যাদের নিয়ে যুক্তরাজ্য পুনরাবিষ্কারে স্টারমার

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪, ০২:২৪ এএম

পরিবর্তনের ডাক দিয়ে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছে গেছেন লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার। গত বৃহস্পতিবার সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সরকার গঠন করছে। গত শুক্রবার রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছ থেকে সরকার গঠনের অনুমতি নিয়ে সোজা ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে এসে সংবাদমাধ্যমকে নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে আবারও পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন স্টারমার। সেদিনই গঠন করেছেন তার মন্ত্রিসভা। গতকাল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। অবশ্য সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ডাউনিং স্ট্রিটের বাসিন্দা হতে হয়তো তিন সপ্তাহ লাগতে পারে স্টারমারের। এরপর থেকেই টোরিদের রেখে যাওয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তাকে।

ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দান আয়ারল্যান্ড নামে চার রাজ্য নিয়ে গঠিত যুক্তরাজ্যে বিরাজমান বহু সংকট ও সমস্যার মধ্যেই প্রথম ভাষণে রাষ্ট্র মেরামতের এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, কীভাবে তিনি তা করতে চান; এসব বিষয়ে এখন অনেকের কৌতূহল জন্ম নিচ্ছে।

বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, জাতির উদ্দেশে প্রথম বার্তায় কিয়ার স্টারমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে তার মনোযোগ দেখিয়েছেন, সেটি হলো অনিরাপদ বিশ্ব। সেখানে তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা বিশ্ব দেওয়ার জন্য কাজ করার কথা বলেছেন।

যুক্তরাজ্যের ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে অভিবাসন ও প্রবাসীর সংখ্যা নেহাত কম নয়, স্টারমার তার রাষ্ট্র পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনায় তাদের কতটা গুরুত্ব দেবেন, তা-ও পর্যবেক্ষণ থাকবে।

স্কাই নিউজ লিখেছে, লেবার পার্টির নিরঙ্কুশ জয়ও স্টারমারের ওপর প্রত্যাশার বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। সেই চাপ মোকাবিলা করতে তাকে বিভিন্ন খাতে কর বাড়াতে হতে পারে।

পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে বিপুল ভোটে জয় পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাসস্থান বানানোর কথা বলছেন স্টারমার। আর সে জন্য নবগঠিত সরকারকে সেবার সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় এসব নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন পাস করা এখন লেবারদের জন্য সহজ হবে।

সরকার গঠনের পরপরই স্টারমার কোন কোন দিকে মনোযোগ দিতে পারেন, সেসব বিষয়ে তুলে আনতে লেবার পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বের শীর্ষে থাকা কিছু প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছে বিবিসি। যুক্তরাজ্যকে পুনর্গঠন করতে স্টারমারকে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত আয়কর, জাতীয় বীমা স্কিম বা ভ্যাট না বাড়িয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

এরপর জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার অধীনে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষায় থাকা মানুষের সময় কমানো। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসাকর্মীদের প্রণোদনা দিয়ে কাজের সময় বাড়িয়ে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪০ হাজার সেবাপ্রত্যাশীকে চিকিৎসার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া পাচার চক্র ও মানব পাচার প্রতিরোধে সন্ত্রাসবিরোধী নিরাপত্তাব্যবস্থার মতো ক্ষমতা দিয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা কমান্ড গঠনের কথা বলা হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে নতুন জনবল নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘গ্রেট ব্রিটিশ এনার্জি’কে যুগোপযোগী করতে চান স্টারমার।

দেশ পুনর্গঠনের আরেক প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সমাজবিরোধী আচরণ প্রতিরোধে ১৩ হাজার পুলিশ সদস্য ও সহায়ক কর্মী নিয়োগ দেবেন স্টারমার।

দেশের জন্য নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে প্রাথমিক শিক্ষার দিকে বিশেষ মনোযোগ রয়েছে লেবার নেতার। নতুন প্রধানমন্ত্রী স্টারমার প্রাথমিক শিক্ষায় সাড়ে ৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিতে এবং সব শিশুর জন্য বিনামূল্যে সকালের নাশতার ব্যবস্থা করতে চাইছেন।

জয়ের পর প্রথম ভাষণে দেশকে নতুন করে আবিষ্কার করার কথাও বলেছেন স্টারমার। সে জন্য এখনই কাজ শুরুর কথা বললেও যুক্তরাজ্যের মানুষের কাছে কিছুটা সময়ও চেয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, দিনবদলের বিষয়টি সুইচ চেপে বাতি জ্বালানোর মতো কোনো বিষয় নয়। এ জন্য কিছুটা অপেক্ষা করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ভাষণে যেসব বিষয়ে দেশবাসীর কষ্ট লাঘবে কাজ করার কথা বলেছেন স্টারমার, তার মধ্যে আবাসন ও গৃহায়ণ এবং জ্বালানির মতো জরুরি বিষয় রয়েছে।

স্টারমার চান নতুন সুযোগ সৃষ্টির জন্য এমন অবকাঠামো নির্মাণ করতে, যেখানে শিক্ষা ও বাসস্থানের সঙ্কুলান হবে। এই কাজের প্রতিটি ইটে তিনি নজর রাখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অনিশ্চিত বিশ্বের যেসব চ্যালেঞ্জ, সেগুলো মোকাবিলার কথাও বলেছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, অনিরাদ বিশ্ব থেকে আগে যেসব চ্যালেঞ্জ এসেছে, সে ধরনের কিছু হলে সেগুলো যুক্তরাজ্যের চার জাতি মিলে তা মোকাবিলা করবে।

আলোচ্য সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অল্প সময়ের মধ্যেই মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শুরু করেছেন, যেখানে এরই মধ্যে তিনি ২০ জন মন্ত্রী বেছে নিয়ে তাদের দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছেন। বিবিসি বলছে, প্রধানমন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ শুক্রবারই ২২ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠনের কথা জানিয়েছে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট।

নতুন মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় চমকে রেইচেল রিজ, যিনি যুক্তরাজ্যের ৮০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম অর্থমন্ত্রী। যুক্তরাজ্যে অর্থমন্ত্রীর পদের নাম চ্যান্সেলর অব একচেকার। দক্ষিণ লন্ডনে বেড়ে ওঠা রিজ ২০১০ সালে লিডস ওয়েস্ট থেকে প্রথমবার সংসদ সংদস্য নির্বাচিত হন, যার আগে তিনি অর্থনীতি নিয়ে কাজ করতেন। এবার লিডস ওয়েস্ট ও ফাডজি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তার ছোট বোন এলি রিজ ২০১৭ সাল থেকে এমপি। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় লেবার পার্টির নীতি-পরিকল্পনার আলোকে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর কথা বলেছেন।

কিয়ার স্টারমার তার সরকারে উপ-প্রধানমন্ত্রী করেছেন অ্যাশটন-আন্ডার-লিনের এমপি অ্যাঞ্জেলা রেইনাহকে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বাসিন্দা রেইনাহ নির্বাচনের আগে বাড়ি বিক্রি করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন। তবে পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা করেনি।

স্টারমারের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন গায়ানিজ বংশোদ্ভূত ডেভিড লামি। তার জন্ম লন্ডনে। অত্যন্ত মেধাবী লামি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্রিটিশ হিসেবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। ২০০০ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে টটেনহ্যাম থেকে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে টনি ব্লেয়ারের মন্ত্রিসভায় জুনিয়র মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

লেবার পার্টির মধ্যে শীর্ষ পদধারী নারীদের মধ্যে এভেট কুপা একজন। স্টারমারের মন্ত্রিসভায় তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একসময় সাংবাদিকতা করা কুপা ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। তার স্বামী এড বলসও তখন সংসদ সদস্য ছিলেন।

শাবানা মাহমুদকে করা হয়েছে বিচার প্রতিমন্ত্রী ও লর্ড চ্যান্সেলর। সাবেক কনজারভেটিভ নেত্রী লিজ ট্রাসের পর তিনিই দ্বিতীয় নারী, যিনি এ দায়িত্ব পেলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী করা হয়েছে জন হিলিকে। সামরিক ব্যয় কমানোর পক্ষে হলেও ইউক্রেনের পক্ষে জোরালো অবস্থান রয়েছে তার। যুক্তরাজ্যের জাতীয় সমস্যার মধ্যে বেশি আলোচিত স্বাস্থ্য খাত। এবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হলেন ওয়েস স্ট্রিটিং।

আর শিক্ষামন্ত্রী করা হয়েছে ব্রিজিট ফিলিপসনকে। ২০১০ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন তিনি। জ্বালানিমন্ত্রী করা হয়েছে এড মিলিব্যান্ডকে। অবশ্য তার মন্ত্রণালয়ের নাম জ্বালানি নিরাপত্তা ও নেট জিরো। ২০১০ সালে লেবার সরকারের শেষ দিকে এমন দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি।

কর্ম ও পেনশনমন্ত্রী হয়েছেন লিজ কেন্ডাল। ব্যবসা ও বাণিজ্যমন্ত্রী হয়েছেন জোনাথন রেনল্ডস। বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন পিটার কাইল। লুইস হাইগকে করা হয়েছে পরিবহনমন্ত্রী। পরিবেশমন্ত্রী হয়েছেন স্টিভ রিড।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন লিসা নন্দি। হিলারি বেনকে নর্দান আয়ারল্যান্ডবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, আইয়ান মুরেইকে স্কটল্যান্ডবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ওয়েলসবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে জো স্টিভেনসকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত