ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা লাপাত্তা, কর্মীরা বিপদে

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৪, ০৩:৫২ এএম

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার আগে-পরে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন দলটির বহু সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রী এবং অনেক শীর্ষ নেতা। একই তালিকায় রয়েছেন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারাও। তারা ঘোর বিপদের সময় নেতাকর্মীদের কোনো খোঁজখবর না নিয়েই নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। এই ছাত্রসংগঠনটির দেশে থাকা নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবন নিয়েই শঙ্কায় পড়েন, যাদের অনেকে এক কাপড়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হল কিংবা বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন। সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি শিক্ষা সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র। শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ত নেতাকর্মীরা রয়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপদে। এমন পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে দায়ী করছেন তারা।

জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট দেশ ছাড়েন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন। তারা একসঙ্গে সিলেট সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়েন বলে সংগঠনটির দায়িত্বশীল একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর দেশ ছাড়ার চেষ্টার সময় বিমানবন্দরে আটক হন ঢাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত। এই শীর্ষ চার নেতাই ঢাবির শিক্ষার্থী।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের প্রায় সবারই মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন তারা। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় এবং ঢাবি শাখার কয়েকজনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা গেছে। তারা বলেন, কোনো রকমে বেঁচে আছেন। কেউ কেউ ঢাকার বিভিন্ন মেসে পরিচয় গোপন করে থাকছেন, আবার কেউবা আত্মীয়স্বজনের বাসায় উঠেছেন। তবে তারা সবাই এক ধরনের ঘরবন্দি। বাসা থেকে বের হওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন তারা।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সবকিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়, হল কোথাও যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। অনেকের বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট, পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সবই হলে রয়ে গেছে। যাদের ছাত্রত্ব আছে, তারা শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবেন কি না তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। এই নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক উসকানিমূলক বক্তব্য না দিলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়ে এসে হামলা না করলে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হতো না।

ছাত্রলীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৬ জুলাই নেতাকর্মীরা হলছাড়া হওয়ার পরই সংগঠনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ১৫ আগস্ট ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের এনে হামলার পক্ষে ছিলেন না অনেকেই। এরপর থেকে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। নেতাকর্মীদের কোনো নির্দেশনাও দেননি শীর্ষ নেতারা। রাগে-ক্ষোভে অনেকে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অনেক নেতা তাদের মেসেঞ্জার গ্রুপ থেকে বের হয়ে গেছেন।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের একদম পথে ফেলে চলে গেছেন শীর্ষ নেতারা। কোনো ধরনের খোঁজখবর নেননি তারা। এখন পালিয়ে কোনো রকম বেঁচে আছি। পরিবারের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ নেই। আর মা-বাবার কাছে যেতে পারি কি না তাও জানি না। একেবারে ঘরবন্দি অবস্থায় আছি। চা খেতেও বের হই না। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও সমস্যা ছিল না, কিন্তু আমাদের যে নির্মমভাবে ব্যবহার করল, সেই কথাটা এখন কে বলবে? সম্মান নিয়েও বিদায় নেওয়া যেত, সময় থাকতে অনেক কিছু করা যেত। ওবায়দুল কাদেরের উসকানিমূলক বক্তব্য আমাদের জন্য কাল হলো।’

আরেক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হল থেকে এক কাপড়ে বের হয়েছি। ভাবছিলাম আবার যেতে পারব। কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না। সার্টিফিকেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সব কাগজপত্র হলেই রয়ে গেছে, সেগুলো আর পাই কি না জানি না। জীবনের সবকিছু হারালাম। এখন কীভাবে বেঁচে থাকব, সেই চিন্তায় আছি। ভাবছি কোনো রকম দেশের বাইরে চলে যেতে পারি কি না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, ‘তিন-চার বছর ধরে ছাত্রলীগ নেতাদের পেছনে সময় দিয়েছি। পড়াশোনা বাদ দিয়ে তাদের নির্দেশনা মেনে কাজ করেছি। ঢাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত ঝামেলা করেছেন, যার ফল আমাদের এখন ভোগ করতে হবে। ক্যাম্পাসে যাওয়ার মতো আর কোনো পরিস্থিতি নেই।’

এদিকে যারা হল ও ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং শিক্ষার্থী নির্যাতনের মতো ঘটনায় জড়িত, তারা আছেন সবচেয়ে বেশি বিপদে। তাদের হলে কোনোভাবেই ফিরতে দেবেন না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ইতিমধ্যে তাদের রুমগুলো দখলে নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তছনছ করে দেওয়া হয়েছে জিনিসপত্র। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে ভার্চুয়াল গেস্টরুম নিয়েই তাদের মানসিক নির্যাতন করেছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করেছেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাদের জন্য অনেকের শিক্ষাজীবন জীবন নষ্ট হয়েছে। গণরুম, গেস্টরুম সংস্কৃতি দিয়ে সীমাহীন নির্যাতন করা হয়েছে। এ ধরনের নির্যাতকদের হল, বিভাগÑ সবকিছু থেকে বয়কট করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের জন্য আমাকে হল ছাড়তে হয়েছে, হল ছেড়েও তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাইনি। শুধু আমি নয় শত শত শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেছেন তারা। এখন সেসব পাপের ফল তাদের ভোগ করতে হবে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাদের নেতাকর্মী ছাড়া আর কাউকেই মানুষ মনে করত না। ভিন্নমতাবলম্বী হলেই নির্যাতন চালাত। আর শিবিরসহ বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে অত্যাচার করা হতো। তারা হয়তো ভাবতে পারেননি ক্ষমতা একদিন শেষ হবে। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আর কোনো নির্যাতকদের চান না, কোনো নির্যাতক তৈরি হোক সেটাও চান না।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘লেজুড়বৃত্তিক ও অপরাজনীতি করার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। শুধু ছাত্রলীগের বেলায় নয়, এর আগেও ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে যেতে হয় ছাত্রনেতাদের। এমন অনেকের শিক্ষাজীবন বিপন্ন হয়ে গেছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছাত্ররাজনীতি হবে ছাত্রদের জন্য, তা না হলে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন কী? এ ধরনের অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত