বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও দলটির ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার জন্য কিছুটা সময় নিচ্ছে সরকার। আইনগত দিক ও নিষিদ্ধ করার পর কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।
গতকাল বুধবারও স্বরাষ্ট্র এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। যেকোনো সময় নিষিদ্ধের ঘোষণা আসবে।
মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, বুধবারের মধ্যে জামায়াত ও ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ করা হবে। ওইদিন বিকেলে হঠাৎ সাত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে আলোচনা করা হয়। নিষিদ্ধ করার পর কী ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, তা নিয়েও দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পেছনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা রয়েছেন বলে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করছেন। তাদের রুখতে যা যা করা প্রয়োজন তাই করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। চোরাগোপ্তার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি বৈঠকে। নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধের পর জামায়াত ও ছাত্রশিবির মরণ-কামড় দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। নাম প্রকাশ না করে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলটিকে নিষিদ্ধ করতে ‘কিছুটা’ সময় নেওয়া হচ্ছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ঘোলাটে হয়ে আছে। এরই মধ্যে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা এলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া কোন প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করা হবে, তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন তারা। সবদিক বিশ্লেষণ করেই এগোচ্ছে সরকারের হাইকমান্ড।
তিনি আরও বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলাও চালানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে ব্যাপক। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আরও কঠোর নিরাপত্তার বলয় গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষকে নির্মূল করতে সশস্ত্র কর্মকান্ড পরিচালনা করে দলটি।
গতকাল নিজ কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। যেকোনো সময় নিষিদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হবে। জামায়াত আগেই নিষিদ্ধ ছিল। জিয়াউর রহমান এসে তাদের আবার রাজনীতির অধিকারটা দিয়েছে। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলো এবং এ দেশের সুশীলসমাজ উভয়ই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জন্য অবিরাম বলে আসছিল। এটা জনগণের একটি দাবি ছিল।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গত পরশু ১৪ দলের বৈঠক হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী অনেকের মতামত নিয়েছেন। সবাই প্রধানমন্ত্রীকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকেও দু-একটি মামলায় সিদ্ধান্তের মধ্যে বলা হয়েছে এ দলটি জঙ্গি, দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা উচিত। সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে এ দলকে নিষিদ্ধ করার জন্য। সেই প্রক্রিয়াটি চলছে, যেকোনো সময় প্রক্রিয়াটি শেষ হলেই ঘোষণা হবে।’ সন্ত্রাস দমন আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার কথাও বলেন আসাদুজ্জামান খান।
নিষিদ্ধ করার পর জামায়াত-শিবির প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে কি না সেই প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা যদি কোনো কর্মকান্ড করতে চায় বা কিছু করতে চায়, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে এটাই তো স্বাভাবিক। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার পরে দেশে আবার অস্থিতিশীল অবস্থার তৈরি হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির তো এই অবস্থা তৈরি করেই ফেলেছে। এই অবস্থা তৈরির পেছনে তাদের যথেষ্ট যোগসাজশ রয়েছে। কোটা আন্দোলনের সব কিছু মেনে যাওয়ার পরেও এই আন্দোলন থামছে না, বরং একটি সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ছাত্ররা কোনো দিন ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ে লিপ্ত হতো না, যদি তারা এ ধরনের পরামর্শ না দিতেন।
তিনি বলেন, ‘তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে, এই যে এতগুলো মানুষ হতাহত হলো এটা কি শুধু পুলিশের গুলিতে হয়েছে? কার গুলিতে কতজন নিহত, কতজন আহত হয়েছে, আমরা সবই প্রকাশ করব। ছাত্রদের সামনে রেখে পেছন থেকে বিএনপি, জামায়াত, শিবির জঙ্গি সংগঠনগুলো সম্পৃক্ত হয়েছিল, এ থেকেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার অনেক দিনের চাহিদা ছিল। এখন সেটির প্রক্রিয়া চলছে।’
