মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। সৃষ্টিজীবের মধ্যে মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ও আপন। সাধরাণত প্রিয় ও আপনদের সঙ্গে হয় ভালোবাসা ও প্রেম বিনিময়। আল্লাহতায়ালা প্রেম-ভালোবাসা বিনিময়ের জন্যই সৃষ্টি করেছেন মানুষকে। আর বান্দার জন্য আল্লাহকে প্রেম-ভালোবাসা নিবেদনের প্রধান মাধ্যম হলো ইবাদত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমারই ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬)
আয়াতের বাচনভঙ্গি থেকে বুঝা যায়, মানুষ সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার হুকুম পালন করবে। ইতিহাসে পাওয়া যায়, পৃথিবীর এমন কোনো স্থান বাকি নেই, যেখানে ইবলিশ সেজদা করেনি। কিন্তু নাফরমানি করার কারণে পৃথিবীর ভূমি থেকে বিতাড়িত করে ফেরেশতাদের মাধ্যমে বনে-জঙ্গলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। অপরদিকে ফেরেশতারাও আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে সামান্যতম কমতি করেনি। কিন্তু তাদের সঙ্গে আল্লাহর কাক্সিক্ষত প্রেম-ভালোবাসা জন্মেনি। তখন মানুষ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি পৃথিবীতে (মানুষকে) আমার প্রতিনিধি করব।’ (সুরা বাকারা ৩০) এরপর তিনি প্রিয় মাখলুক মানবজাতিকে সৃষ্টি করলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে।’ (সুরা ত্বিন ০৪)
পূর্বের আলোচনা থেকে জেনেছি, আল্লাহর ইবাদতের জন্য মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ আল্লাহর গোলামি করবে, তার দাসত্ব করবে, তিনি এমনটিই চান। আর এর মাধ্যমেই যেহেতু কাক্সিক্ষত ভালোবাসা এবং প্রেম নিবেদন পুরোপুরি প্রকাশ পায় তাই পবিত্র কোরআনে বারবার এ কথাই বলা হয়েছে।
এখানে আমাদের লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমরা আল্লাহর ইবাদত করি। আমাদের সেই ইবাদত একনিষ্ঠভাবে তার সন্তুষ্টি লাভের জন্য হতে হবে। লোক দেখানোর উদ্দেশে আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে তা যেন নি®প্রাণ হয়ে না যায়। অবশ্যই এ বিষয়ে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, অন্যথায় নিষ্প্রাণ ইবাদত কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। যেমন আমরা নামাজ পড়ি, কোরআনে বলা আছে ‘নামাজ গুনাহ থেকে ফেরায়’ বাস্তবে দেখা যায়, আমরা নামাজও পড়ি, আবার গুনাহও করি। যে নামাজ আমাকে গুনাহ থেকে ফেরাতে পারে না, কোন অর্থে তাকে নামাজ বলতে পারি?
লোক দেখানো নামাজ বা অন্য কোনো ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম হয় না। মূলত লোক দেখানো ইবাদত মুনাফিকদের অভ্যাস। জনসম্মুখে খুব ভালোভাবে ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা পালন করলেও বস্তুত তাতে প্রাণ বলতে কিছু নেই। এমন ইবাদতকারীর বিরুদ্ধে কোরআনে কঠিন সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ ওই নামাজিদের, যারা তাদের নামাজে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য তা আদায় করে।’ (সুরা মাউন ৪-৬) তাই ইবাদতের ক্ষেত্রে আন্তরিক হওয়া কাম্য। কেননা তা একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদন করা হচ্ছে।
দ্বীনের শাখাগত আমলগুলোর মধ্যে নামাজের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা এটি যাবতীয় সৎকর্মের প্রাণ ও দ্বীনের স্তম্ভ। অন্যসব ইবাদত তথা সমগ্র জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপও একনিষ্ঠভাবে বিশ্ব পালনকর্তা আল্লাহর জন্য নিবেদিত হতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন! আমার নামাজ, আমার ইবাদত, আমার জীবন, আমার মরণ, সবই বিশ্ব পালনকর্তা আল্লাহর জন্য নিবেদিত।’ (সুরা আনআম ১৬২)
এটিই হচ্ছে পূর্ণ বিশ্বাস ও পূর্ণ আন্তরিকতার ফল। জীবনের প্রতিটি কাজে এবং অবস্থায় এ কথা মনে রাখা যে, সমগ্র বিশ্বের একজন পালনকর্তা আছেন, আমি তার গোলাম। তিনি দেখছেন, সর্বদা তার দৃষ্টির সামনে আমি ও আমরা। আমার অন্তর, মস্তিষ্ক, চোখ, কান, হাত, পা এবং প্রতিটি পদক্ষেপ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে পারে না। মানুষ যদি অন্তর ও মস্তিষ্কে এ মোরাকাবা ও ধ্যানকে সদা সর্বদা উপস্থিত রাখে তবে সে বিশুদ্ধ অর্থে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হতে পারবে। যাবতীয় পাপ ও অপরাধ থেকে পূতঃপবিত্র জীবনযাপন করতে পারবে।
