ঘণ্টা পেরিয়ে ম্যাচ এগিয়ে চলছে। এতটা সময় ঠিক নিজের মতো কিছুই করা হয়নি। টানা দ্বিতীয় কোপা জয়ের মঞ্চে ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না যেন। চোট নিয়ে নেমেছিলেন খেলতে। তা ছাড়া প্রতিপক্ষ কলম্বিয়ার শরীরনির্ভর খেলায় ফুটবলের ফুল ফোটানো ছিল দায়। তারপরও এক-আধবার ঝলকে উঠলেন। অতটুকুতে অবশ্য কার্যসিদ্ধি হয় না। এর মাঝেই একটা বল দখলে বেশ জোরেই ছুটছিলেন। হঠাৎই হাল ছেড়ে মাঠে শুয়ে পড়ে কাতরাতে লাগলেন। বোঝা গেল গুরুতর কিছুই হয়েছে। অনুমান সত্য। খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছেড়ে গেলেন বাঁ পায়ের জাদুকর।
আর দায়িত্ব শেষ না করে লিওনেল মেসির লড়াইয়ের ময়দান ছাড়া মানেই আর্জেন্টাইনদের ওপর আকাশ ভেঙে পড়া। হার্ড রক স্টেডিয়ামে উপস্থিত আকাশি-সাদা সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল কান্নার রোল; যা সংক্রমিত হয় মেসির মাঝেও। খেলতে ভীষণ ভালোবাসেন বলেই কখনোই সহজে মাঠ ছাড়তে চান না। চোট যখন বাধ্য করল, তখনই তাকে পেয়ে বসল শিরোপা হারানোর শঙ্কা। এর সঙ্গে যোগ হলো দুনিয়াজুড়ে লাখো কোটি সমর্থককে আরেকবার বিনোদিত করতে না পারার হতাশা। দুইয়ের সংমিশ্রণে বান ডাকল মেসির চোখে। বেঞ্চে বসে হতাশায় হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। অবিশ্বাসের ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইলেন মাঠের দিকে। এবার যদি না হয়? প্রিয় বন্ধু আনহেল ডি মারিয়াকে যে কথা দিয়েছিলেন তার অবসরটা শিরোপায় রাঙিয়ে দেবেন! সে কথাও যে রাখা হলো না! বেঞ্চে বসেই দেখলেন ম্যাচের শুরুর ৯০ মিনিটে গোলশূন্য সমতা। এরপর অতিরিক্ত সময়ে গড়াল খেলা। সেরা অস্ত্রকে আগেভাগে হারিয়ে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি কৌশলে আনেন পরিবর্তন। মাঠে চারটি পরিবর্তন করে ফেলেন দ্রুত। তাতেই কাজের কাজটা হয়ে যায়। এই আসরে নিজেকে বারবার অন্যভাবে চেনানো লাউতারো মার্তিনেজ ফের ত্রাতার ভূমিকা নিয়ে আর্জেন্টিনাকে পাইয়ে দেন কাক্সিক্ষত গোল। ১১২ মিনিটের সেই গোলটাই মেসির আর্জেন্টিনাকে পাইয়ে দেয় রেকর্ড ১৬তম কোপা শিরোপা। এই লক্ষ্যভেদ মেসিকে হতাশার বদলে এনে দেয় উদযাপনের উপলক্ষে। লাউতারোর এই গোলেই তৈরি হয়ে যায় আরেক কিংবদন্তি ডি মারিয়ার বিদায়ের ফুল বিছানো পথ।
এর আগে খেলা মাঠে গড়াতেই গলদঘর্ম হতে হয়েছিল আয়োজকদের। তাতে ম্যাচ শুরু হয় ৮২ মিনিট বিলম্বে। খেলা শুরুর পর গ্যালারির মতো মাঠেও আধিপত্য দেখা গেছে কলম্বিয়ার। দ্বিতীয় কোপা জেতাতে হাজার হাজার কলম্বিয়ান দখল করে হার্ড রকের গ্যালারি। আর আর্জেন্টাইন কোচ নেসতর লরেঞ্জোর অধীনে এই দলটা অনেক দিন ধরেই খেলছে অসাধারণ ফুটবল। যে ফুটবলে গতির সঙ্গে মিশেছে শক্তি। তাতে এই কলম্বিয়া স্কালোনির বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার জন্যও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাচের সপ্তম মিনিটে গোলের দারুণ সুযোগ পেয়েছিল কলম্বিয়া। বক্সের ঠিক ওপর থেকে দারুণ ভলি করেছিলেন জন কর্ডোবা। তবে তার প্রচেষ্টা দূরের পোস্টে লেগে বাইরে গেলে বেঁচে যায় আর্জেন্টিনা। দুই উইং ব্যবহার করে বারবার আক্রমণে গেছে কলম্বিয়া। সংঘবদ্ধভাবে হাই-প্রেস ফুটবল খেলেছে তারা প্রথমার্ধে। আর্জেন্টিনাকে বেশ কোণঠাসা মনে হয়েছে। প্রতিপক্ষের গতি কমানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে তাদের। তারপরও পারছিল না। আলভারেজ, মেসি ও ডি মারিয়াকে নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ সুবিধা করতে পারেনি। তারা বল ধরলেই কলম্বিয়ার দুই-তিনজন ফুটবলার তাদের ঘিরে ধরেছেন। ফলে বারবার তারা বল হারিয়েছেন। কুড়ি মিনিটে অবশ্য প্রথমবার দলগত আক্রমণে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা; যা থেকে দারুণ শটও নিয়েছিলেন মেসি। তবে সেটা আলভারেজের পায়ে লেগে দিক বদলে বাইরে যায়। প্রথমার্ধে বলার মতো ওই একটাই ভালো চেষ্টা আর্জেন্টিনার; বরং কলম্বিয়া বারবার পরীক্ষা নিয়েছে। তবে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করা যায়নি। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য গতি বাড়িয়ে আর্জেন্টিনা চেয়েছে আক্রমণে যেতে। ডি মারিয়া বাঁ দিক দিয়ে ছিলেন সক্রিয়। ৫৮ মিনিটে একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে বক্সে ঢুকে শট নিয়েছিলেন। তবে সেটা ভালোভাবেই সামলে দেন কলম্বিয়ার কিপার।
ম্যাচের ৬৪ মিনিটে বড় ধাক্কা লাগে আর্জেন্টিনাশিবিরে। প্রথমার্ধে আক্রমণে উঠে প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের বুটের আঘাতে ভালোই চোট পেয়েছিলেন মেসি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে মাঠে ফিরলেও তাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা গেছে। দ্বিতীয়ার্ধেও স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ঘণ্টা পেরোনোর পর মাঝমাঠে একটি বলের দখল নিতে স্প্রিন্ট দিয়েছিলেন। তবে হঠাৎ করেই থেমে গিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন। বুঝতে পারেন ডান পায়ের এই চোট নিয়ে আর খেলা সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের ঘারে ভর করে মাঠ ছাড়েন মেসি। বেঞ্চে বসেই বুট খুলে কেঁদে ফেলেন ফুটবলের এই মহাতারকা। দেখা যায় তার চোট পাওয়া পা ফুলে ঢোল। প্রিয় অধিনায়কের মুখে হাসি ফেরাতে সতীর্থরা ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভীষণ উদ্যমে তারা আক্রমণে গেছেন, গোলের চেষ্টা করে গেছেন। সেই চেষ্টার ফলটা মিলেছে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময়ের শেষ দিকে।
এর আগে অতিরিক্ত সময় শুরুর পরপরই আলভারেজকে তুলে নিয়ে লাউতারো মার্তিনেজকে মাঠে পাঠান স্কালোনি। লাউতারো এর আগে করেছিলেন চার গোল। যার তিনটিই বদলি হিসেবে নেমে। কোচের আস্থার প্রতিদান ফাইনালেও দেন লাউতারো। ১১২ মিনিটে লে সেলসোর পাস ধরে বক্সে ঢুকে কলম্বিয়ান গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন এই স্ট্রাইকার। গোল করেই সোজা ছুটে যান মেসির কাছে, মহানায়ককে জড়িয়ে ধরেন। সেই গোলে আতঙ্কে থাকা মেসির মুখেই কেবল হাসি ফেরাননি, ২৬ বছরের স্ট্রাইকার আর্জেন্টিনাকে পাইয়ে দিয়েছেন ১৬তম কোপা শিরোপা। বিশ্বকাপে ভালো না খেলার আফসোসটা এই কোপায় মিটিয়েছেন পাঁচ গোল করে। একই সঙ্গে দলের তিন বছরে চারটি মেজর শিরোপা জয়ে রাখেন অগ্রণী ভূমিকা। এমন অনেক ম্যাচ জয়ের নায়ক ডি মারিয়ার অবসরটা রাঙিয়ে দেন শিরোপার রঙে।
মেসির আর্জেন্টিনার সামনে এখন আরেকটি ফিনালেসিমা জয়ের হাতছানি। টানা কোপা জয় নিশ্চিতের কয়েক ঘণ্টা আগেই আর্জেন্টাইনরা জেনে গেছেন মর্যাদার সেই লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ স্পেন। এখন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দাবি, সেই ম্যাচটা যাতে খেলেন মেসি। স্পেনের বিস্ময় বালক ইয়ামালেও মুখিয়ে আছেন আইডল মেসির বিপক্ষে খেলতে। সেই ইচ্ছা পূরণ হবে কি না, সেটা সময় বলে দেবে।
মেসি যদি খেলেন, তবে তো কথাই নেই। না খেললে প্রিয় বন্ধু ডি মারিয়াকে নিয়ে গ্যালারিতে বসে হয়তো অনুজদের আরেকবার শিরোপার জন্য ঝাঁপাতে দেখবেন সর্বকালের সেরা ফুটবলার মেসি। এখন যে তাদের স্রেফ উপভোগের সময়।
