বে টার্মিনালের জন্য আশীর্বাদ ১৪১ বছরের সেই ডুবোচর

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৪, ০৫:০৪ এএম

১৪১ বছর আগে ব্রিটিশ রয়েল নেভির জরিপে বঙ্গোপসাগরে চরটির অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এই চরকে অক্ষত রেখে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ বা স্রোত প্রতিরোধক ও চ্যানেল নির্মিত হবে। চর ও স্থলভাগের মধ্যবর্তী অংশে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য এ চ্যানেল হচ্ছে। আর তা করতে ৭ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ঋণ সহায়তার অনুমোদন দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

চট্টগ্রামের আগামীর বন্দর বলে খ্যাত বে টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাই করা হয়েছে ইপিজেড ও দক্ষিণ কাট্টলী রাসমণি ঘাটের মধ্যবর্তী সাগর উপকূলের চরকে কেন্দ্র করে। প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই চরটি ভাটার সময় ভেসে ওঠে, জোয়ারের সময় ডুবে যায়। কয়েক বছর আগেও জোয়ার-ভাটা উভয় সময়ে তা ডুবে থাকত। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের কোথায় কত গভীরতা রয়েছে এবং কোথায় চর বা দ্বীপ রয়েছে, তা উল্লেখ করে একটি ম্যাপ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮৫ সালের ১ জুলাই (চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল)। ১৮৮৩ সালে সার্ভে সম্পন্ন করার পর লন্ডন থেকে ম্যাপটি প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ম্যাপে বর্তমান হালিশহরের বিপরীত পাশে সাগরের দিকে চরটিকে দেখানো হয়েছে। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান ম্যাপেও একই চর দেখানো রয়েছে। চর ও স্থলভাগের মধ্যে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরত্ব রয়েছে বলে বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ থেকে জানানো হয়। আর এই দেড় কিলোমিটার অংশে এখন নির্মিত হবে বে টার্মিনালের চ্যানেল ও চরের জায়গায় ব্রেক ওয়াটার।

ব্রেক ওয়াটারের ওপর ভিত্তি করে বে টার্মিনালের কাজ এগিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক বে টার্মিনালের ব্রেক ওয়াটার ও এক্সেস চ্যানেল (জাহাজ চলাচলের পথ) নির্মাণে ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। এতে আমরা জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য অর্থের জোগান পেয়ে গেলাম। এর আগে টার্মিনাল নির্মাণের জন্যও অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। তাই বে টার্মিনাল নিয়ে এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই।’

বে টার্মিনালে চারটি টার্মিনালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মাল্টিপারপাস টার্মিনাল (১৫০০ বর্গমিটার) নির্মাণ করবে। আর বন্দরের প্রকল্পটিতে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে আবুধাবি পোর্ট। এ ছাড়া একটি টার্মিনাল (১২২৫ বর্গমিটার) নির্মাণ করবে পোর্ট অব সিঙ্গাপুর। অন্যটি (১২২৫ বর্গমিটার) দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। দেশীয় কোম্পানি ইস্ট কোস্টের সঙ্গে বিদেশি চারটি কোম্পানি যৌথভাবে বিনিয়োগ করবে অয়েল টার্মিনাল নির্মাণে। ফলে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বে টার্মিনাল।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালে আগামী এক বছরের মধ্যে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হবে। সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হবে লিকুইড বাল্ক টার্মিনাল (এলপিজি, এলএনজি, ফুয়েল ও পেট্রোক্যামিকেল) নির্মাণে।

এদিকে ব্রেক ওয়াটার ও জাহাজ চলাচলের চ্যানেল নির্মাণে বিশ^ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ অনুমোদন দেওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়া কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের একটি ঋণ চুক্তি হবে। সেই চুক্তির পর বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে একটি চুক্তি হবে। চুক্তির পরপরই ঠিকাদার নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।’

তিনি বলেন, ‘জার্মান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেলহর্ন বে টার্মিনালের ব্রেক ওয়াটার ও জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ে সমীক্ষা করছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত নকশায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।’

বে টার্মিনালের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী রাফিউল আলম বলেন, ‘প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রেক ওয়াটার ও আট কিলোমিটার দীর্ঘ হবে চ্যানেল। চ্যানেলের চওড়া হবে প্রায় ৫৫০ মিটার।’

হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চর ও সাগরের তীরের মধ্যবর্তী জলভাগ প্রায় ৮০০ মিটার চওড়া। এই অংশে বর্তমানে গভীরতা রয়েছে ছয় থেকে সাত মিটার। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে তা ১২ মিটারে উন্নীত করা হবে। আর ডিজাইন অনুযায়ী, জাহাজ ঢুকবে ইপিজেড প্রান্ত দিয়ে। সেই অংশে ডুবোচর ও সাগরতীরের মাঝের অংশে জাহাজ যাতায়াতের চ্যানেল তৈরি করা হবে। একই চ্যানেল দিয়ে জাহাজ প্রবেশ করে জেটিতে পণ্য খালাসের পর আবারও একই পথ দিয়ে জাহাজ বের হয়ে যাবে। এ চ্যানেলটি চওড়া হবে ৫৫০ মিটার। জাহাজ চলাচলে তখন জোয়ার-ভাটার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে না। অর্থাৎ যেকোনো সময় জাহাজ চলাচল করতে পারবে।

ব্রেক ওয়াটার কী?

চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি ও প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমণি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বে টার্মিনাল। এর মধ্যে ইপিজেডের পেছন দিকে সাগরের প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি আকারে দুটি চর রয়েছে। এই চর দুটি (ব্রিটিশ ম্যাপে যে চরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে) ভাটার সময় প্রায় ডুবে যায়। কিন্তু চর ও উপকূলের মধ্যবর্তী অংশে পানির গভীরতা ছয় থেকে সাত মিটার। সাগরের ভেতরের এই দুই চরকে শাসন করে ১৪ মিটার চওড়া ও পাঁচ থেকে ছয় মিটার উচ্চতার দেয়াল নির্মাণ করা হতে পারে। আর এই দেয়ালই হচ্ছে ব্রেক ওয়াটার বা স্রোত প্রতিরোধক। উপকূলের অংশে নির্মাণ হবে জেটি। জেটি ও ব্রেক ওয়াটারের মধ্যবর্তী জায়গায় এসে জাহাজগুলো প্রবেশ করবে।

ব্রেক ওয়াটার কেন প্রয়োজন

সাগর থেকে আসা বড় বড় ঢেউয়ের আঘাতে যাতে জেটি নষ্ট না হয়, সেজন্য দূর থেকেই ঢেউটিকে বাধা দেওয়ার জন্য ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করতে হয়। বিশ্বের অনেক বন্দরে কৃত্রিমভাবে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করতে হয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কৃত্রিম ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করতে হয়েছে। যাতে সাগরের ঢেউ ও উপকূলের পলি এসে চ্যানেলে জমতে না পারে। কিন্তু বে টার্মিনালের সাগরের অংশে এ ধরনের একটি চর থাকাতে প্রাকৃতিকভাবেই ব্রেক ওয়াটার সুবিধা পাওয়া গেছে। এখন শুধু এই প্রাকৃতিক চরকে শাসন করে ব্রেক ওয়াটারটিকে আরও একটি শক্তিশালী করা হবে। এর ফলে উপকূলের দিকে থাকা জেটি নিরাপদ থাকবে।

হালিশহরের ইপিজেড থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমণি ঘাট পর্যন্ত সাগরের ভেতরের প্রায় ২ হাজার ৩০০ একর জায়গায় বে টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে বে টার্মিনাল অপারেশনে যাওয়ার পরিকল্পনায় রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত