ময়নাতদন্ত ছাড়াই অনেক লাশ দাফন

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৪, ০৩:০৬ এএম

ডা. সজীব সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রভাষক। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। ছোট ভাই আবদুল্লাহ উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে একটি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে। ঢাকায় আন্দোলনের খবর পেয়ে কর্মস্থল থেকে ১৮ জুলাই দুপুরে ছুটে আসেন ঢাকায়। উদ্দেশ্য ছিল, গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে নিয়ে যাবেন ছোট ভাইকে। বিকেল ৪টায় সর্বশেষ মায়ের সঙ্গে কথা হয় তার। এরপর আর মোবাইলে তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পরিবারের কাছে খবর আসে সজীব উত্তরায় বাংলাদেশ আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। সাড়ে ৭টায় হাসপাতালে আসেন তার ছোট বোন সুমাইয়া সরকার স্বর্ণা। ভাইয়ের লাশ দেখে মাকে ফোন করেন। পরে রাত পৌনে ১১টায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। পরদিন দাফন করা হয়।

সজীবের মতোই অনেক লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে গত মঙ্গলবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা হয়েছে। এতে প্রায় দেড়শজন মারা গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে লাশ এসেছে ৯৪টি। তার মধ্যে পাঁচটি লাশের ময়নাতদন্ত হয়নি। সংঘর্ষ চলাকালে যেসব লাশ বেসরকারি বা অন্য হাসপাতালে গেছে, সেগুলো ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ (৩) উপধারা অনুযায়ী, মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ডাক্তারের কাছে আসা লাশের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ মতামত সংবলিত প্রতিবেদনকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বলে। এ উপধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, হত্যাকা-, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, বিষপানে মৃত্যু, শরীরের যদি কোনো আঘাতের দাগ থাকে, অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বলে সন্দেহের অবকাশ থাকলেই সেখানে মৃত্যুর কারণ জানার জন্য ময়নাতদন্ত করতে হবে। এ ধরনের ঘটনায় প্রথমে পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। অর্থাৎ পুলিশ কর্মকর্তা কী অবস্থায় মৃতদেহটি দেখেছেন, মৃতদেহের বিস্তারিত বর্ণনা এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এরপর থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়রির পর পুলিশ মৃতদেহটি ময়নাতদন্ত করার জন্য পাঠিয়ে থাকে। তবে পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হলে একজন ম্যাজিস্ট্রেট সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। এরপর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোটা আন্দোলনে যেভাবে সংঘর্ষ হয়েছে তাতে দুপক্ষের যুদ্ধই বলা যায়। এতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর তখন কিছু করার থাকে না। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবারই সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটায় প্রাণহানি হয়েছে। যারা নিহত হয়েছেন তাদের লাশ যদি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া অন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যায় তখন ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা নয়। কারণ ওই সময় পরিস্থিতি ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। হাসপাতালগুলোতে পুলিশ ছিল না। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে স্বজনরা লাশ নিয়ে দাফন করেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে হাসপাতাল থেকে লাশ হস্তান্তর সংক্রান্ত কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে লাশ নিয়েছেন কেউ কেউ। জোর করে কাউকে স্বাক্ষর দিতে বলা হয়নি। তারা আরও জানতে পেরেছেন, অনেকের স্বজন লাশ শনাক্ত করে স্বাক্ষর ছাড়াই লাশ নিয়ে গেছেন। মানবিক কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ দিয়ে দিয়েছে।

ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, সংঘর্ষে কোনো ব্যক্তি কীভাবে মারা গেছে, তা উদঘাটন করতে হলে ময়নাতদন্ত লাগবেই। এক বা দুই মাস পর যদি কোনো ভুক্তভোগী থানায় জিডি বা মামলা করেন, সে ক্ষেত্রে লাশ কবর থেকে উত্তোলন করতে হবে। তদন্তের স্বার্থে লাশের ময়নাতদন্ত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এতে কিছুটা হলেও সমস্যা হবে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অন্তত পাঁচটি গুলিবিদ্ধ মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে ময়নাতদন্ত ছাড়াই। নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে দেশ রূপান্তর।

চিটাগং রোড এলাকায় রিকশা ভ্যানে করে ফল বিক্রি করেন আকাশের বাবা। বাবার ব্যবসায় সহায়তা করতেই নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থেকে আট মাস আগে সাইনবোর্ড এলাকায় আসেন তিনি। ঘটনার দিন পরিস্থিতি খারাপ দেখে ফলের দোকান গুছিয়ে নিচ্ছিলেন আকাশ। এ সময় একটি গুলি তার পেটে লাগে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ততক্ষণে তার প্রাণপ্রদীপ নিভে যায়। ঘটনার দিন রাতেই আকাশের মরদেহ হাসপাতাল থেকে সোনাইমুড়ী নিয়ে যায় তার পরিবার। দাফনও হয় সেদিন রাতেই।

এ পুরো সময় সঙ্গে ছিলেন নিহতের মামা বেলাল হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক কিছু করেও আমাদের সন্তান আর ফিরে পাব না। ওইদিন যে পরিস্থিতি হয়েছিল তাতে ওকে ভালোভাবে দাফন করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। এমনিতেই গুলি লেগেছে, তারপর ময়নাতদন্ত করলে দেহ কাটাছেঁড়া করবে, এজন্য আকাশের বাবা ও পরিবারের কেউই চায়নি ময়নাতদন্ত হোক।’ ময়নাতদন্ত করাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনীহা বা পুলিশের তরফ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে বেলাল বলেন, ‘না, সেরকম কিছুই না।’

একইদিন সাইনবোর্ড এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হয়ে মাথায় গুলি লেগে প্রাণ হারান রাকিব (১৮)। বরিশাল বানারীপাড়ার এ তরুণ সাইনবোর্ড এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাতালে নিয়ে আসেন তার বন্ধু রবিউল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাকিবের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে যায় তার বড় ভাই। কী কারণে ময়নাতদন্ত করা হয়নি তা আমি বলতে পারব না। আমি শুধু সেদিন তাকে নিয়ে যাই হাসপাতালে। এরপর তার বড় ভাই আসেন। বাদবাকি সবকিছু উনিই করেন।’

শনির আখড়া গোয়ালবাড়ী মোড়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়েছিল বৈদ্যুতিকসামগ্রী তৈরির কারখানার শ্রমিক আমিন (১৬)। সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয় সে। হাতের ইশারায় পরিচিতদের ডাকছিলেন তাকে উদ্ধার করতে। তবে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পথেই মারা যায় এ কিশোর। আমিনের মরদেহও ময়নাতদন্ত ছাড়া নিয়ে যায় তার পরিবার। এ প্রসঙ্গে কথা হয় তার বাবা ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের বুকের বাম পাশে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছিলেন আমরা ময়নাতদন্ত করব কি না? আমি বলেছি, ছেলে তো মারাই গেছে। এখন ময়নাতদন্ত করে আর কী লাভ। ছেলে কি আর ফেরত আসবে? সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকার বাসায় এনে লাশ গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পরিয়ে গ্রামের বাড়ি বাউফলে (পটুয়াখালী) এনে দাফন করেছি।’

২১ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সিগারেট খেতে বাসা থেকে বের হন জসিম হোসেন (৪০)। দনিয়া বাজারের পাশে কিছু লোক টায়ারে অগ্নিসংযোগ করেছিল। সেই স্থান লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলি এসে লাগে তার বুকের বাম পাশে। আহত অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে। পরে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জসিমের মরদেহও ময়নাতদন্ত ছাড়া হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে।

এসব তথ্য জানিয়ে তার শ্যালক স্বপন বলেন, ‘ময়নাতদন্ত করলে লাশ পেতে সাত-আট দিন সময় লাগত। এজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিষেধ না করলেও নিরুৎসাহিত করেছে। আমরাও চিন্তাভাবনা করে লাশটা নিয়ে চলে এসেছি। কিন্তু ময়নাতদন্ত না করায় হাসপাতাল থেকে আমাদের কোনো ডকুমেন্টস দেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘একটা গুলিবিদ্ধ লাশের তথ্য-প্রমাণ থাকল না। আমরা কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাব না। যদিও আমার দুলাভাই এলাকায় পরিচিত আওয়ামী লীগের কর্মী। নিয়মিত মিছিল-মিটিংয়ে থাকতেন। তাকে আওয়ামী লীগের সবাই চেনে। স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে সবাই তার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিচ্ছে। সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে। তবুও একটা ডকুমেন্টস রাখার দরকার ছিল।’

একইদিন সাইনবোর্ডের সাহেবপাড়া এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় ইমরান (১৬)। সংঘর্ষের সময় গুলিতে নিহত হয় সে। তারও মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে যান স্বজনরা।

ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের কাছে। তিনি এক ঘণ্টা পর ফোন দেওয়ার কথা বলেন। তবে এক ঘণ্টা পর ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

এ ধরনের লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়া নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো পুলিশ কেস হয়। পুলিশ কেস লেখা থাকলে এ ধরনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়া নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি জানি না ওখানে (ঢামেক) কী ঘটেছে। তবে অনেক সময় পরিবারের পক্ষ থেকে মুচলেকা দিয়ে এ ধরনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। এতে যদিও ভুক্তভোগীর পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অস্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো দালিলিক প্রমাণ তারা পায় না। অর্থাৎ চোখে দেখা গেলেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো দালিলিক প্রমাণ থাকে না।’

গত ১৮ জুলাই প্রায় সারা দিনই উত্তরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ওইদিন সেখানে শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১১ জন মারা গেছেন। তাদের মরদেহগুলো বাংলাদেশ আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ও ক্রিসেন্ট হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে গেছেন স্বজনরা। তাদের লাশ দাফনও করা হয়েছে।

সংঘর্ষে নিহত ডা. সজীব সরকারের ছোট বোন সুমাইয়া সরকার স্বর্ণা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমার ভাই পড়ালেখা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। মেডিকেল কলেজে লেকচারের পাশাপাশি তিনি নরসিংদীর নারায়ণপুর হসপিটালে রোগী দেখতেন নিয়মিত। তার আয়ের টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলত। কয়েক মাস আগে তার স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে। ভাইবোনদের খুবই ভালোবাসতেন তিনি। ঢাকায় সংঘর্ষের খবর শুনে ছোট ভাই মাদ্রাসার ছাত্র আবদুল্লাহর জন্য চিন্তায় পড়ে যান। তাকে বাড়িতে নিতে ঢাকায় এসে লাশ হয়ে গেলেন আমার ভাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যখন হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে যাই তখন আরও তিনটি লাশও ময়নাতদন্ত ছাড়া হস্তান্তর হয়েছে। মামলা-মোকাদ্দমা করার কোনো ইচ্ছা নেই। এ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে প্রশাসনের কেউ যোগাযোগ করেনি।’

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের বিষয় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়মিত বৈঠক করছেন। ওই বৈঠক থেকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত