পড়ালেখা শেষ করার পর ভালো একটা চাকরির প্রত্যাশা থাকে সবার। কখন চাকরি হবে এবং টাকা-পয়সা হাতে আসবে, সবার সে চিন্তা ও চেষ্টা চলতে থাকে। ধনী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আশায় বুক বাঁধতে থাকে। একটা সময় কারও চাকরি হয়, কারও হয় না। যাদের হয় তারা যে চাকরির টাকায় খুব কিছু করতে পারে, তা কিন্তু নয়। অনেকে তখন অবৈধ পথে পা বাড়ায়। কারণ চাকরির টাকায় ধনী হওয়া কঠিন। চাকরির টাকা সীমাবদ্ধ। প্রতি মাসে যে বেতন-ভাতা ধার্য করা আছে তার বাইরে কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। এ যেন নিজের রিজিক নিজেই সীমাবদ্ধ করে নেওয়া। এক্ষেত্রে ভাগ্যকে দোষারোপ করা নির্বুদ্ধিতার কাজ।
এ ছাড়া চাকরির ক্ষেত্রে জীবন তো আটকা পড়ে পরের হাতে। ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু করা যায় না। ক্ষোভ-দুঃখ নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। পক্ষান্তরে ব্যবসা একটি প্রবহমান ঝরনার মতো। সব সময় এটা দিয়ে পানি প্রবাহিত হতেই থাকে। মানে কম হোক বেশি হোক, ব্যবসায় লাভ হতেই থাকে। দুর্ঘটনা ছাড়া ক্ষতির সম্ভাবনা খুবই কম। এজন্য ব্যবসা দ্বারা রিজিকের দ্বার খোলে। সঠিক পন্থায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারলে মহান আল্লাহ তাতে প্রচুর বরকত দান করেন। তাছাড়া নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার যে আলাদা একটা মজা আছে, সেটাও ব্যক্তি সব সময় পায়। চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ভীতি তার মধ্যে থাকে না। ফলে সে মানসিকভাবে চাপমুক্ত থেকে কাজের আনন্দ অনুভব করে।
একজন ভালো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা সমাজের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। মানুষ তার দ্বারা নানাভাবে উপকৃত হয়। লেনদেন করার মতো আস্থা খুঁজে পায়। ন্যায্যমূল্যে ভেজালমুক্ত পণ্য হাতে পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়। তাই একজন সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ীর মর্যাদা সমাজে যেমন স্বীকৃত, মহান আল্লাহর কাছেও সে প্রশংসিত। হাদিসে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘একজন সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (জামে তিরমিজি ১২০৯)
ব্যবসার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকলে পুরো পৃথিবী অচল হয়ে যাবে। ব্যবসার মাধ্যমেই একজনের পণ্য আরেকজনের কাছে পৌঁছায়। প্রত্যেকেই পূরণ করে নিজ নিজ প্রয়োজন। ব্যবসাপ্রথা না থাকলে সমাজে চুরি-ডাকাতির রাজত্ব কায়েম হতো। সভ্যতার চাকা ঘুরত না কোনো দিকেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা ২৯)
ব্যবসা ছোট হোক বা বড় হোক, কোনোটাই নিন্দনীয় নয়। একজন মুসলমানের জন্য গুটিকয়েক বস্তু ছাড়া বাকি সব বস্তুর কেনাবেচা বৈধ। মৃত প্রাণীর ব্যবসা, শূকর বেচাকেনা, নেশাজাতীয় দ্রব্যের আদান-প্রদান, মূর্তি-প্রতিমার ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি কিছু অপবিত্র ও অস্বাস্থ্যকর বস্তু ছাড়া যে কোনো বস্তু বা পণ্যদ্রব্যের ব্যবসা-বাণিজ্য একজন মুসলিম স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার দেবী ও ভাগ্যনির্ণায়ক তীর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে সফলকাম হও।’ (সুরা মায়েদা ৯০)
ব্যবসা করা নবী-রাসুলদেরও সুন্নত। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) যৌবনে ব্যবসা করে সময় কাটিয়েছেন। মক্কা থেকে হাজার মাইল দূরের দেশ সিরিয়ার ভূখণ্ডে বাণিজ্য করে সুনাম কুড়িয়েছেন। হজরত খাদিজা (রা.)-এর মালামাল নিয়ে ব্যবসা করে দ্বিগুণ লাভ করে দেশে ফিরেছেন। এখানে আমাদের জন্য বড় একটি শিক্ষা আছে। তা হলো, নিজের সম্পদ না থাকলে অন্যের সম্পদ দিয়েও ব্যবসা করা যায়। এতে অসম্মানের কিছু নেই। সৎ সাহস ও আমানতদারিতা থাকলে পুঁজি ছাড়াই ব্যবসা করা যায়। অনেক মানুষের টাকা আছে কিন্তু শ্রম দেওয়ার সময় বা শক্তি নেই। তারা ব্যবসার জন্য সজ্জন খুঁজে ফেরেন। শরিয়তে এ ধরনের ব্যবসাকে ‘বাইয়ে মুদারাবা’ (একজনের মাল আরেকজনের শ্রম দিয়ে গড়ে ওঠা ব্যবসা) বলে। এ ধরনের ব্যবসাও নানা কারণে প্রশংসার দাবি রাখে।
ব্যবসার জন্য খুব বেশি পুঁজির দরকার হয় না। পৃথিবীর যত বড় বড় ব্যবসায়ী রয়েছেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন খুব সামান্য থেকে তারা অসামান্য হয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষী, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মাত্র কয়েক দিরহাম দিয়ে ব্যবসা করে তখনকার পৃথিবীর শীর্ষ ধনীদের কাতারে উঠে এসেছিলেন। হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার পর ৩-৪ দিরহাম তার সম্বল ছিল। নবী করিম (সা.) তাকে সাদ বিন রবিয়াহ (রা.)-এর সঙ্গে ভ্রাতৃসম্পর্ক করে দেন। সাদ বিন রবিয়াহ (রা.) ছিলেন মদিনার ধনী সাহাবিদের একজন। তিনি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে নিজের অর্ধেক সম্পত্তি দিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু আবদুর রহমান ইবনে আউফ তা নিলেন না। বললেন, ‘আল্লাহ আপনার সম্পদে বরকত দিন। আমাকে শুধু বাজারের পথটি দেখিয়ে দিন।’ সাদ বিন রবিয়াহ (রা.) বাজারের পথটি দেখিয়ে দিলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) সোজা চলে গেলেন মদিনার বাজারে। মাত্র কয়েক দিরহাম দিয়ে ঘি ও পনিরের ব্যবসা শুরু করেন। পরেরটুকু শুধুই ইতিহাস। অতি সামান্য থেকে হয়েছিলেন অসামান্য। উঠে এসেছিলেন বড় বড় ধনীদের কাতারে।
পরবর্তী সময়ে সে সম্পদ থেকে অকাতরে দান করেছিলেন ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণে। একবার অভাবের সময় মদিনায় ৭০০ উট বোঝাই পণ্য নিয়ে আসেন। সবাই ভেবেছিল তিনি খুব লাভবান হবেন। কিন্তু না। সব বিনা পয়সায় অভাবীদের মধ্যে বিতরণ করে দেন। সুতরাং ব্যবসা করতে খুব বেশি পুঁজির দরকার হয় না। পর্যাপ্ত সময়, শ্রম আর মেধা কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় সফলতা লাভ করা যায়।
