আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে। গত অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার। এ হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৩ শতাংশ। বাণিজ্য ঘাটতি কমার পাশাপাশি চলতি হিসাব ও সামগ্রিক লেনদেনে ঘাটতিও কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (ব্যাল্যান্স অব পেমেন্ট) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-মে মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৩৪ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা আগের বছরে একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৯৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। রপ্তানি কম হয়েছে ২৩৪ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৮১ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-মে মাস পর্যন্ত তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৩০৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৪৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ডলার সংকট এড়াতে আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম প্রয়োজন বা বিলাসী পণ্যের এলসি খোলার সময় শতভাগ পর্যন্ত নগদ মার্জিনের শর্ত দেওয়া আছে। এ সব কারণে আমদানি কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-মে মাস পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫ হাজার ৭৫৬ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ৫৮৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ৮৩২ কোটি ডলার বা ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে যে হারে আমদানি কমেছে সে হারে বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১১ মাসে ২ হাজার ২২ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। আমদানি কমার পাশাপাশি রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেনি।
বিদায়ী অর্থবছরে চলতি হিসাবে ঘাটতিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। সবশেষ তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের ১১ মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৯৮ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরে একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২০২ কোটি ডলার। এক বছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। কোনো দেশের চলতি হিসাব মূলত বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য এবং মানুষের আয়কেন্দ্রিক আয়-ব্যয়ের হিসাব। চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো।
এছাড়াও সামগ্রিক লেনদেনেও (ওভারঅল ব্যাল্যান্স) ঘাটতি কমেছে বাংলাদেশের। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-মে পর্যন্ত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের (ঋণাত্মক) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮০ কোটি ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮৮ কোটি ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি বেড়ে যাওয়া মানে বিভিন্ন উৎস থেকে দেশে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, তার চেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিশোধ ঝুঁকি এড়াতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রচুর পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়। তবে এ খাতে ঘাটতি কিছুটা কমে আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ডলার বিক্রির চাপ আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে।
অবশ্য বিভিন্ন সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও আর্থিক হিসাবে কিছুটা অবনতি দেখা গেছে। যদিও তা এখনো ইতিবাচক রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরের ১১ মাসে বৈদেশিক বাণিজ্যের আর্থিক হিসাবে ২০৮ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত আছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের এ উদ্বৃত্ত ছিল ৫৫১ কোটি ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানানো হয়, আগে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক ছিল, যা এখন সমন্বয় করা হয়েছে। এতে করে আর্থিক হিসাবে এই উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে।
এদিকে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-মে বাংলাদেশ যেখানে ৪০৭ কোটি ডলারের এফডিআই পেয়েছিল। গেল অর্থবছরের একই সময় সেখানে এসেছে ৩৮১ কোটি ডলার। একই সঙ্গে আলোচিত সময়ে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগে (পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট) নেতিবাচক অবস্থা অব্যাহত আছে। ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের কারণে বিদেশিরা কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রবণতা এখন আরও বেড়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১১ মাসে পুঁজিবাজার থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছিল বিদেশিরা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে নিট ১১ কোটি ১০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয় তারা।
