পালাবদলের সাত ফ্যাক্টর

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪, ০৪:২২ এএম

যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। ৯৫টি দলের চার হাজারের বেশি প্রার্থী আছেন ভোটের লাড়াইয়ে। তবে আলোচনায় আছে দীর্ঘ ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টি (টোরি) ও প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির মধ্যকার লড়াই। অবশ্য বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে ইতিমধ্যে লেবার পার্টি বড় ধরনের জয় পেতে যাচ্ছে বলে আভাস মিলেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোটের সকালে অনেক কনজারভেটিভ নেতাও এক প্রকার হার মেনে নিয়েছেন। এখন ব্যালট বাক্সে অলৌকিক কোনো ঘটনা না ঘটলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় পেতে যাচ্ছে লেবার আর সবচেয়ে ভরাডুবির লজ্জায় পড়তে হচ্ছে কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যদের। জনমত জরিপ সংস্থা ‘ইউগভ’ এর এক জরিপ বলছে, ভোটের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে এমন সাতটি বিষয়কে তারা চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি বলছে, তাদের জরিপে দেখা গেছে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, আবাসন, অভিবাসন, ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং ‘ডিভলভড’ ও ‘রিজার্ভড’ ইস্যু এবার ভোটের ফলাফল নির্ধারণে যেমন ভূমিকা রাখবে তেমনি পরে যারা ক্ষমতায় যাবে তাদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

যুক্তরাজ্যের আগাম নির্বাচনে লেবার পার্টি যখন বড় জয়ের সুবাস পাচ্ছে, তখন ভোটের আগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনৈতিক স্থবিরতা,

ইউগভ এর জরিপে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ ভোটার অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এরপর স্বাস্থ্যে ৫০ শতাংশ, অভিবাসন ও আশ্রয়ে ৪০ শতাংশ, আবাসনে ২৪ শতাংশ, পরিবেশে ২০ শতাংশ, অপরাধে ১৮ শতাংশ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় ১৫ শতাংশ, শিক্ষায় ১৪ শতাংশ, ব্রেক্সিটে ১৩ শতাংশ এবং কর ইস্যুতে ১৩ শতাংশ ভোটার গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। ওই জরিপের আলোকেই সাতটি প্রধানবিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে আলজাজিরা।

ইনস্টিটিউট ফর ফিসক্যাল স্টাডিজের (আইএফএস) হিসেবে, গত দেড় দশকে যুক্তরাজ্যে আয় বেড়েছে সব চেয়ে ধীরগতিতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং বেতন না বাড়ায় ব্রিটেনের জনগণ তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকুলাণে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনীতিকে ঠিকঠাক করতে তাই ভিন্ন ভিন্ন পথ বাতলে দিয়ে ভোটের প্রচারে রয়েছে প্রধান দুই দল কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি। লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার দলীয় ইশতেহারে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস), আবাসন, জ¦ালানি ও অন্যান্য প্রধানবিষয় নিয়ে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এসব খাতে বিনিয়োগের জন্য তার দল ৭৪০ কোটি পাউন্ড কর বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে নাগরিকদের বেতনের ওপর বাধ্যতামূলক ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সের কর হার ২ শতাংশ পয়েন্ট কমানোসহ বছরে ১ হাজার ৭০০ কোটি পাউন্ড কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি।

আলজাজিরা লিখেছে, যুক্তরাজ্যে আবাসন সংকটের পেছনে কারণ হলো সম্পত্তির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধি এবং নতুন ভবন নির্মাণের খরচ বৃদ্ধি।

স্থানীয় সরকার সমিতির হিসেবে, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ১০ বছরে সামাজিক আবাসনের ঘাটতির কারণে অস্থায়ী বাসস্থানের সংখ্যা বেড়েছে ৮৯ শতাংশ। ২০১০ সালে কনজারভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি জোট করে ক্ষমতায় আসে। তখন সরকারের বাজেট ঘাটতি কমিয়ে নাগরিকদের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়। সেজন্য সরকার যে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তার চাপ তীব্র হয় স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর ওপর।

আবাসন খাতের সংকটের এ পরিস্থিতিতে কনজারভেটিভরা নির্বাচনে জয় পেলে ১৬ লাখ নতুন বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অবশ্য লেবার পার্টির নেতারা বলছেন, আবাসনে সমস্যার মধ্যে ২০২৩ সালে বাড়ি নির্মাণের যেসব কর্মযজ্ঞ বাতিল হয়েছিল, এবারের নির্বাচনে জয় পেলে তারা সেই কাজগুলো ফের চালু করবেন। সামনের বছরগুলোতে ১৫ লাখ ঘরবাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে তাদের।

জনমত জরিপ সংস্থা ‘ইউগভ’ এর জরিপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলো যুক্তরাজ্যের এবারের ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে, তার মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে স্বাস্থ্য খাত। তাদের একটি জরিপের ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা ‘জীবনযাত্রার ব্যয়ের’ পরই স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

কনজারভেটিভ পার্টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে-জয়ী হলে তারা এনএইচএসের জন্য বাজেট বাড়াবে। কিন্তু অন্য দলগুলো এ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিতে তেমন জোর দেয়নি। লেবার পার্টি এনএইচএসে রোগীদের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে ভিন্ন কৌশলে। এনএইচএসে সপ্তাহে ৪০ হাজার অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসার বিনিময়ে তাদের অপেক্ষার পালা কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। এ ছাড়া ক্যানসার স্ক্যানারের সংখ্যা বাড়িয়ে ক্যানসারের রোগীদের অপেক্ষার সময় কামানোর ঘোষণাও দিয়েছে তারা।

ইউগভ এর জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের ৪৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, অভিবাসনের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আর ইতিবাচক প্রভাবের পক্ষে সায় দিয়েছে ৩৫ শতাংশ মানুষ। অভিবাসনের জন্য যুক্তরাজ্যে মাঝেমধ্যে বা অনিয়মিতভাবে যারা আসেন, তাদের ঠেকাতে জোর দিয়ে আসছে কনজারভেটিভরা। অবৈধ বা কাগজপত্রহীন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যুক্তরাজ্য থেকে রুয়ান্ডায় পাঠানোর একটি ‘বিতর্কিত’ পরিকল্পনা নিয়েছে ঋষি সুনাকের সরকার। ওই উদ্যোগের আগে আদালত কয়েক বার আটকে দিয়ে বলেছিল, এটা অনৈতিক। পরিকল্পনা ঘোষণার দুই বছরেও এখন পর্যন্ত রুয়ান্ডায় কোনো ফ্লাইট যায়নি। টোরিরা (কনজারভেটিভ পার্টি) পরাজিত হলে এ পরিকল্পনা আর আলোর মুখ দেখবে না; কারণ এরই মধ্যে লেবার পার্টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে রুয়ান্ডা পরিকল্পনা বাতিল করবে।

অবশ্য লেবার পার্টিও অভিবাসীর সংখ্যা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। তারা বলছে, কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বিমানবন্দর থেকেই তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তবে পরিকল্পনাটি এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে ইউক্রেনের প্রতি অটল সমর্থন দিয়ে আসছে ঋষি সুনাকের যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্ব। সম্প্রতি ইতালিতে গ্রুপ অব সেভেন বা জি-সেভেন সম্মেলনে সুনাক পশ্চিমা নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘যাই হোক না কেন’, যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের সঙ্গেই রয়েছে। লেবার পার্টি বলছে, ইউক্রেনের প্রতি তাদের সমর্থন হবে ‘সুনির্দিষ্ট’। দলটির ভাষ্য, তারা কূটনৈতিকভাবে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং ইউক্রেনের শিল্প উৎপাদনকে বাড়াতে সাহায্য করতে কিয়েভের সঙ্গে কাজ করবে।

গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি স্থাপনের দাবিতে আট মাস ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে ব্রিটেনের অধিকাংশ নাগরিক। ৪ জুলাইয়ের ভোটে তারা তাদের মতের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ পাবেন। গত মে মাসে ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের ৭০ শতাংশ মানুষ জরুরি ভিত্তিতে গাজার যুদ্ধ বন্ধ চান। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ কনজারভেটিভ পার্টির এবং ৮৬ শতাংশ লেবার পার্টির সমর্থক। তবে প্রধান দুটি দলের কেউই তাৎক্ষণিকভাবে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে জোরালো অবস্থান দেখায়নি। তবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে বলছে লেবার পার্টি।

যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে প্রভাব ফেলা এসব বিষয় ছাড়াও কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে বলা হয় ‘ডিভলভড ইস্যু’। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, নর্দান আয়ারল্যান্ডের জন্য স্থানীয় এসব ইস্যু খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা এবারের জাতীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নীতি পরিকল্পনায় প্রভাব রাখছে। ডিভলভড ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, বিচার ও পুলিশিং, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার।

অন্যদিকে রিজার্ভড ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক বিষয়, অভিবাসন, বাণিজ্য ও মুদ্রা। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের অধীনে নির্ধারিত হয় এবং সে অনুযায়ী সরকার চলে।

যুক্তরাজ্য পার্লামেন্ট রাজ্যগুলোর জন্য ডিভলভড ইস্যুগুলোতে নীতি সহায়তা ও বরাদ্দ দিয়ে থাকে। ফলে ৪ জুলাইয়ের ভোটে এ বিষয়গুলোও প্রভাব ফেলবে। আর রিজার্ভড বিষয়গুলোও এবার স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দান আয়ারল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে ঘিরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত