‘রাসেল, অবোধ শিশু, তোর জন্য/ আমিও কেদেছি/ খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে যারা/ একদিন তুলেছিল আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি/ তারাই দু’দিন বাদে থুতু দেয়, আগুন ছড়ায়-/ বয়ষ্করা এমনই উন্মাদ।/ তুইতো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে/ সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়সেতে ছিলি!/ তবুও পৃথিবী আজ এমন পিশাচি হলো/ শিশুরক্তপানে তার গ্লানি নেই?/ সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে!/ যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায়/ আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই। (শিশুরক্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
সুনীলের মতো গোটা বাংলাদেশ এখন শোকার্ত। আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে না পারার গ্লানি, খুন হয়ে যাওয়ার দুঃখে আমরা কাতর। বড়দের রাজনীতি আর হানাহানির বলিখেলায় হারিয়েছে ছোট ছোট কত প্রাণ। কেউ কেউ হারিয়েছে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে চলা গত কিছুদিনের সংঘর্ষে গোটা বাংলাদেশ শোকাভিভূত। বহু প্রাণ ঝরেছে, অগণিত আহত হয়েছেন, দেশের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। গোটা দেশ পরিণত হয়েছে ত্রাসের রাজ্যে। এখনো সীমিত পরিসরে কারফিউ চলছে গোটা দেশে। আমরা ফিলিস্তিন আর সিরিয়ার শিশুদের অসহায়ত্ব নিয়ে সোচ্চার থাকি, ভীত থাকি, অথচ আমাদের নিজেদের শিশুরাই আজ নিরাপত্তাহীন। কী দোষ ছিল ছোট্ট রিয়ার! গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, দুপুরে খাওয়ার পর ছাদে খেলতে গিয়েছিল মেয়েটি। খানিক পরেই রাস্তায় সংঘর্ষ বাধে। বাসার সামনে হইহল্লা শুনে বাবা ছুটে যান ছাদ থেকে মেয়েকে ঘরে আনতে। মেয়েকে কোলে নিতেই একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় রিয়ার মাথায়। মুহূর্তেই ছোট্ট দেহটি ঢলে পড়ে বাবার কোলে।
আহারে! কী বীভৎস! কী দারুণ যন্ত্রণা ভোগ করছিল মামণি আমার! তোমার ছোট্ট দেহটা কি আমাদের খুব অভিশাপ দিচ্ছিল! কী ভাবছিলেন রিয়ার অসহায় বাবা! ছয় বছরের রক্তে ভেজা শিশুটিকে কোলে নিয়ে কী অব্যক্ত যন্ত্রণায় ভুগছিলেন দীপক কুমার গোপ?
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা যায়, গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে মেয়েকে আনতে ছাদে যান দীপক। রিয়াকে কোলে নিয়ে দৌড়ে যান সিঁড়ির কাছে। রিয়া তখন নিথর, বাবার কোলে মাথা এলিয়ে দেয়। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরতে দেখে আঁতকে ওঠেন বাবা। রক্তাক্ত মেয়েকে কোলে নিয়েই ছোটেন ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। অবস্থা সঙিন দেখে সেখানকার ডাক্তাররা রিয়ার বাবাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে যেতে বলেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে রিয়াকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
পাঁচ দিন ধরে রিয়ার অসহায় মা-বাবা আর দুর্ভাগা স্বজনরা অসম্ভব আশায় বুক বাঁধেন। ওই তো, দুবার ছোট বাচ্চাটা নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যেও তো আঙুল তুলল। হে ঈশ্বর! আমরা স্বপ্ন দেখি। যেভাবে আমরা এই পোড়া দেশকে নিয়ে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি। হায় স্বপ্ন! বুধবার বেলা ১১টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে রিয়া। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়, ‘গানশট ইনজুরি’। ডাক্তার জানান, তার মাথার একদিক দিয়ে গুলি ঢুকে আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মাথার খুলি ভেঙে মগজ ছেদ করে গুলি বেরিয়ে গেছে। রাতেই মাসদাইর শ্মশানে দাহ করা হয় গুলিতে নিহত রিয়াকে। ছোট্ট মেয়েটার নিষ্প্রাণ দেহে চিতার আগুন জ¦ললেও সে তো আসলে পুড়ল আমাদের ব্যর্থতার আগুনে। আমাদের খুব করে অভিশাপ দিস মা! খুব করে!
