অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন একজন কর্মযোগী। বিস্তৃত কর্মপরিধির কারণে তার পরিচয়ের বিস্তৃতিও ছিল বৈচিত্র্যময়। জন্মেছেন ইংরেজশাসিত ঔপনেবিশক ভারতবর্ষে, ভারতভাগের পর চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব বাংলা, পরে যার আনুষ্ঠানিক নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। যার সূত্রে দেখেছেন পাকিস্তানি শাসনামল। ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় সৈনিক। একজন সক্রিয় রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। সমর্থন আদায়ের কাজ করেছেন সামনে থেকে। দেশ স্বাধীন হলে হয়েছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য। সংবিধানের বাংলা ভাষ্যরূপ তৈরি হয়েছিল তারই নেতৃত্বে। এসব কর্মযজ্ঞের একজন সামনের সারির যোদ্ধা হওয়ার কারণে বিচিত্র মানুষের সঙ্গে যেমন তার যোগাযোগ ঘটেছিল তেমনি তাদের দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন কাছ থেকে। এসব ব্যক্তিত্বের মধ্যে যারা অগ্রগণ্য তাদের নিয়ে তিনি লিখেছিলেন বিভিন্ন সময়ে। এমনই কয়েকটি লেখার সংকলিত রূপ তার ‘স্মৃতির মানুষ’ বইটি।
তার লেখায় মূর্ত হয়ে উঠেছেন বাংলার অগ্নি সময়ের নায়করা। এরা কেউ লেখক-সাহিত্যিক-কবি, কেউ রাজনীতিক, কেউ শিক্ষক-সমাজ সংস্কারক। ভিন্ন মত ও পথের মানুষ হলেও আনিসুজ্জামানের লেখায় তাদের মূল্যায়নে কোনো পক্ষপাত বা বিদ্বেষভাব প্রকাশ পায়নি, বরং যার যার স্বাতন্ত্র্যবোধ, মৌলিকতা ও গুরুত্ব স্মরণ করা হয়েছে সশ্রদ্ধভাবে। তার লেখার মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে বাঙালি সমাজের বিবর্তনের এক প্রামাণ্যচিত্র। ‘স্মৃতির মানুষ’ বইয়ে আনিসুজ্জামান তুলে ধরেছেন কথাসাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বাংলাদেশ হাইকোর্টের প্রথম বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, রাজনীতিক মহিউদ্দীন আহমেদ, নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, সুরকার আলতাফ মাহমুদ, কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ, বাংলাদেশের সংবিধান রচয়িতা আইনজ্ঞ কামাল হোসেন, আইনজীবী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ভাস্কর নিতুন কুন্ডু, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পপতি নূরুল কাদের খান, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য খান সারওয়ার মুরশিদ, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, দার্শনিক ও শিক্ষক সরদার ফজলুল করিম, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিক্ষক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী তপন রায়চৌধুরী, শিক্ষক, অনুবাদক জাহাঙ্গীর তারেক প্রমুখ ব্যক্তিত্বকে।
স্মরণীয় বরণীয় ব্যক্তির জীবনী পাঠে পাঠকের মনে মহৎ জীবন গঠনের প্রেরণা প্রদীপ্ত হয়। কিন্তু একদিকে জীবনী গ্রন্থের স্বল্পতা, অধিকন্তু প্রকৃত মহৎ ব্যক্তির সন্ধান লাভে বিড়ম্বনা জীবনী পাঠের পথ বন্ধুর করে তোলে। আনিসুজ্জামানের ‘স্মৃতির মানুষ’ গ্রন্থটি এই বৈরিতা দূর করতে সাহায্য করবে। মহৎ ব্যক্তিদের নিয়ে তার এই টুকরো লেখা একদিকে যেমন বাংলাদেশের কিছু বড় মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে তেমনি তাদের পূর্ণাঙ্গ জীবনী সংগ্রহ করে পাঠ করতে উৎসাহিত করবে। এ কারণে ‘স্মৃতির মানুষ’ বইটি তরুণ পাঠকদের অবশ্যপাঠ্য।
