলেও সরকারি-বেসরকারি অফিস, শপিংমল বন্ধ থাকায় অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে দিন এনে দিন খায় এমন শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। তাদের একটি শ্রেণি রিকশাচালকরা। যাদের প্যাডেলের চাপে চলে সংসার। চলমান কারফিউয়ে সেই রিকশা চালকদের আয় প্রায় বন্ধ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় রিকশা চলাচল করছে কম। ঝুঁকি নিয়েও যারা রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন তাদের যাত্রীর অভাবে আয় হচ্ছে কম। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক করার দাবি জানান নিম্নবিত্তের এই মানুষরা। এ ছাড়া তাদের জন্য সরকারি প্রণোদনার দাবি জানান।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ভ্যান দিয়ে মালামাল টানার কাজ করেন ইউনুস। চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাজারে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মালামাল কম আসায় আয় কমেছে ইউনুসের। তার ছয় সদস্যের পরিবারে তিনি বাদে বাকি পাঁচজন থাকে বাড়িতে। বাড়িতে টাকা না পাঠাতে পারলে পরিবারের সদস্যরা কী খাবে, তা ভেবে কূল পাচ্ছেন না ইউনুস।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ নাই মানে খাবার নাই। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আমি কী খাব, পরিবার কী খাবে জানি না।’
মনজুর হোসেন নামে এক রিকশাচালক বলেন, ‘আমার পরিবারের সব সদস্য গ্রামের বাড়িতে থাকে। গতকাল টাকা চাইছে, দিতে পারি নাই। পরে এলাকার একজনের থেকে ধার নিছে। কী করব? চলতে তো হবে।’

এদিকে রিকশা জমার টাকা নিয়ে মালিকের জোরজবরদস্তির ঘটনা থাকলেও চলমান পরিস্থিতিতে যেন ‘মানবিক’ করেছে কিছু কিছু মালিককে। কারফিউর মধ্যে কিছু মালিক জমার টাকা না নিয়েই চালাতে দিচ্ছেন রিকশা। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরিশোধ করতে হবে সেই টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত