তিলকরত্নে যেন আরেক হাথুরুসিংহে

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৪, ০৪:২৬ পিএম

জাতীয়তা একই হলেও খেলোয়াড়ি জীবনে দুজন ছিলেন দুই মেরুর বাসিন্দা। হাসান তিলকরত্নে ছিলেন শ্রীলঙ্কার ১৯৯৬’র বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য, পরে টেস্ট অধিনায়কও হয়েছিলেন। অন্যদিকে চন্ডিকা হাথুরুসিংহে ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক বিস্মৃতপ্রায় ক্রিকেটার, স্বল্পস্থায়ী ক্যারিয়ারে নেই তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন।

বাংলাদেশে এসে দুজনের অবস্থান বদলে গেছে। অতীতে পাওয়া সাফল্যের সুবাদে হাথুরুসিংহে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে এসে হয়ে উঠেছেন স্বেচ্ছাচারী, তাকে দেখে স্বদেশি তিলকরত্নে ও নারী দলের কোচ হিসেবে হাঁটছেন একই পথে।

শ্রীলঙ্কায় এশিয়া কাপ খেলে, সেমিফাইনালে ভারতের কাছে বিশাল ব্যবধানে হেরে রবিবার ঢাকায় ফিরেছে বাংলাদেশ নারী দল। আরব আমিরাত এবং মালয়েশিয়ার মতো উঠতি দলগুলোর সঙ্গে জিতলেও আসরের দুই ফাইনালিস্ট ভারত ও শ্রীলঙ্কার কাছে বড় ব্যবধানেই হেরেছে বাংলাদেশ। ব্যাটিংয়ে দক্ষতার অভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের উইমেনস উইং-এর ইনচার্জ হাবিবুল বাশার শ্রীলঙ্কা থেকে ফেরার পর দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ব্যাটিং নিয়ে তার হতাশার কথা। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের মেয়েদের এশিয়া কাপ জয়ের সময় দলের ম্যানেজার থাকা নাজমুল আবেদীন ফাহিম এই ব্যাটিং ব্যর্থতার দায় দিচ্ছেন কোচকে। দলের একজন সদস্যও দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রাধান্য দিতে গিয়ে দলের বিপদ ডেকে আনছেন কোচ।

হাবিবুল দেশ রূপান্তরকে স্পষ্টই জানিয়েছেন টপ অর্ডার ব্যাটিং নিয়ে তার হতাশার কথা, ‘আমাদের বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে টপ অর্ডার ব্যাটিংটা। যে দুটো বড় ম্যাচ ছিল দুই ম্যাচেই আমাদের টপ অর্ডার ফেল করেছে। আসছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমরা যদি ভালো করতে চাই তাহলে আমাদের টপ অর্ডার ব্যাটিং ভালো করতেই হবে। দলের বোলিংটা ভালো হচ্ছে, ফিল্ডিংটা আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে। তবে মেজর ইস্যু আমাদের টপ অর্ডার ব্যাটিং।’
 
ঠিক দুই মাস পর দেশেই শুরু হচ্ছে মেয়েদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নবম আসর, এত কম সময়ে টপ অর্ডারের ব্যাটিং ব্যর্থতা ঘুচিয়ে ফেলা কতটা সম্ভব? এর জন্য বিদেশি কোনো উপদেষ্টা বা বিশেষ কোনো ক্যাম্পের আয়োজন কি করা হচ্ছে? এমন প্রশ্নে মহিলা ক্রিকেট বিভাগের প্রধান জানালেন, ‘আমার মনে হয় না এখন বিদেশি কোচ বা ক্যাম্প এ রকম বেশি কিছু করার আছে। দলেও খুব বেশি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের হাতে খুব বেশি খেলোয়াড়ও নেই। আমাদের একটা এনসিএল (জাতীয় ক্রিকেট লিগ) হবে সামনের মাসে। ৮টা বিভাগীয় দল নিয়ে। হয়তো সেখান থেকে আমরা কোনো ক্রিকেটার পাব।’
 
বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক এবং সাবেক প্রধান নির্বাচক হাবিবুল ছিলেন একটা সময়ে দেশের সেরা ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশের টেস্ট পদযাত্রার ঊষালগ্নে তার ব্যাটের দিকেই তাকিয়ে থাকত দল। নতুন দায়িত্বে এসেছেন মাস ছয়েক হয়। তার পর্যবেক্ষণ, ‘আমাদের মেয়েরা ভালো করছে, তবে আশপাশের অন্য দেশগুলো যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের মেয়েদের ক্রিকেট সেভাবে এগোচ্ছে না। আমরা এখনো ১১০-১২০ রানের খেলা খেলতে চাই। অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ এসব দল প্রায় ২০০ রান করে ফেলছে, কালকের ফাইনালে (রবিবার, এশিয়া কাপের ফাইনাল) দেখলাম শ্রীলঙ্কা ১৬০ রানের বেশি তাড়া করে জিতেছে। আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে, এই অল্প সময়ে আমরা যেটা করতে পারি মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারি যে আমরা ১২০ রানের খেলা খেলব না, ১৬০ রানের খেলা খেলব। বিশ্বকাপের আগে খুব বেশি সময় নেই বিশ্বকাপের পর কিছু কাজ করতে হবে।’
 
মাথাব্যথার নাম ব্যাটিং অথচ ব্যাটিং নিয়ে খুব একটা কাজই নাকি হয়নি এশিয়া কাপের প্রস্তুতিপর্বে। দলের সঙ্গে থাকা একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘এই প্রথম একজন কোচ দেখলাম যার কাছ থেকে আমি কিছুই শিখিনি। বিকেএসপিতে যে ক্যাম্প হয়েছিল (এশিয়া কাপে যাওয়ার আগে) সেটা ছিল সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ প্রস্তুতি। ব্যাটিং নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এক থেকে ছয় পর্যন্ত ব্যাটারের ভূমিকাটা এক রকম, পরের দিকের ব্যাটারদের অন্যরকম। উনি (তিলকরত্নে) দলের ১৫ জনকে একই রকম ব্যাটিং অনুশীলন করাতেন, ১ থেকে ১১ সবাই একই রকম ব্যাটিং অনুশীলন করত। উনি খালি ফিটনেসের কাজ করাতেন। ম্যাচ খেলিয়েছেন কম, সে সব ম্যাচও সম্ভাব্য একাদশে থাকাদের বিপক্ষে বাকিদের নিয়ে গড়া দলের বিপক্ষে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকেনি ম্যাচগুলোতে। কোচ প্রিমিয়ার লিগের একটা ম্যাচও দেখেননি।’
 
তিলকরত্নের অধিনায়কত্বেই ক্যারিয়ারের শেষ খেলেছিলেন যে হাথুরুসিংহে, তিনিও বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচ দেখেন না। বিপিএলের ম্যাচ দেখার সময় তার টিভি বন্ধ করে দিতে ইচ্ছে করে, সেটা বলেছেন সাক্ষাৎকারে! এখানেই শেষ নয় দুজনের কর্মকান্ডের মিল, আরও আছে। কোচিং স্টাফে নিজস্ব লোক ঢোকানো এবং  ব্যক্তিগত পছন্দের ক্রিকেটারদের একাদশে বেশি সুযোগ দেওয়ার ‘রোগ’ আছে তিলকরত্নেরও।
 
হাথুরুসিংহে প্রথমবার বাংলাদেশে এসে ড্রেসিংরুমকে রীতিমতো ‘শ্রীলঙ্কান’ বানিয়ে ফেলেছিলেন ফিজিও থিয়ান চন্দ্রমোহন, ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়েন, ব্যাটিং কোচ থিলান সামারাবিরাদের এনে। নারী দলেও স্পিন কোচ হিসেবে তিলকরতেœর সঙ্গে আছেন আরেক শ্রীলঙ্কান, দিনুকা হেতিয়ারেচ্চি। দলের সঙ্গে থাকা সেই সদস্য জানালেন, ‘কোচ পেসার খেলাতেই চায় না একাদশে। সবগুলো ম্যাচে একজন মাত্র পেস বোলার খেলিয়েছেন। কারণ স্পিনাররা ভালো  করলেই কৃতিত্ব যাচ্ছে স্পিন বোলিং কোচের পকেটে।’
 
তিলকরত্নে বাংলাদেশের নারী দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ছিলেন শ্রীলঙ্কার নারী দলের দায়িত্বে। তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পর কোচ হয়েছেন রুমেশ রত্নায়েকে। এশিয়া কাপ জয়ের পর ক্রিকেটাররা প্রশংসায় পঞ্চমুখ কোচের। চামারি আতাপাত্তুরা বলেছেন কোচ কীভাবে তাদের বদলে দিয়েছেন। অন্যদিকে তিলকরতেœর সঙ্গে নাকি দেখাই করেননি বা কথাই বলেননি শ্রীলঙ্কার নারী দলের কোনো ক্রিকেটার, যেটা স্বাগতিক শ্রীলঙ্কায় হতে পারত খুবই প্রত্যাশিত এবং স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপনও অবশেষে বলেছেন হাথুরুসিংহে কড়া হেডমাস্টার, তিলকরত্নেও নারী দলে যেন অনেকটা একই ভূমিকা নিয়েছেন।
 
বাংলাদেশ দল ২০১৮ সালে ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে ১৪০ এর বেশি তাড়া করে জিতেও ৬ বছর পর কেন ৮০ রানেই আটকে যায়, সে জন্য ফাহিম মনে করেন ব্যর্থতা শতভাগ কোচের, ‘একজন ব্যাটসম্যানকে তৈরি করতে হয়। তার আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হয়। এখানেই তো কোচের কৃতিত্ব, খেলোয়াড়ের কাছ থেকে পারফরম্যান্স আদায় করে আনা। এই কাজটায় কোচ শতভাগ ব্যর্থ। এদের ধমক দিলে, ভয়ে এরা কুঁকড়ে যাবে এবং পারফরম্যান্স আরও খারাপ হবে। ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মেয়েদের দেখে মনে হয়নি তারা একটা দল হিসেবে খেলছে। যে যার মতো আসছে, এসে ব্যাট করে চলে যাচ্ছে।’
 

মেয়েদের ব্যাটিং দেখে তার কাছে মনে হয়েছে, ‘বেশিরভাগই ব্যাকফুটে কোনো শট খেলতে পারে না। স্ট্রাইক রোটেট করতে পারে না। সিঙ্গেলস নিতে পারে না, রানিং বিটুইন দ্য উইকেটেও দুর্বল। এসব ভালো করাই তো কোচের কাজ। তা না হলে কোচ রেখে লাভ কি? আসলে প্রিমিয়ার লিগে একটা দুটো দল বাদে বাকি সব ক্লাবই দল গড়ে দায়সারা ভাবে, ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গাটা সেভাবে গড়ে ওঠে না। ব্যাটাররা কাদের বিপক্ষে রান করছে সেসব বিবেচনা করা হয় না। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসলে দুর্বলতাটা প্রবলভাবে ধরা পড়ে।’

বাংলাদেশের পর্যায়ের একটি দেশে এসব সমস্যা মেয়েদের ক্রিকেটে থাকবেই। সেসব নিয়েই কাজ করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই কোচের কাজ। তবে দলের সঙ্গে থাকা একাধিক সদস্যের অভিমত, সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে কোচ নিজেই হয়ে উঠেছেন বড় সমস্যা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত