ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া ইরানের রাজধানী তেহরানে এক হামলায় নিহত হয়েছেন। হামাস এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড গতকাল বুধবার আলাদা বিবৃতিতে হানিয়ার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মঙ্গলবার তেহরানে গিয়েছিলেন হানিয়া। সেখানে যে ভবনে তিনি অবস্থান করছিলেন, ওই ভবনে এক নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন হানিয়া। তার এই আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হলেও দেশটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি। তবে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছিল গতকাল।
হানিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে হামাস। তারা বলেছে, তেহরানে হানিয়ার বাসস্থানে জায়নবাদীদের বিশ্বাসঘাতক অভিযানে তিনি নিহত হয়েছেন। গোষ্ঠীটি বলেছে, ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের অভিষেক অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর বুধবার ভোররাতে (স্থানীয় সময়) হানিয়ার ওপর হামলার ঘটনাটি ঘটে।
আরব নিউজ জানিয়েছে, হামাসের এই ৬২ বছর বয়সী নেতা তেহরানে গিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বলেছে, সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং শিগগিরই তা প্রকাশ করা হবে।
হামাস পরিচালিত আল-আকসা টেলিভিশন জানিয়েছে, হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা মুসা আবু মারজুক হানিয়া হত্যার জবাব দেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন। এ হামলাকে তিনি কাপুরুষোচিত কাজ বলে বর্ণনা করেছেন।
বিবিসি জানিয়েছে, হানিয়ার মৃত্যু নিয়ে ইসরায়েল এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করে না।
কিন্তু‘ দেশটির কয়েকজন রাজনীতিক হানিয়ার মৃত্যু নিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে ইসরায়েলের উত্তরাধিকার বিষয়ক মন্ত্রী কট্টর ডানপন্থি’ অ্যামেচায় ইলিয়াহু অন্যতম। সামাজিক মাধ্যম এক্স এ তিনি লিখেছেন, হানিয়ার মৃত্যুতে বিশ্ব আরও ভালো স্থানে পরিণত হয়েছে।
এর আগে গত জুনে ইসমাইল হানিয়ার পারিবারিক বাসস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। সেই হামলায় তার বোনসহ অন্তত ১০ জন নিহত হন। তার আগে এপ্রিলে রোজার ঈদের দিন ইসরায়েলি বিমান হামলায় হানিয়ার তিন ছেলে এবং বেশ কয়েকজন নাতি-নাতনি নিহন হন। তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল ইসরায়েলি বিমান থেকে।
ইসমাইল হানিয়া ছিলেন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান। দায়িত্ব পালন করেছিলেন ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটির সূচনালগ্ন থেকেই এর সদস্য ছিলেন হানিয়া।
ইসমাইল হানিয়া ১৯৬৩ সালে গাজার আল-শাতি শরণার্থীশিবিরে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের ১৫ বছর আগে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ওই সময় হানিয়ার পরিবার গাজা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আশকেলন শহরে পালিয়ে যায়।
তরুণ বয়সে গাজা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের ছাত্র শাখার সদস্য ছিলেন ইসমাইল হানিয়া। ১৯৮৭ সালে হামাসের প্রতিষ্ঠালগ্নে সংগঠনটিতে যোগ দেন তিনি। ওই সময় ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে ইসলামিক আন্দোলন ইন্তিফাদার প্রথম ধাপ শুরু হয়, যা শেষ হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। প্রথম ইন্তিফাদার সময় হানিয়াকে বেশ কয়েকবার আটক করে কারাদণ্ড দেয় ইসরায়েল। পরে তাকে দক্ষিণ লেবাননে ছয় মাসের জন্য নির্বাসনের পাঠানো হয়।
২০০৩ সালে হানিয়া ও হামাসের প্রতিষ্ঠাতা এবং আদর্শিক নেতা শেখ আহমাদ ইয়াসিনকে একসঙ্গে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তারা যে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, সেখানে বোমা নিক্ষেপ করে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। যদিও সেখান থেকে তারা জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন। এর এক বছর পর ইয়াসিনকে হত্যা করা হয়।
২০১৭ সালে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান নির্বাচিত হন হানিয়া। তিনি খালিদ মিশালের স্থলাভিষিক্ত হন। অবশ্য এর আগে থেকেই তিনি বহুল পরিচিত মুখ ছিলেন। বিশেষ করে ২০০৬ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে তার নামডাক বাড়তে থাকে। ওই বছর সংসদ নির্বাচনে বেশির ভাগ আসন পেয়ে জয়ী হয় হামাস। ইসমাইল হানিয়াকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। কিš‘ খুব দ্রুতই মাহমুদ আব্বাসের দল ফাত্তাহর সঙ্গে হামাসের ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থাপনায় ফাটল ধরে। দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ চরমে ওঠে। সপ্তাহব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গাজায় ফাত্তাহর কার্যক্রম বন্ধ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে হানিয়াকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জবাবে ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্টের অনুগতদের সরিয়ে গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় হামাস। হামাসের প্রতিপক্ষসহ ফিলিস্তিনের বিভিন্ন রাজনৈতিক উপদলের প্রধানদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন হানিয়া।
এদিকে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস হামাস নেতা হানিয়ার হত্যাকাণ্ডকে কাপুরুষোচিত কাজ ও মারাত্মক উসকানি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। মাহমুদ আব্বাস ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান নিজেদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সম্মান, গৌরব, মর্যাদা রক্ষা করবে এবং সন্ত্রাসী হামলাকারীদের তাদের কাপুরুষোচিত কর্মকাণ্ডের জন্য পস্তানোর ব্যবস্থা করবে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক বিবৃতিতে হানিয়ার ওপর হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে বলেছেন, অপরাধী এবং সন্ত্রাসী ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী আমাদের অতিথিকে আমাদের বাড়িতে হত্যা করে আমাদের মর্মাহত করেছে। কিন্তু তারা একাজ করে নিজেদের জন্যও কঠোর সাজা পাওয়ার পট প্রস্তুত করেছে।
হামাস ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে বলেছে, মহান এই নেতাকে (হানিয়া) হারিয়ে হামাসে আমাদের প্রিয় ভাইরা যে বেদনা ভোগ করছে, শত্রুর প্রতি যে ক্রোধ অনুভব করছে, তার সঙ্গে আমরাও একাত্মতা প্রকাশ করছি। সেইসঙ্গে আমাদের আন্দোলনের নেতারা তাদের জনগণের নেতৃত্ব দেওয়া এবং মুজাহিদিনদের শহীদানের যে ত্যাগ স্বীকার করছেন তাতে গর্বও অনুভব করছি।
চীন ইসমাইল হানিয়া হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনের পরারাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই এবং দৃঢ়ভাবে এ হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করছি। গাজায় যত দ্রুত সম্ভব একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি অর্জিত হওয়া উচিত।
মালয়েশিয়া ইসমাইল হানিয়া হত্যার ঘটনার দ্রুত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা এবং এর জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। হত্যাকাণ্ড ঘিরে সত্য ঘটনাটি যতক্ষণ সামনে না আসছে ততক্ষণ পর্যন্ত সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বানও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কাতার অত্যন্ত কড়া ভাষায় হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে জঘন্য অপরাধ, বিপজ্জনক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরায়েলের বেপরোয়া আচরণ এ অঞ্চলকে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে এবং শান্তির সম্ভাবনা নস্যাৎ করবে।
রাশিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল বোগদানভ বলেছেন, এটি একটি রাজনৈতিক খুন। এমন খুন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই ঘটনা উত্তেজনা আরও বাড়াবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, হানিয়া হত্যা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো অভিপ্রায় নেই।
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সুপ্রিম রেভল্যুশনারি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আলি আল-হুতি বলেছেন, ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার নিশানা করা একটি জঘন্য সন্ত্রাসী অপরাধ এবং আইন ও আদর্শগত মূল্যবোধের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অবশ্য অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বলেছেন, এই ব্যক্তি (হানিয়া) গতবছর ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনার মূলে ছিল। সেই ঘটনা যার নিন্দা আমরা অনবরতই জানিয়ে এসেছি। আমরা অবিরাম মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বিপর্যয়ের অবসানে যুদ্ধবিরতির জন্যও বরাবরই কথা বলে এসেছি। আমরা এটাই নিশ্চিত করে বলতে চাই যে এখানে আমরা বাড়াবাড়ি কিছু দেখছি না। কারণ, ওইসব ঘটনার পরিণতি এমন গূঢ়ই হতে পারে।