স্বর্গের বাগানে রিয়ার সঙ্গে আবদুল আহাদের দেখা হবে নিশ্চয়ই। একটা গুলি ডান চোখে বিদ্ধ হয়ে মাথাতেই আটকে গিয়েছিল চার বছরের আহাদের। গত শুক্রবার ১৯ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকার ১১তলা একটি বাড়ির ৮তলার ফ্ল্যাটে মা-বাবার সঙ্গে ছোট্ট আহাদ জানালা দিয়ে তাকিয়েছিল। আহাদের বাবা আবুল হাসান ভেবেছিলেন বাচ্চাটা বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টের পান রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘর! কতটুকুই বা রক্ত ছিল ওই ছোট্ট দেহে! অত রক্ত ঝরার পরেই আমাদের বাচ্চাটা প্রাণপণে বাঁচার লড়াই করল। তবে আইসিইউ, সিটিস্ক্যান ওসব পেরিয়ে লড়াইটা আর চালাতে পারল না। এক নিথর জনপদকে ভারী করে বিদায় নিল ওই পালকের মতো শিশুটা। মাও সে-তুং বলতেন, কিছু কিছু মৃত্যু পালকের চেয়ে হালকা আবার কোনো কোনোটা পাহাড়ের থেকেও ভারী।
কিন্তু আমাদের সব যন্ত্রণা দিয়েও কি আমরা ১১ বছর বয়সী সামিরের কষ্টটা টের পাব? এক ঘাতক বুলেট সাফকাত সামিরের চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার খুলি ভেদ করে বেরিয়ে যায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে মিরপুরে কাফরুল থানার সামনের সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ঢুকছিল সামিরের ঘরে। জানালা বন্ধ করতে গেলে বাইরে থেকে গুলি এসে বিদ্ধ করে শিশুটিকে। গুলিটি তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘরে ছিল তার চাচা মশিউর রহমান (১৭)। তার কাঁধেও গুলি লাগে।
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া সামির অবশ্য মরেও রক্ষা পায়নি, রাজনীতির কূটচাল এই পবিত্র শিশুটিকেও কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল। সামিরের বাবা সাকিবুর রহমান জানান, সামির মারা গেছে নিশ্চিত হওয়ার পর পাল্টাপাল্টি পক্ষ নিজেদের সুবিধা দেখতে থাকে। একদিকে কিছু তরুণ এসে দাবি করে, তারা সামিরের লাশ নিয়ে মিছিল করবে। অন্যদিকে স্থানীয় কিছু রাজনীতিবিদ আইনি জটিলতা এড়ানোর নাম করে ময়নাতদন্ত না করে দ্রুত লাশ দাফনের জন্য চাপ দেয়।
সামিরের চেয়ে চার বছরের বড় নাইমা। রাজধানীর উত্তরার নাইমা সুলতানা (১৫) মাইলস্টোন স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ত। ১৯ জুলাই গোলাগুলির শব্দ পেয়ে উত্তরার ৫ নম্বর সড়কে ভাড়া বাসার চারতলার বারান্দায় গিয়ে উঁকি দেয় নাইমা। হঠাৎ একটি গুলি এসে তার মাথায় লাগে। সঙ্গে সঙ্গে সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। সেখান থেকে স্বজনরা তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গত শনিবার পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। ডাক্তার হতে চাওয়া নাইমার ছোট্ট কবরটা আমাদের অসুস্থ সমাজের এক প্রতীক হয়ে থাকবে। মনে করিয়ে দেবে এক দাহকালের কথা।
