সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী কেউ একবার অব্যাহতি নেওয়ার আবেদন করলে সেটি সঙ্গে সঙ্গে গৃহীত বা মঞ্জুর হয়েছে বলে বিবেচিত হয়। আবেদন প্রত্যাহারের আর সুযোগ থাকে না। সংশ্লিষ্ট পদে থাকারও সুযোগ থাকে না। এসব নিয়মের তোয়াক্কা করেননি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফাতেমা দোজা।
ডা. ফাতেমা হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে অব্যাহতি নিয়ে অন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। সেখানে চাকরি স্থায়ী না হলে তথ্য গোপন করে আবার হৃদরোগ হাসপাতালে যোগ দিয়ে একের পর এক পদোন্নতি আদায় করে নিয়েছেন, বেতন-ভাতা তুলেছেন, যা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী এবং গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শুধু তাই নয়, একটি মামলায় জেল খেটে সে তথ্য গোপন করে ওই সময়টুকু অর্জিত ছুটি হিসেবে দেখিয়ে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগদানের আমন্ত্রণপত্র জাল করেছেন। তার এসব জালিয়াতির বিষয়ে হৃদরোগ হাসপাতাল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে একাধিক অভিযোগ জমা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি বছরের পর বছর চাকরি করে যাচ্ছেন।
ডা. ফাতেমা দোজার একাধিক সহপাঠীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদকের। তারা জানান, ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ডা. ফাতেমা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করার সময় ছাত্রদলের নেত্রী ছিলেন তিনি। সেখানে পড়াশোনা করার কারণে ছাত্রজীবন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তার।
১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে ফাতেমা দোজার কর্মজীবন শুরু। বিএনপি ও জোট সরকার ক্ষমতায় এলে ২০০২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বদলি হয়ে আসেন। সে সময় তিনি বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বদলির জন্য তদবির করেছিলেন ড্যাবের সে সময়ের মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
সহপাঠীরা জানান, ঢামেকে কর্মরত থাকাকালে ২০০৪ সালে গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন ডা. ফাতেমা ও তার স্বামী মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আবুল বাশার মো. জামাল। ওই মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়েও ডা. জাহিদ তদবির করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের (স্বাচিপ) ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি স্বাচিপ-সমর্থিত সোসাইটি অব রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিংয়ের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। তার স্বামীও একের পর এক প্রমোশন পেয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) হন। স্বামীর প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি সব অভিযোগ উপেক্ষা করে পদোন্নতি পান।
ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এরকম কিছু মনে করতে পারছি না। প্রায় ২০ বছর আগের ঘটনার বিষয়ে আমার কিছু জানাও নেই।’
জানা গেছে, ১০ বছরের গৃহকর্মী মোস্তাকিনাকে গরম ইস্ত্রি দিয়ে পুড়িয়ে গুরুতর জখম করে জেল খাটেন ডা. ফাতেমা ও তার স্বামী ডা. বাশার। এ ঘটনা সে সময় দেশব্যাপী সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল। ২০০৪ সালের ২ মে ডা. ফাতেমা গ্রেপ্তার হয়ে ৪ মাস ১ দিন পর ৪ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান। এ কথা তিনি কর্মস্থলে গোপন রাখেন এবং ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ওই বছরের ২ মে থেকে ১০ সেপ্টেম্বর মোট ৪ মাস ৮ দিনের অর্জিত ছুটি চেয়ে স্বাস্থ্য সচিবের কাছে আবেদন করলে তা গৃহীত হয়। শুধু তাই নয়, জেলে থাকার সময়ে ২৩ আগস্ট ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে তাকে বদলি করা হয় এবং ১১ সেপ্টেম্বর তার যোগদান দেখানো হয়।
তার জালিয়াতির বিষয়ে ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগের একটা কপি রয়েছে দেশ রূপান্তরের হাতে আছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, হৃদরোগ হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ডা. ফাতেমা চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে সহকারী অধ্যাপক (অস্থায়ী) পদে যোগ দেন। বিএসএমএমইউতে ছয় মাস চাকরির পর তাকে স্থায়ী করা হয়নি। ফলে তিনি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও চেম্বারে রোগী দেখেন এবং চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ১ বছর ৬ মাস পর ১১ জুন ২০১৩ সালে আবার হৃদরোগ হাসপাতালে যোগ দেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চাকরি থেকে অব্যাহতির বিষয়টি তিনি গোপন করেন এবং এ সময়ে মেডিকেল অফিসার হিসেবে হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন দেখিয়ে তদবির করে পদোন্নতি নিয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ১১ জুন যোগদান করেন। এরপর ওই হাসপাতালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে এখন অধ্যাপক হওয়ার জন্য তদবির করছেন।
হাসপাতালের চিঠিপত্র গ্রহণ ও বিতরণের খাতার সংশ্লিষ্ট পাতা দেখে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। রেডিওলজি বিভাগের চিকিৎসকদের হাজিরা খাতায়ও ওই সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিতির স্বাক্ষর যদিও নেই। বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ওই সময়ে তিনি হাসপাতালে কর্মরত হিসেবে বেতন-ভাতাও তোলেননি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তেও ডা. ফাতেমার সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেওয়ার বিষয়টি গোপন করে আবার চাকরিতে যোগদানের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত সময়ে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় কেবল খোরপোশ ভাতা পাওয়ার কথা। অথচ তিনি ওই সময়েও সম্পূর্ণ বেতন-ভাতা তুলেছেন। এ কাজ সরকারি চাকরিবিধির পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা গোপন করে আবার চাকরিতে যোগদান করা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির কাছে ডা. ফাতেমা দোজা অব্যাহতি নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গত বছর ২৬ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের শৃঙ্খলা অধিশাখা। চলতি বছর ১০ মার্চ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মঞ্জুরুল হাফিজকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তাকে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৫ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, ‘আমি বদলি হয়ে গেছি, এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না।’
অভিযুক্ত ডা. ফাতেমা দোজার বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি এবং তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডা. ফাতেমার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা তদন্ত প্রতিবেদনেও রয়েছে। একাধিকবার তা মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য কাগজ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আছে। তবে চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়া ও আবার যোগদানের মাঝখানের দেড় বছরের কোনো নথি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নেই।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা সময় স্বল্পতার কথা বলে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
