ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম জোনায়েত সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বাবা মারা যান ২০১০ সালে। তার পেনশন ও ওয়ারিশ সনদ তৈরি করতে ২০২২ সালে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করেন জোনায়েত। বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরার পর জানতে পারেন, এসব কাজে তার বাবার মৃত্যু সনদ লাগবে।
এজন্য সিটি করপোরেশন অফিসে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে জানানো হয়, অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে মৃত ব্যক্তির জন্ম সনদ লাগবে। জোনায়েত তার বাসায় থাকা জন্ম সনদের কপি জমা দেন। কিন্তু দায়িত্বরতরা জানান, এই জন্ম সনদে কাজ হবে না। নতুন করে তৈরি করতে হবে। মৃত ব্যক্তির এই সন্তান বিস্মিত হন। ১২ বছর আগে যিনি মারা গেছেন, তার জন্ম সনদ নতুন করে কীভাবে তৈরি হবে? তখন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এখানে-ওখানে ঘুরে মৃত বাবার জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি করেন। এরপর মৃত্যু সনদ নিয়ে আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করেন।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জোনায়েতের স্ত্রীর মৃত্যু হয়। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে রাখা টাকা তুলতে গিয়েও তিনি একইরকম জটিলতায় পড়েন। আবারও স্ত্রীর জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে মৃত্যু সনদ নিতে হয় তাকে।
রাজধানীর জুরাইনের বাসিন্দা আকলিমা খাতুনের স্বামী পারভেজ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহায়ক পদে চাকরি করতেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি মারা যান। এরপর তার পেনশনের টাকা তুলতে আকলিমা খাতুনকেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়।
গতকাল মঙ্গলবার কথা হয় জোনায়েতের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আব্বার মৃত্যুর সনদ তুলতে গিয়ে রীতিমতো অবাক হয়েছি। মৃত ব্যক্তির আবার জন্ম নিবন্ধন তৈরি করতে হবে, এটা কখনো কল্পনাও করিনি। সব সিস্টেম আপডেট হচ্ছে। এই জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়াও আপডেট হওয়া প্রয়োজন।’
আকলিমা খাতুন বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর পেনশনের জন্য মৃত্যু সনদ আনতে যাই। তখন সিটি করপোরেশন থেকে জানানো হয়, এই জন্ম নিবন্ধন চলবে না। নতুন করে বানাতে হবে। বাধ্য হয়ে মরা মানুষটার জন্ম নিবন্ধন করেছি।’
শুধু আকলিমা বা জোনায়েতই নন, জন্ম নিবন্ধন নিয়ে ভোগান্তির শিকার হননি, এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। তবে এ ভোগান্তি যে মৃত্যুর পরও পোহাতে হবে, তা হয়তো জোনায়েতের মতো অনেকেরই অজানা। বিশেষ করে অনলাইনে জন্ম সনদ না থাকলে কোনো কাজই কারতে পারছেন না। ভুক্তভোগীরা এ প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানালেও কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা আইন ও বিধির আলোকে সব কাজ করছেন। এর বাইরে যাওয়ার খুব সুযোগ নেই। রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. যাহিদ হোসেন (অতিরিক্ত সচিব) দেশ রূপান্তরকে বলেন, মৃত্যু নিবন্ধন দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো ওই লোকের জন্ম নিবন্ধন থাকতে হবে। জন্ম নিবন্ধন না থাকলে মৃত্যু সনদ দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।
তিনি বলেন, ‘কোনো মৃত ব্যক্তির অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন না থাকলে, আমরা আগে তার জন্ম নিবন্ধন করে রেকর্ড রাখি। কিন্তু এই জন্ম নিবন্ধনের কোনো প্রিন্ট দিই না। এটা আমাদের রেকর্ডের জন্য সংরক্ষণ করি। এরপর মৃত্যু সনদ দেওয়া হয়। এটাই নিয়ম।’
এ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, ‘আমরা আইন ও বিধি অনুযায়ী চলি। চাইলেও এর বাইরে যেতে পারব না।’
যেভাবে পাওয়া যায় জন্ম-মৃত্যু সনদ : কারও জন্ম বা মৃত্যু সনদ লাগলে প্রথমে যেতে হয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার কার্যালয়ে। সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় সংস্থার স্বাস্থ্য বিভাগ বা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে হতাশ করে বলা হয়, অনলাইনে আবেদন করে নিয়ে আসুন। তাৎক্ষণিক বাইরে থেকে আবেদন করে বা অন্য কোনো দিন আবার যেতে হয় ওই দপ্তরে। এরপর মেলে কাক্সিক্ষত সনদ।
জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করে তা নিয়ে আবার ছুটতে হয় জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। নিবন্ধন কাজ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান করলেও সংশোধন করতে হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেতে হয়।
২০ ধরনের সেবায় ভোগান্তি : ভুক্তভোগীরা বলছেন, সার্ভারের ধীরগতি, নিবন্ধন ও ভুল সংশোধন পদ্ধতি জটিল এবং অনলাইন-অফলাইন পদ্ধতির গ্যাঁড়াকলে নাগরিকদের ভোগান্তির শেষ নেই। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ভোগান্তির ফলে সাধারণ মানুষকে ২০ ধরনের সেবা নিতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তবে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় বলছে, সেবা সহজ করতেই জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন অনলাইনে করা হচ্ছে।
১৭ কাজে জন্ম সনদ : সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৭ ধরনের সেবা পেতে জন্ম সনদের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে পাসপোর্ট, বিবাহ নিবন্ধন, বিদ্যালয়ে ভর্তি, সরকারি-বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় নিয়োগ, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জমি-ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংকে হিসাব খোলা, আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স প্রাপ্তি, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস ও টেলিফোন সংযোগ প্রাপ্তি, ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) প্রাপ্তি, ঠিকাদারের লাইসেন্স প্রাপ্তি, ভবনের নকশা অনুমোদন, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয় প্রাপ্তি এবং বয়স প্রমাণ করতে।
তিন কাজে মৃত্যু নিবন্ধন জরুরি : তিন ধরনের কাজে মৃত্যু নিবন্ধন প্রয়োজন হয়। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টন, পারিবারিক পেনশন প্রাপ্তি এবং দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে মৃত্যু নিবন্ধন জরুরি।
ভোগান্তির শেষ কোথায় : ছেলেমেয়ের জন্ম নিবন্ধন করেত গেলে বাবা-মায়ের নিবন্ধনও নতুন করে করা লাগছে। সংশোধন করতে হলে আবার সেই ভোগান্তি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
গত বছর মেয়েকে স্কুলে ভর্তির জন্য জন্ম নিবন্ধন করতে যান রাজধানীর পান্থপথ এলাকার বাসিন্দা নবনীতা রায়। সেজন্য তার এবং স্বামীর জন্ম নিবন্ধন জমা দেন। কিন্তু সিটি করপোরেশন থেকে জানানো হয়, এ জন্ম নিবন্ধন দিয়ে কাজ হবে না। মেয়ের জন্ম নিবন্ধন করানোর আগে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে।
নবনীতা বলেন, ‘আমার এবং হাজব্যান্ডের জন্ম নিবন্ধন করা লাগবে এটা প্রথমে সহজ ভেবেছিলাম। পরে দেখলাম এটাও খুব জটিল। আমার বাবার নামে ফ্ল্যাট আছে, তাই আমারটা ঢাকার ঠিকানায় করতে পেরেছি। কিন্তু ওরা জানাল আমার স্বামীরটা তার গ্রামের ঠিকানায় করতে হবে। মেয়েরটাও গ্রামের ঠিকানা দিতে বলেছিল। এরপর একজন পরিচিত কর্মকর্তাকে ধরে কাজটা করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এক জন্ম নিবন্ধনের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে আমার দুই মাস গেছে।’ সরকার সব সহজ করছে, এটাও সহজ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
জন্ম নিবন্ধন শুরু যেভাবে : জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, ‘শিশুর জনগ্রহণের পর জন্ম-নিবন্ধীকরণ করতে হবে। জাতীয়তা অর্জন, নামকরণ এবং পিতামাতার পরিচয় জানবার এবং তাদের হাতে পালিত হবার অধিকার আছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৮৭৩ সালের ২ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত বাংলায় জন্ম নিবন্ধনসংক্রান্ত আইন জারি করে। ২০০১-২০০৬ সালে ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহায়তায় পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ২৮টি জেলায় ও ৪টি সিটি করপোরেশনে জন্ম নিবন্ধনের কাজ নতুনভাবে শুরু হয়। এ সময় ১৮৭৩ সালের আইন রদ ও রহিত করে সরকার। ২০০৪ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ প্রবর্তন করে। আইনটি ২০০৬ সালের ৩ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। এরপর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) নামে ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত প্রকল্পটি চলে। প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম ২০১৬ সালের জুন মাসে শেষ হয়।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্র বলছে, সারা দেশে ১৬ কোটি ৮৮ লাখের অধিক লোকের জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে।