নাইমার সমবয়সী নবম শ্রেণিতে পড়া তাহমিদ ভূঁইয়া তামিম। ১৮ জুলাই এই কিশোর নরসিংদী জেলখানার মোড়ে গ-গোলের খবর পেয়ে সেখানে যায়। সেখানে তখন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলছে। চলছে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গোলাগুলি। এদের সঙ্গে উৎসাহী তামিম মিশে যায়। সেøাগান দেয়। রাবার বুলেট এসে ঝাঝরা করে দেয় শিশুটির দেহ। শুধু তা-ই না, এরপর আন্দোলনকারীরা তার মরদেহ একটি স্ট্রেচারে রেখে সেটিকে ঘিরেই আন্দোলন করতে থাকে। পুলিশ আবার গুলি চালায়, ইতিমধ্যে মরে যাওয়া তামিম আরও গুলি খেতে থাকে। সেখান থেকে শখানেক গজ দূরে থাকা তামিমের অসহায় বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া যেন বাংলাদেশের প্রতিমূর্তি। সন্তানের মৃত্যু আর মৃত্যু-পরবর্তী বীভৎসতা দেখে স্তব্ধ, শোকাতুর।
তামিমের চেয়ে বয়সে অনেকটা ছোট হলেও জীবনের কঠিন দিকটা অনেক বেশি দেখে ফেলেছিল ১০ বছরের হোসেন মিয়া। ওইটুকু বয়সেও পপকর্ন, আইসক্রিম ও চকলেট ফেরি করতে হতো। জন্মই আমার আজন্ম পাপ এই ভারী কথাটা না শুনে থাকলেও পৃথিবীর এক প্রবল অসাম্যের জনপদে জন্মে ছেলেটা দেখেছিল জীবন কী কঠিন। ২০ জুলাই দুপুরে রাজধানীর চিটাগাং রোড এলাকায় গোলাগুলি ও সংঘর্ষের মধ্যেই ফেরি করতে বের হয়। কখন জানি একটা গুলি এসে ছোট্ট বুকটা চিরে দিয়ে যায়। লাশঘরে ফেলে রাখা শবদেহটা শনাক্ত করেন হোসেনের অসহায়, দরিদ্র পিতা-মাতা। মা মালেকা বেগমকে চিকিৎসা করাবে তাই নাকি ওইটুকু হোসেন সেদিন টাকা জোগাড় করার জন্য ফেরি করতে বেরিয়েছিল। টাকার বদলে হোসেনের কপালে জুটল দুইটা গুলি। বাংলা মায়ের মতো হোসেনের অসুস্থ মায়ের জন্য রইল কেবল পৃথিবীর চেয়ে বিশাল এক কষ্টের ক্ষত।
না, দরিদ্র মায়ের জন্য কেবল কষ্টই না, ভোগান্তিও ছিল। এ দেশে গরিব হয়ে জন্মেছে আর ভোগান্তি সইবে না! নাড়িছেঁড়া ধন হারিয়েও তাই মালেকা দম্পতিকে এই অফিস-সেই অফিস করত হলো। থানায় জিডি করতে হলো। ক্ষতবিক্ষত লাশটাকে সামনে রেখে কত কত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। শিশুদের সুরক্ষা না দিতে পারলেও, তাদের মা-বাবাদের জন্য এসব কাগুজে জটিলতার তো শেষ নেই আমাদের রাষ্ট্রের।
সেই রাষ্ট্রে কী করে বড় হবে চার বছরের সাদিরা জামান বা জান্নাতুল আর ছোট্ট সাইফ! সাদিরার বাবা তাহির জামান প্রিয় কাজ করতেন ফটোসাংবাদিক হিসেবে। রাজধানীর গ্রিন রোডে ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন তাহির। দুই বছর আগে মা-বাবার বিচ্ছেদ হওয়ায় বাবা আর দাদিকে নিয়েই থাকত সাদিরা। উত্তরার এক অটোমোবাইলসের দোকানে চাকরি করতেন জসিম উদ্দিন। ১৮ জুলাই মালিকের নির্দেশে তিনি ও অপর এক সহকর্মী উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে যান গাড়ির কিছু যন্ত্রাংশ কিনতে। কিনে আসার পথে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থলেই মারা যান জসিম। জসিমের দেড় বছর বয়সী ছেলে সাইফের এখনো বোঝার বয়স হয়নি। ১০ বছরের মেয়ে জান্নাতুল নিথর হয়ে গেছে। বাবাই যে ছিল মেয়েটার কাছে সব। বরিশালের বানারীপাড়ায় বসবাস করা জান্নাতুল মাসজুড়ে অপেক্ষা করত বাবার বাড়ি আসার। মা বকা দিলে বাপের কাছে নালিশ করত আদুরে বাচ্চাটা। কার কাছে এখন নালিশ জানাবে জান্নাতুল?
‘কার কাছে বলি ভাতরূটি কথা, কাকে বলি করো, করো করো ত্রাণ,
কাকে বলি, ওগো মৃত্যু থামাও, মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ।
শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত শিশু মরে গেল,
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।’
(যশোর রোড- অ্যালেন গিন্সবার্গ)
