বন্যার পানি কমলেও বেড়েছে দুর্ভোগ

আপডেট : ২২ জুন ২০২৪, ০১:৫৬ এএম

সিলেটসহ বিভাগের অন্যান্য জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং উজানের ঢল কমে আসায় গতকাল শুক্রবার সুরমা, কুশিয়ারাসহ সিলেট অঞ্চলের অধিকাংশ নদনদীর পানির উচ্চতা কিছুটা কমে আসে। তবে এখনো অনেক স্থানে নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে রয়েছে। বন্যায় প্লাবিত এলাকাগুলোর মধ্যে কিছু এলাকার পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ বেড়েছে মানুষের। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঢলের পানিতে তলিয়ে গিয়ে ভেসে গিয়েছে ঘরে থাকা ধান-চাল, গৃহপালিত পশু ও আসবাবপত্র। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ ও তলিয়েছে ফসলি জমি। সিলেট বিভাগে এখনো পানিবন্দি হয়ে চরম কষ্টে দিন পার করছে ২০ লাখের বেশি মানুষ। কোথাও কোথাও জেলা সদরের সঙ্গে এখনো সড়ক পথে যোগাযোগ বিছিন্ন রয়েছে।

এদিকে উজানের ঢল না থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলেও তিস্তাসহ অধিকাংশ নদনদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে উজানের ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীসহ সব নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যার প্রভাবে যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে নদীতীরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বাড়িঘরসহ বেঁচে থাকার সম্বল হারিয়ে দরিদ্র মানুষজন মানবেতর জীবনযাপন করছে।

সিলেট নগরীর অধিকাংশ জায়গা থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও ময়লা-আবর্জনা আর নোংরা পানিতে একাকার হওয়া বাসাবাড়ি, দোকানপাট পরিষ্কারে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। এ ছাড়া নগরীর শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগ, ছড়ারপাড়, যতরপুর, শেখঘাট, তালতলা, জামতলাসহ অনেক এলাকার বাসাবাড়িতে এখনো বন্যার পানি রয়েছে।

সিলেট সদর উপজেলা এবং জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলার বন্যাকবলিতরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে রয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করেছেন বন্যাকবলিতরা। অবশ্য সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান জানিয়েছেন, বন্যাদুর্গতদের কষ্ট লাঘবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

কয়েক দিনের একটানা বর্ষণের পর গতকাল দিনভর সিলেটের আকাশ ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। সিলেট আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা সজীব হোসাইন জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও বৃষ্টিপাত কমেছে। এ অবস্থায় সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, গতকাল সকাল ৯টায় সুরমা নদীর পানি কানাইঘাটে বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, এর আগে গত বৃহস্পতিবার সেখানে পানি বিপদসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। আর কুশিয়ারা নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলশীদে গতকাল বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল, গত বৃহস্পতিবার ছিল বিপদসীমার ৮১ সেন্টিমিটার ওপরে।

জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, সিলেট জেলায় বর্তমানে সাড়ে ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বাড়িঘরে পানি উঠে পড়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।

সিলেটবাসীকে বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। গতকাল সকালে সিলেট নগরীর কিন ব্রিজ এলাকায় সুরমা নদী পরিদর্শনকালে এ তথ্য জানান তিনি। এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামীতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত এলাকাকে কীভাবে রক্ষা করা যায় সে লক্ষ্যে সরকার পদক্ষেপ নেবে।

ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত কম ও পাহাড়ি ঢল কম নামায় সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদনদীর পানি আর বাড়েনি। গত বৃহস্পতিবার সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও গতকাল তা নেমে দাঁড়ায় ৪ সেন্টিমিটারে। তবে নদীর পানি কিছুটা কমে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি বন্যাদুর্গতদের। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, তাহিরপুরসহ সাত উপজেলার ৭৮টি ইউনিয়নের ১০১৮টি গ্রাম ঢলের পানিতে তলিয়ে গিয়ে ভেসে যায় ঘরে থাকা ধান-চাল, গৃহপালিত পশু ও আসবাবপত্র। ভেসে গেছে এসব জনপদের পুকুরের মাছ ও তলিয়েছে ফসলি জমি। পানিবন্দি হয়ে এখনো চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে জেলার ১০ লাখ মানুষ। জেলা সদরের সঙ্গে এখনো সড়কপথে যোগাযোগ বিছিন্ন রয়েছে তাহিরপুর উপজেলার। এ ছাড়া ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুরসহ কয়েকটি উপজেলার সঙ্গে দুর্গম এলাকার ৪০টিরও বেশি গ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বন্যার ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে পানিবন্দি মানুষরা আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও সেখানে গিয়ে তাদের পড়তে হয়েছে নতুন ভোগান্তিতে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবারের অভাব ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে বন্যাদুর্গতরা।

হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি কমলেও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ছয়টি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে নবীগঞ্জ, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও মাধবপুর। এলজিআরডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম জানান, বন্যায় জেলায় ৫৭ কিলোমিটার পাকা সড়কের ক্ষতি হয়েছে।

বৃষ্টি আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনা সদর, বারহাট্টা ও কলমাকান্দার শতাধিক গ্রামের নিম্নাঞ্চলের লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। এখন পর্যন্ত এসব এলাকায় ২৫০টির মতো পরিবারের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কলমাকান্দার কিছু এলাকার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। জেলার কলমাকান্দায় বন্যার পানিতে ডুবে রিফাত হোসেন (১০) নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মারা গেছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে বাড়ির সামনে প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায় সে।

উত্তরাঞ্চলে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প নীলফামারীর তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি গতকাল বেলা ৩টায় বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ভাটিতে রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে ওই সময় বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পাউবো কর্মকর্তারা জানান, উজানের ঢল না থাকায় তিস্তাসহ বিভিন্ন নদনদীর পানি নেমে যেতে শুরু করেছে। ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি কমে আসায় নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কাউনিয়া পয়েন্টে নিম্নাঞ্চলের চর এলাকায় ফসলের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিস্তা নদীপাড়ের এসব ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় চাষিদের খোঁজ নেননি কৃষি কর্মকর্তাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের জন্য কৃষি প্রণোদনার বরাদ্দ ঠিকমতো পৌঁছে না বলে অভিযোগ করেন শিবদেব এলাকার কৃষক ফারুক হোসেন।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার তীরবর্তী গদাই গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশত বসতবাড়ি নদীর কিনারায় ভাঙনের মুখে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বাড়িগুলো নদীতে বিলীন হতে পারে। অনেকে নিজ উদ্যোগে বস্তায় বালু ভরে নদীতে ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে ভাঙন ঠেকাতে পাউবো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীসহ সব নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে দেড় শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার সম্বল হারিয়ে মানুষজন মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ ছাড়া কাজীপুর উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলার চর ও নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করায় চরাঞ্চলের ফসিল জমি তলিয়ে যাওয়া শুরু করেছে।

শাহজাদপুরের জালালপুর ইউনিয়নের আবদুস সালাম বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে পদক্ষেপ না নিলে এ এলাকার অন্তত সাতটি গ্রাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।’

কাজীপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক আলতাব হোসেন বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে তিলের আবাদ করেছি। যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে ফসল ঘরে তুলতে পারব কি না, জানি না। এ ছাড়া পাট নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি।’

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট এবং সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত