‘আগুনে আহত হয়ে মা সকাল থেকে আইসিইউতে। ছোট বোন ভর্তি বার্ন ইউনিটে। বাবা গেছেন চোখের চিকিৎসা করাতে। আইসিইউর ডাক্তাররা বলেছেন আমার মায়ের অবস্থা ভালো নয়। আংকেল প্লিজ আমার মায়ের জন্য দোয়া করুন। আমার মা ছাড়া আমি বাঁচব না।’ গতকাল শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে আহাজারি করতে করতে কথাগুলো এ প্রতিবেদককে বলছিলেন কিশোরী আসিয়া রহমান। চট্টগ্রাম নগরীর রেয়াজউদ্দিন বাজারের একটি ভবনে লাগা আগুনের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে গতকাল ভোর ৬টা থেকে চমেক হাসপাতালের নিচতলায় আইসিইউতে ভর্তি আছেন আসিয়ার মা মেরিনা পারভীন (৩৪)। একই ঘটনায় আহত তার আট বছর বয়সী ছোট বোন জান্নাতুল হাজেরাকেও ভর্তি করা হয়েছে একই হাসপাতালের ছয়তলায় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডে। আগুনের ধোঁয়ায় আসিয়ার বাবা মো. আনিসুর রহমানেরও চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে রেয়াজউদ্দিন বাজারের রেজোয়ান কমপ্লেক্সে লাগা ওই আগুনে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা গেছেন তিনজন। নিহত তিনজনেরই বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন মেরিনা পারভীন, তার শিশুকন্যা জান্নাতুল হাজেরা ও স্বামী আনিসুর রহমান। সৌভাগ্যক্রমে আগুনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পায় মেরিনার বড় মেয়ে কিশোরী আসিয়া রহমান ও এক বছরের শিশু সন্তান ফোরকান।
গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় চমেক হাসপাতালের ছয়তলায় ৩৬ নম্বর বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ২৪ নম্বর শয্যায় ঘুমাচ্ছে শিশু জান্নাতুল হাজেরা। তার হাতে লাগানো ক্যানুলা। শয্যাপাশে ছোট ভাই ফোরকানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বড় বোন আসিয়া রহমান। প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে অবস্থান করেন এই প্রতিবেদক। দেখা যায়, মায়ের চেতনা ফিরেছে কি না দেখতে ছোট ভাই ফোরকানকে আরেকজনের কোলে দিয়ে আসিয়া একবার ছুটছে নিচতলার আইসিইউতে, আরেকবার উঠছে ছয়তলায় ছোট বোন হাজেরাকে দেখতে। আগুনের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে মাদ্রাসাপড়ুয়া আসিয়ার। আহাজারি করতে করতে মায়ের জন্য দোয়া প্রার্থনা করে। জানায়, আগুনে বাবা-মা ও বোনের আহত হওয়ার খবর পেয়ে গ্রামের বাড়ি যশোর থেকে তার দাদা-দাদি চট্টগ্রামের পথে রওনা হয়েছেন। কিন্তু এখনো এসে পৌঁছাননি।
আসিয়া পড়াশোনা করে নগরের বাকলিয়া থানা এলাকার কল্পলোক আবাসিকের আলহেরা দাখিল মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে। ছোট বোন জান্নাতুল হাজেরা পড়ে নগরের লালখান বাজার এলাকার একটি মাদ্রসায় প্রথম শ্রেণিতে। তাদের পৈতৃক বাড়ি যশোরের মনিরামপুর থানার হানুয়ার গ্রামে। কয়েক বছর আগে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে এসে বসবাস শুরু করেন আসিয়ার বাবা আনিস।
জানা গেছে, দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে রেয়াজউদ্দিন বাজারের রেজোয়ান কমপ্লেক্সের ছয়তলায় চার কক্ষের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন আনিস। তিনি ইমিটেশন গয়নার ব্যবসা করেন। তার কিশোরী কন্যা আসিয়া জানায়, তার বাবা চার কক্ষের মধ্যে দুটি কক্ষ ব্যবহার করেন গয়না তৈরির কারখানা হিসেবে। বাকি দুটির মধ্যে একটিতে ছোট বোন জান্নাতুল হাজেরাকে নিয়ে থাকে সে। ছোট ভাই ফোরকানকে নিয়ে অন্য কক্ষে থাকেন বাবা ও মা।
আগুন লাগার সময়কার পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে আসিয়া বলে, ‘বৃহস্পতিবার রাতে খাবার খেয়ে ছোট বোন হাজেরাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। বাবা ও মা এবং ছোট ভাই ফোরকান ছিল তাদের রুমে। রাত তখন দেড়টা হবে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। জেগে উঠে দেখি পুরো কক্ষ ধোঁয়ার কু-লীতে আচ্ছন্ন। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ভবনের নিচে লোকজন চিৎকার করছিল। তবে কেন চিৎকার করছিল তা বুঝতে পারছিলাম না। এ সময় পাশের কক্ষে বাবা ও মা ছোট ভাইকে নিয়ে অঘোর ঘুমে। তাদের কক্ষের কাছে চিৎকার করলে বাবা ও মা জেগে ওঠেন। পুরো ঘরে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হতে দেখে ভবনে আগুন লেগেছে বলে চিৎকার করতে থাকেন আমার বাবা। এরপর মূল দরজা খুলতেই ধোঁয়ার বিশাল কু-লী ঢুকে যায়।’
ঘরে ধোঁয়ার বড় কুন্ডলী ঢোকার পর বাবা সবাইকে নিয়ে ভবনের ছাদে উঠে আশ্রয় নিতে বলেন জানিয়ে আসিয়া বলে, ‘প্রথমে ছোট ভাইকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন মা। কিন্তু ধোঁয়ার কারণে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সিঁড়ির ধাপগুলো দেখা যাচ্ছিল না। তবু দুবার ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মা। কিন্তু আগুনের প্রভাবে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে যায় সিঁড়ির ধাপগুলো। একপর্যায়ে আমার বাবা সবাইকে নিয়ে ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ধোঁয়ার কারণে সিঁড়িতেই মা, বাবা ও ছোট ভাইবোনকে হারিয়ে ফেলি। তবু মনোবল হারাইনি। অন্ধকার সিঁড়ির পথ হাতড়ে ছাদে উঠতে সক্ষম হই। সেখানে গিয়ে দেখি ভাই ফোরকানকে কোলে নিয়ে বাবা কাঁদছেন। আমাকে বলছেন, “তোমার মা ও ছোট বোনকে বাঁচাতে পারলাম না”।’
ছাদে ওঠার পর তাদের উদ্ধার করার জন্য পাশের ভবন থেকে প্রতিবেশী কিছু লোক মই লাগিয়ে দেন জানিয়ে আসিয়া বলে, ‘সেই মই দিয়ে একজন একজন করে পাশের ভবনে চলে যাই। ভোর তখন ৫টা হবে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর পর মা এবং ছোট বোন হাজেরার ছয়তলায় আটকে পড়ার কথা জানাই। এরপর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ছয়তলায় আমাদের বাসায় গিয়ে ছোট বোন ও মাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে বাবা ফিরে এলেও তার চোখের প্রচণ্ড ক্ষতি হয়েছে।’
