ক্রিকেটার হতে চেয়েছিল তামিম

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৪, ০৭:২২ এএম

ক্রিকেটপাগল ছিল তাহমিদ ভূঁইয়া তামিম (১৫)। ক্রিকেট খেলতে খুব ভালোবাসত। স্বপ্ন দেখত দেশের স্বনামধন্য ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ভর্তি হবে। নিজেকে দেশের একজন বড় ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলবে। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। গত ১৮ জুলাই ঢাকা-সিলেট মহাড়কের নরসিংদী শহরের জেলখানার মোড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রাবার বুলেটের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় তামিম।

নিহত তাহমিদ নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার ছেলে। পল্লীচিকিৎসক বাবা ও গৃহিণী মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিল তাহমিদ। তার ১৩ ও তিন বছর বয়সী দুটি বোন রয়েছে।

তামিমের বাড়ি ঘটনাস্থল জেলাখানার মোড় থেকে ৫০০ গজ দূরে। গত রবিবার দুপুরে তাহমিদের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তারা টিনশেড পাকা বাড়িতে বসবাস করে। বাড়িতে একেবারে সুনসান নীরবতা। তাহমিদের মৃত্যুর পর তার মা অসুস্থ হয়ে গেছেন। বাড়ির সদস্যরা সাংবাদিকদের কাছে দূরত্ব বজায় রাখছেন। তারা কোনো কথা বলতে চাইছেন না।

তাহমিদের স্বজনরা জানান, ১৮ জুলাই দুপুরে পরিবারের সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খায়। পরে বিছানায় শুয়ে তাহমিদ ও তার ছোট বোন লিনাত (১৩) মোবাইল ফোন নিয়ে খেলছিল। একপর্যায়ে তাহমিদ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এ সময় মা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন বাবা। বেলা ৩টায় তাহমিদ ঘর থেকে বেরিয়ে সড়কে উঠতেই তার দেখা হয় তাদের বাড়িতে কাজ করা গৃহপরিচারিকার সঙ্গে। তিনি এ সময় তাহমিদকে জিজ্ঞেস করে কোথায় যাচ্ছে? উত্তরে তাহমিদ বলেছিল, ‘আমি যাচ্ছি জেলখানার মোড়ে কী হচ্ছে, একটু দেখে আসার জন্য।’ ওই সময় গৃহপরিচারিকা তাকে ঝামেলার মধ্যে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তাহমিদ তার কথা শোনেনি।

পরে তাহমিদ জেলখানার মোড়ে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিশে যায়। সে সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলছে। চলছে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গোলাগুলি। এ সময় তাহমিদ রাবার বুলেটে বিদ্ধ হয়। আন্দোলনরতরা গুলিবিদ্ধ তাহমিদকে নিয়ে পাশের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করার পরই তারা লাশ হাসপাতালের স্ট্রেচারে করে আন্দোলনস্থলে নিয়ে আসেন।

এদিকে তাহমিদকে খুঁজতে তার বাবা-মা জেলখানার মোড়ে আসেন। তারা ভিড়ের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাহমিদকে পাননি। পরে ছেলেকে না পেয়ে মা বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান ছেলের মরদেহ আন্দোলনকারীরা নিয়ে এসেছে। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তাহমিদের ফুপা লুৎফর রহমান বলেন, তাহমিদ ছোট থেকেই মেধাবী ছিল। সে একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ত। পরে তার মধ্যবিত্ত বাবার পক্ষে সেই খরচ কুলিয়ে উঠতে না পারায় তাকে এনকেএম স্কুলে ভর্তি করায়। সে লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেট ভালোবাসত। সে ভালো খেলতও। স্বপ্ন ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়ার, তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নরসিংদী জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, রাবার বুলেটে বিদ্ধ তাহমিদকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাকে মৃত ঘোষণা করার পরপরই উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে ভাঙচুর চালায়। আমরা চেয়েছিলাম, তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠাতে। শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে আমরা সেটা পারিনি।

তাহমিদের বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মরদেহের ময়নাতদন্ত করার জন্য বলা হয়েছিল। তবে আমি রাজি হইনি। সবার সামনেই গুলি করে ছেলেকে মারা হয়েছে, ময়নাতদন্ত করে আর কী হবে? আমার ছেলেকে তো আর ফেরত পাব না। পরে বৃহস্পতিবার রাতে তাহমিদের স্কুলে ও স্থানীয় ঈদগাহে দুই দফা জানাজা শেষে চিনিশপুর কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত