ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকান্ডের পর স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডির ব্যবসা সামনে আসে। এখন পর্যন্ত এ হত্যাকান্ডের মোটিভ জানা না গেলেও স্বর্ণ চোরাচালানের বিরোধকে বাতিল করেননি তদন্তকারীরা। তবে তদন্তের মোড় ঘুরে গেছে ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তারের পর। আর এ বিষয়টি আওয়ামী লীগের বড় অংশের নেতারা দেখছেন সন্দেহের চোখে। এ হত্যাকান্ডকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তারা ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। ক্ষুব্ধ ঝিনাইদহ জেলার সর্বস্তরের নেতাকর্মীরাও। তারা বলছেন, আনারের মতো বিতর্কিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) রূপ আড়াল করতে বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধে পরিণতি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সরোয়ার জাহান বাদশা, জীবন কুমার বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামসহ ওই জেলার বিভিন্ন উপজেলার এক ডজন নেতার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে কেউ রাজি হননি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলী ও সম্পাদকমন্ডলীর একাধিক নেতাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে থাকলেও প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত ১২ মে এমপি আনার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা যান চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত হয়ে। পরদিন থেকে তিনি নিখোঁজ হন। ১৮ মে কলকাতায় তিনি যে বন্ধুর বাড়িতে উঠেছিলেন সেই গোপাল বিশ্বাস বরাহনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এর কয়েক দিন পর কলকাতা পুলিশ জানায়, আনারকে নিউ টাউনের সঞ্জিভা গার্ডেন আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে খুন করা হয়েছে। এরপরই আনারের স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডির ব্যবসার বিষয়টি গণমাধ্যমে আসে।
এ হত্যাকান্ডে এখন পর্যন্ত পুলিশের কাছে ঝিনাইদহের আরেকটি উপজেলার আকতারুজ্জামান শাহীন মূল পরিকল্পনাকারী। বাংলাদেশে পুলিশের গোয়েন্দারা প্রথমে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে জানায়, তারা সরাসরি খুনে জড়িত। সর্বশেষ বাংলাদেশে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তারাও খুনের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। এ হত্যাকান্ডে এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে একজন ও নেপালে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মোট সাতজন সরাসরি খুনে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। বাকি দুজনের একজন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু। এর আগে গ্রেপ্তার করা হয় দলের জেলা শাখার ত্রাণ ও দুর্যোগবিষয়ক সম্পাদক কাজী কামাল আহম্মেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে। তারা খুনের পরিকল্পনায় জড়িত বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে। তবে গত বৃহস্পতিবার ডিএমপি ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ বলেছেন, এমপি আনার হত্যাকান্ডের মোটিভ এখনো তারা জানতে পারেননি। এখন পর্যন্ত তাদের কাছে মূল পরিকল্পনাকারী শাহীন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং হত্যাকান্ডের পর সেখানে পালিয়ে গেছেন। মূলত কাজী কামাল বাবু ও সাইদুল করিম মিন্টুকে গ্রেপ্তারের পর হত্যাকান্ডটিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করছেন সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
মিন্টু গ্রেপ্তারের পর থেকে ঝিনাইদহে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কাজী কামাল ও মিন্টুকে ঝিনাইদহ কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাদের নিয়ে ফেলে দেওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধারে অভিযান চালিয়েছে ডিবি। তবে উদ্ধার হয়নি। ওই ফোনে আনার হত্যার তথ্য আদান-প্রদানের আলামত রয়েছে বলে ডিবি মনে করছে।
ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সব স্তরের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েকজন সংসদ সদস্যের (এমপি) আসল চেহারা বেরিয়ে যাওয়ার ভয় থেকেই এ হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক রূপ দিতে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ২০১৪ সালের পর বিতর্কিত বেশ কিছু এমপি দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। যারা বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকান্ড, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। আনার হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে নেতিবাচক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িতরা চাপে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের একটি অংশের নেতারা বিতর্কিত সেসব এমপিকে রক্ষার কৌশল নিয়ে কাজ করছেন। তাই আনার হত্যাকান্ড রাজনৈতিক বলে প্রমাণ করতে চায় ওই অংশটি।
ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, চোরাকারবার নিয়ে বিরোধের বাইরে আনার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকার কোনো সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাও দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০ জনকে বাঁচাতে রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। মিন্টু একজন ব্যক্তি নয়, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি বড় পদ রয়েছে। সুতরাং সবকিছুই ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নেওয়াই শ্রেয়।
আওয়ামী লীগের ওই কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, আনার হত্যার পুরো ব্যাপারটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ হত্যাকান্ড জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্যই। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের নেতারাও বলেন, হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখেও সহজে অনুমান করা যায় এটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এত বীভৎস হওয়ার নজির নেই।
আনারকে খুন করা হয়েছে বলে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানালেও তার লাশ এখনো উদ্ধার হয়নি। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, আনারকে হত্যার পর টুকরো টুকরো করে, মাংস কিমা করার মেশিনে গুঁড়া করে গুম করা হয়েছে। বাথরুমের প্যানে ফেলে দিয়ে ফ্ল্যাশ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। একপর্যায়ে নিউ টাউনের আবাসিক এলাকাটির সেপটিক ট্যাংক থেকে কিছু মাংসখন্ড ও অন্য একটি খাল থেকে হাড় উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আনারের কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ডিএনএ নমুনা দিতে আনারের মেয়ে কলকাতার যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি এখনো যাননি।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্য ও ঝিনাইদহ জেলা শাখার প্রভাবশালী নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক রূপ দিয়ে এমপির আসল রূপ আড়াল করতে চায় বিভিন্ন মহল। দলের ভেতরে আনারের মতো এমপিদের নিরাপদ রাখাও হত্যাকান্ডটিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টার অন্যতম কারণ বলে তারা মনে করেন।
ওই নেতারা মনে করেন, যেসব মহল এ হত্যাকাণ্ডকে রাজনীতিক রূপ দিতে চায়, তারা মূলত আওয়ামী লীগের রাজনীতি ডোবাতে চায়, দুর্বল করতে চায় আওয়ামী লীগকে।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডেলীর আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাসিনোকান্ড, কভিড-১৯ মহামারীর দুঃসময়েও রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। তিনি বলেন, কভিডকালে দলের অনেক নেতা ও জনপ্রতিনিধিকে চোর হিসেবে আখ্যায়িত করার সংস্কৃতি চালু হয়। রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ করার যে অপকৌশল দেশে সৃষ্টি হয়েছে, সেটি ভীষণ ভয়ানক হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওই অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী, মূলত স্বর্ণ চোরাচালান, হুন্ডি ও মাদক কারবারির দ্বন্দ্বেই আনার খুন হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর ১৬ জানুয়ারি চোরাকারবারি শাহীনের প্রায় ৫০ কেজি স্বর্ণের চালান নেপাই ইউনিয়নের বাগাঢাঙ্গা গ্রামের সীমান্তে আটক হয়। এটি আটক হওয়ার পর আনারের লাইনম্যান তরিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে হামলাও করে শাহীনের লোকজন। ওই ঘটনায় লাইনম্যানের গুলিতে শাহীনের দুই লোক মারাও যান। তারা হলেন শামীম হোসেন ও মন্টু মন্ডল। আনারের কারণে শাহীনের চোরাকারবার প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। অন্যদিকে আনার নির্বিঘ্নে স্বর্ণ চোরাচালান করে যাচ্ছিলেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এক সময় ঢাকা থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত আনারের স্বর্ণের বার বহনকারী ছিল সাধারণ মানুষ। এক-দুটি বারই তারা বহন করত। ঝিনাইদহ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলেই বারপ্রতি ১৬-১৮ হাজার টাকা পেত। একইভাবে শাহীনও এ কারবার করতেন। কিন্তু আনার গত এক বছরে ঢাকা থেকে স্বর্ণ ঝিনাইদহ সীমান্ত পর্যন্ত নেওয়ার নিরাপদ ও নতুন রাস্তা বের করেন। ওই অঞ্চলের বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তির গাড়ি ব্যবহার করে ঢাকা থেকে কয়েক কেজি করে স্বর্ণ ঝিনাইদহ পর্যন্ত নেওয়া হতো। ঝিনাইদহ পর্যন্ত নেওয়া হলে ২০-৩০ লাখ পর্যন্ত টাকা পাওয়া যেত। যেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি এড়ানো সম্ভব তাই প্রভাবশালীদের গাড়ি স্বর্ণ বহনে ব্যবহার করা হতো। এ সুযোগ নিয়ে আনারের চোরাকাবরার ফুলে-ফেঁপে উঠতে থাকে। অন্যদিকে শাহীনের স্বর্ণ সীমান্তে ধরা পড়তে থাকে। ফলে শাহীন চক্রের টার্গেটে পরিণত হন আনার। এ ছাড়া, এ কারবারের বড় অঙ্কের টাকাও নয়ছয় করেন আনার। এ কারণে শাহীন চক্রের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনারের নির্বাচনী এলাকা কালীগঞ্জ উপজেলায় জোর করে হিন্দুদের জমি লিখে নেওয়ার বিরোধও এ হত্যাকান্ডের অন্যতম কারণ।
আনার হত্যাকান্ড আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে কি না, এমন প্রশ্নে দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাপারটা কিছুটা সেই রকম হবে। তবে ভয়াবহ এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
