গাজা যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্ষদের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় যুদ্ধাপরাধ করছে ইসরায়েল। জাতিসংঘ সমর্থিত স্বাধীন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ইচ্ছাকৃত ভারী অস্ত্রের ব্যবহার ও বেসামরিক জনগণের ওপর ইচ্ছাকৃত এবং সরাসরি আক্রমণ করা হয়েছে। জাতিসংঘের এমন প্রতিবেদন সামনে আসার সময়ই গাজার আরও গভীরে প্রবেশ করেছে ইসরায়েলি ট্যাংক বহর। গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্য গাজায় ঘটেছে হতাহতের ঘটনা। এর মধ্যে গত বুধবার অবশ্য ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান মুখপাত্র ডেনিয়েল হ্যাগারি বিস্ফোরক এক মন্তব্য করেছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী যখন বারবার বলছেন, হামাসকে নির্মূল না করা পর্যন্ত তাদের অভিযান বন্ধ হবে না, সেখানে হ্যাগারি বললেন, হামাসকে নির্মূল করার যে লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় গত আট মাস ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, তা পূরণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, হামাস একটি আদর্শ। হামাস একটি দল। এর অবস্থান জনগণের হৃদয়ে, যারাই মনে করেন আমরা হামাসকে নির্মূল করতে পারি তারা ভুল করছেন।
টাইমস অব ইসরায়েল জানায়, আইডিএফ মুখপাত্র দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল থার্টিন নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘হামাসকে ধ্বংস করা বা নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা এক কথায় বলতে গেলে তা জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার মতো।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলি সরকার যদি বিকল্প না পায়, তাহলে হামাস গাজায় থেকে যাবে।
আইডিএফ মুখপাত্রের এমন মন্তব্যের জেরে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বার্তায় জানিয়েছে, যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা হামাসের সামরিক ও দেশ চালানোর সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাজ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা।
আইডিএফ মুখপাত্রের কার্যালয় এক বার্তায় বলেছে, সামরিক বাহিনী সরকারের যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আইডিএফ মুখপাত্র ‘হামাসের মতাদর্শ’ নিয়ে কথা বলেছেন। এর বাইরে কেউ কিছু ভাবলে তা সেই সাক্ষাৎকারের ভুল ব্যাখ্যা হবে বলেও বার্তায় মন্তব্য করা হয়।
তবে টাইমস অব ইসরায়েল বলছে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্রের এমন মন্তব্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে টানাপড়েন আরও বাড়িয়ে দেবে।
এদিকে গাজায় বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করছে বলে বলছে জাতিসংঘ। গত বুধবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্ষদের অধিবেশনে গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় সংঘটিত ঘটনা নিয়ে ওই প্রতিবেদনের ওপর আলোচনা হয়। অধিবেশনে পর্ষদের চেয়ারপারসন নাভি পিল্লাই বলেন, ইসরায়েল জোর করে গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীকে ছোট আবদ্ধ এলাকায় ঠেলে দিয়েছে, যা অনিরাপদ এবং বসবাসের অযোগ্য। তিনি বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতার অস্ত্রের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার দৃশ্যত বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ইচ্ছাকৃত ও সরাসরি হামলাই ছিল।
পিল্লাই আরও বলেন, কমিশন এ উপসংহারে পৌঁছেছে যে, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার নির্দিষ্ট রূপগুলোও ইসরায়েলি বাহিনীর পরিচালনা পদ্ধতির অংশে দেখা গিয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণের শুরু থেকেই ইসরায়েল দাবি করে আসছে, শুধু হামাসকে নির্মূল করাই ইসরায়েলের উদ্দেশ্য। ইসরায়েলের এ দাবিকে অযৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করে পিল্লাই বলেন, যদিও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন যে, গাজায় তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য হামাসকে ধ্বংস করা এবং জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া, তবুও হাজার হাজার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এ উদ্দেশ্যগুলোর কোনোটিই মূলত অর্জিত হয়নি।
তিনি জানান, কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়কে অপমানিত এবং আরও অধস্তন করার উদ্দেশ্যে যৌন এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা করেছে। ফিলিস্তিনি নারীরা অনলাইনে এবং ব্যক্তিগতভাবে যৌন সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি পুরুষরা যৌন এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাসহ অত্যাচার ও নির্দিষ্ট নিপীড়নমূলক আচরণের মধ্য দিয়ে গেছে।
