গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া টানা আড়াই মাস সরকারবিরোধী আন্দোলন করে বিএনপি ‘সাফল্য’ না পেলেও মামলা ও গ্রেপ্তারের চাপে পড়তে হয়েছিল। এরপর ছোটখাটো কর্মসূচি দিয়ে মাঠে ছিল দলটি। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে আবার একই চাপে পড়েছে দলটি। একইভাবে বিএনপির সমমনা দলগুলো চাপে পড়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ‘একগুচ্ছ’ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা ছিল বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর। চলতি মাসে বৈঠক করে দলগুলো আন্দোলনের বিষয়ে একমতও হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনায় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে তারা।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপি ও জোটের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আন্দোলনে মাঠে না থেকেও অধিকাংশ মামলার আসামি হচ্ছেন বিএনপি ও সমমনা দলের নেতারা। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় করা মামলায় আসামির তালিকায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংখ্যাই বেশি। এজাহারে নাম না থাকলেও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে অনেককে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের পর নেতাকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আত্মগোপনে চলে গেছেন অনেকে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেছেন, কোটা আন্দোলনে বিএনপি সমর্থন দিলেও মাঠে সহিংসতার জন্য সরকারই দায়ী। তারা বলছেন, সরকারপ্রধান সরাসরি বিএনপি, জামায়াতসহ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোকে দোষারোপ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকেও দাবি করা হচ্ছে, নাশকতায় বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
বিএনপির এই দুই নেতার দাবি, সরকার এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল নিয়েছে। অর্থনৈতিক, দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সে কারণেই এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সরকারের মূল উদ্দেশ্যটা হচ্ছে, কোটা আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করা। সেজন্যই প্রথমত, বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোকে জড়িয়ে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দিতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, বিএনপি যে একগুচ্ছ কর্মসূচি দেওয়ার কথা বলেছিল, সেটি ভন্ডুল করতে চাচ্ছে। বিগত আন্দোলনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখবেন, তার ছিটেফোঁটাও এই আন্দোলনে নেতাকর্মীদের মাঠ থেকে গ্রেপ্তার, আহত বা নিহত হওয়ার খবর সরকার বা গণমাধ্যম দেয়নি।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনে ভূমিকা রাখার মিথ্যা অভিযোগে ঢালাওভাবে বিএনপি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দোষারোপ করা হচ্ছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে তাদের ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়নি কেন? এটাই জনগণের প্রশ্ন। এতে প্রমাণিত হয়, বিএনপি কিংবা বিরোধী দলের কেউই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নয়।’
গত বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে রাজধানীতে ব্যাপক সহিংসতার পর বিএনপি নেতারা আড়ালে চলে যান। ওই সময় বিএনপির দাবি অনুযায়ী, ২৫ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিএনপির দাবি। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় এখনো গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ ২০ নেতাসহ ১ হাজার ৭৫৮ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
বিএনপির সূত্র বলছে, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইয়েদুল আলম বাবুল, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সমবায়বিষয়ক সম্পাদক নাজমুল হক, নির্বাহী কমিটির সদস্য (দপ্তরে সংযুক্ত) তারিকুল ইসলাম তেনজিং, ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, উত্তরের আহ্বায়ক সাইফুল আলম নিরব, সদস্য সচিব আমিনুল হক, বিএনপি নেতা এসএম জাহাঙ্গীর, বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএ সালাম, দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর, পেশাজীবী নেতা ইঞ্জিনিয়ার সাখাওয়াত হোসেন, ডা. সাখাওয়াত হোসেন শায়ন্ত, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলুর ছেলে সানিয়াতসহ (রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন) অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। পাশাপাশি বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসায় পুলিশের তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এসব নেতার মধ্যে আছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তাহসীনা রুশদি লুনা, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।
বিএনপি নেতারা বলছেন, গত ১৯ জুলাই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের তল্লাশি ও কার্যালয়ে তালা মেরে দেওয়ায় রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে সারা দেশে কত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কতজনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে কিংবা কতজনকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান দলের কাছে নেই। কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী আত্মগোপনে থাকায় তারাও কোনো তথ্য জানাতে পারছেন না। বিভিন্ন মাধ্যমে বিএনপির পক্ষ থেকে জানার চেষ্টা করলেও সেখানে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দিন আগে পুলিশ ক্রাইম সিন ফিতে লাগিয়ে দিয়েছে। যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ থাকায় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে তথ্য পাচ্ছি না। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানতে পেরেছি, তাতে আমাদের প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে কর্মসূচি নিয়ে চলতি মাসেই নামার পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। চলতি সপ্তাহের শনিবার ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও মুক্তি দাবিতে সমাবেশের চূড়ান্ত করা হয়েছিল। সেখান থেকে সরকারবিরোধী একগুচ্ছ কর্মসূচি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু কোটা আন্দোলনের কারণে ফের বেকায়দায় পড়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো কর্মসূচিই দিতে পারছে না দলটি। সাংগঠনিক নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ায় মাঠপর্যায়ের নেতারাও ধোঁয়াশায় আছেন তাদের পরবর্তী করণীয় নিয়ে।
তবে দলটি বলছে, এমন ঘটনা তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। তারা এগুলো রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। শিগগিরই পরবর্তী করণীয় নিয়ে দলটির হাইকমান্ড বৈঠকে বসবে বলেও জানান স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য। আর জোট নেতারা বলছেন, বর্তমান অবস্থার রাজনৈতিক সমাধান না করতে পারলে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবেন তারা।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘সরকারের উচিত সব বিরোধী দলের সঙ্গে বসে নিজেদের আত্মরক্ষার্থে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। সরকার যদি গ্রেপ্তার-নির্যাতন-নিপীড়ন অব্যাহত রাখে, তাহলে শিগগিরই আমরা নতুন করে সরকারের পদত্যাগের এক দফার আন্দোলন ঘোষণা করব।’
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, কার্যালয় তালাবদ্ধ, তবে ‘ক্রাইম সিন’ লেখা ফিতা নেই। কার্যালয়ে প্রবেশমুখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কয়েকটি চেয়ার পড়ে আছে। দলটির কোনো নেতাকর্মীকে সেখানে দেখা যায়নি। গত ১৬ জুলাই কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) কার্যালয়টি তালাবদ্ধ ও চারপাশে ‘ক্রাইম সিন’ লেখা হলুদ ফিতা টানিয়ে দিয়েছিল।
