সুনামগঞ্জে ফের বন্যা উত্তরে বাড়ছে পানি

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৪, ০২:২০ এএম

টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ফের বাড়ছে সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি। এর ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার বহু গ্রামীণ সড়ক, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। একই সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এসব এলাকার দুই লাখের বেশি মানুষ। পাশের জেলা মৌলভীবাজারেও নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীপাড়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে কয়েকটি এলাকায়। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আবারও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ও যমুনাসহ অধিকাংশ নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। এরই মধ্যে নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলগুলো তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে অন্তত ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

সুনামগঞ্জে গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢলের পানিতে তলিয়ে যায় পৌর শহরের কাজীর পয়েন্ট, উত্তর আরপিনগর, তেঘরিয়া, নতুনপাড়া, হাসননগরসহ বেশ কিছু নিচু এলাকা। সুনামগঞ্জ জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তাহিরপুর উপজেলা এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে সুরমা, লক্ষ্মীপুর ও বাংলাবাজারসহ তিন ইউনিয়নের। এক মাসের ব্যবধানে দুবার বন্যা আক্রান্ত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এই অঞ্চলের মানুষ।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘ইতিমধ্যে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি কম হলে নদীর পানি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাশেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘বন্যা মোকাবিলায় আমাদের সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রয়েছে।’

মৌলভীবাজারে মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীপাড়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে কয়েকটি এলাকায়। গতকাল সন্ধ্যায় মৌলভীবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, ‘জেলার ৪টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে নদীগুলোর আশপাশের নিম্নাঞ্চল পানি প্রবেশ করেছে। পানি এভাবে বৃদ্ধি পেলে আবারও সিলেটসহ মৌলভীবাজারে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে।’

তিন দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধের পাঁচটি জায়গা ভেঙে অন্তত ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে লোকালয়ে পানি ঢুকে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, দোকানপাট ও বাড়িঘর ডুবে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই উপজেলায় চলমান এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

পরশুরাম উপজেলার দক্ষিণ শালদর এলাকায় একটি, ফুলগাজী উপজেলার উত্তর দৌলতপুর গ্রাম এলাকায় তিনটি ও ঘনিয়ামোড়া এলাকায় একটি স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে। এসব এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে গেছে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট, মৎস্য খামার ও ফসলি জমি। ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের পূর্ব ঘনিয়ামোড়া এলাকায় কহুয়া নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে মো. মামুন (২৫) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত মামুন কিসমত ঘনিয়ামোড়া এলাকার আবদুল মান্নানের ছেলে। গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। গতকাল বিকেল পর্যন্ত মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বর্ষণে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে গতকাল যমুনা নদীর পানি ৩৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আর ঝিনাই নদীর পানি বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে ও ধলেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৩৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বাড়ছে অন্যান্য নদ-নদীর পানিও। পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী ও ভূঞাপুর উপজেলার নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পাট, তিলসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। এ ছাড়া কয়েকটি জায়গায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। হুমকিতে রয়েছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ নানা স্থাপনা।

দেশের উত্তরাঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হচ্ছে। তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বাড়ছে। নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলগুলো তলিয়ে গেছে। উজানের ঢলের কারণে তিস্তা নদীর পানি গতকাল বিকেল ৬টায় নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্ট বিপদসীমার (৫২.১৫) দশমিক ১৭ সেন্টিমিটার ও কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার (২৯.৩১) দশমিক ৭৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল এবং পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।

উজানের ঢল সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে রাখা হয়েছে।

তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদ-নদী তীরবর্তী নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুরের সমতল এলাকার দুইপাড়ের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত