দীর্ঘদিন নানা সংকটে বিপর্যস্ত ব্যাংক খাত। ব্যাংকের নানান অনিয়ম, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণসহ নানা অনিয়মে তথ্য আড়াল করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। লুটপাটের তথ্য ঢাকতে দেওয়া হয় সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। শেখ হাসিনা সরকারের সময় গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের কার্যক্রম ছিল অনেক সমালোচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের নিয়ে একটি গ্রেডিং সূচক প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ফিন্যান্স ম্যাগাজিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ওই সূচকে পেয়েছিলেন ‘ডি’ গ্রেড।
২০২২ সালের ১২ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার যোগদান করেন। শেখ হাসিনার সরকারে নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন হলেন তিনি। গভর্নর হওয়ার আগে অর্থসচিব থাকাকালেই তিনি নানা নীতি প্রণয়ন, এস আলম, বেক্সিমকো, আবুল খায়ের, নাসাসহ অনেক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ সুবিধা দিয়েছেন। ওই সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অসুস্থ থাকায় পুরো অর্থ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বই চালাতেন তিনি। রউফ তালুকদার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকগুলোর অনিয়ম রোধে কিছু পদক্ষেপ নিলেও কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে আবার তিনি বেশ নমনীয় ছিলেন। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অনিয়ম রোধে তিনি ছিলেন নিষ্ক্রিয়। তাকে একক কর্তৃত্বে সহায়তা করেছিলেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এখন সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ভোল পাল্টাচ্ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। বিপাকে পড়ে তারা বলছেন, সরকার ও বিভিন্ন মহলের চাপে তারা কথা বলতে পারেননি। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্তারা।
মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কাজী সাইদুর রহমান। তিনিই আব্দুর রউফ তালুকদারের একক কর্তৃত্বের অন্যতম সহায়তাকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। মতবিনিময় সভায় সাইদুর রহমান বলেন, ‘মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়েছে। এর জন্য রক্ত দিতে হয়েছে। যুগে যুগে রক্ত দেওয়া হয় কিন্তু ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, এটা চরম সত্য। এখন ব্যাংকের যে খেলাপি ঋণ তৈরি হয়েছে, তা এক দিনে হয়নি। ধীরে ধীরে হয়েছে। আমরা এটাকে কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’
সরকার পতনের পর অফিস খোলার প্রথম দিন গতকাল কার্যালয়ে আসেননি গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। তবে সাংবাদিক প্রবেশে দীর্ঘদিন যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ প্রসঙ্গে কাজী সাইদুর রহমান বলেন, ‘গভর্নর মানসিক চাপের কারণে আজ (গতকাল) অফিস করছেন না, তিনি যার যার কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য বলেছেন। ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত সাংবাদিকদের সঙ্গে আগের মতোই আদান-প্রদান হবে। তাদের প্রবেশে বাধা থাকবে না। ছাত্র-জনতার এ বিজয়ে অন্যদের মতো আমরাও আনন্দিত। আমরা শহীদদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ ও অসুস্থদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।’
ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার বলেন, ‘আজকে সব জায়গায় যে উচ্ছ্বাস, এটা আমাদের ছাত্র-জনতার বিজয়। এ বিজয়টা সবাই চেয়েছিল। মানুষ আজ খুবই আনন্দিত। এখন যে সরকার আসবে আমরা আশা করছি সুন্দর বাংলাদেশ হবে। আমরা অনেক কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারতাম না।’
আব্দুর রউফ তালুকদারের কর্তৃত্বের কথা তুলে ধরে এ ডেপুটি গভর্নর বলেন, ‘অনেক কিছুই হজম করে নিতে হচ্ছিল। চাইলেও বলা যেত না। বললেই হয়তো কোনো রিঅ্যাকশন হবে। সাংবাদিকদের যে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ছিল সেটা একটা পরিস্থিতির কারণে ছিল। পরিস্থিতি বদলালে অনেক কিছুই ঠিক হয়।’
তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে আমাদের চেষ্টা ছিল কমানো বা আদায় করার কিন্তু অনেক কিছুই পারা যায় না। এনপিএল আদায়ের ব্যাপারে ১১ দফা রোডম্যাপ হয়েছিল, ব্যাংক খাতে সুশাসনের ব্যাপারে ছয় দফা রোডম্যাপ হয়েছে, অ্যাকশন প্ল্যান হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আইন করেছে ভালো একটা উদ্দেশ্য নিয়ে; কিন্তু অনেক সময় চাইলেও তা প্রয়োগ করা যেত না। এখন সময় এসেছে, আমরা আশাবাদী এ বিষয়গুলো আমরা প্রয়োগ করতে পারব। আমরা যদি এসব বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে অবশ্যই আমাদের অর্থনীতি ঘুরে যাবে।’
ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সততার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এমন একটা প্রতিষ্ঠান, যেখানে চাইলেই সৎ থাকা যায়। আমরা এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম, যা বলাও যায় না, সহ্য করাও যায় নাÑ এমন একটা অবস্থা। আশা করছি এখন আর সেই সমস্যা হবে না।’
