অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেওয়ার পর গতকাল রবিবার সচিবালয়ে প্রথম অফিস শুরু করেছেন উপদেষ্টারা। সকাল ১০টার মধ্যেই প্রায় সব উপদেষ্টা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান। এ সময় কর্মকর্তারা তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।
এরপর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে উপদেষ্টারা শুনেছেন ‘পদবঞ্চিতদের’ কথা। তারা কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও।
অন্যদিকে সচিবালয়ের ভেতরে বিক্ষোভ করেছেন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রশাসনে নানাভাবে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ ব্যক্তিরা।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় গত সোমবার (৫ আগস্ট)। এরপর তিন দিন দেশে সরকার ছিল না। বৃহস্পতিবার অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। শুক্র ও শনিবার ছুটির পর গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সবার চোখ ছিল সচিবালয়ের দিকে।
গতকাল অফিস শুরুর প্রথম দিন মতবিনিময় সভায় কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন উপদেষ্টার কাছে নিজেদের বঞ্চনার কথা শোনান। এ সময় তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে যারা বিক্ষোভ করেছেন তাদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগ আমলে চাকরিচ্যুত, ‘পদবঞ্চিত’ ও সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ পেয়েও চাকরি না পাওয়া ব্যক্তিরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রার দিন ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই গতকাল অফিস করেননি। আবার অনেকে অফিস করলেও দাপ্তরিক কাজ খুব একটা হয়নি। সবার ভেতর একধরনের অস্থিরতা। সবাই স্বাভাবিক পরিস্থিতির অপেক্ষায়।
আগের দিন শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রথম অফিস শুরু করেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান।
দ্রুত গভর্নর-বিএসইসি চেয়ারম্যান নিয়োগ : দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।
এটিএম বুথে টাকা পাওয়া যাচ্ছে না সাংবাদিকরা এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘টাকা নেই বিষয়টি কিন্তু তা নয়। এটা করা হয়েছে রিসেন্টলি সিচুয়েশনটা খুবই ইয়ে ছিল, টাকা নিয়ে চলে যাবে। এটিএম বুথে তো ঝামেলা নেই।’
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে কী বার্তা দিলেন? সাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের বলেছি, আপনারা নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের জন্য ইতিবাচক কাজ করবেন। কোনো কিছু ফেলে রাখবেন না, বাস্তবায়ন করবেন। আর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি রাখতে হবে।’
এ সময় কর্মকর্তাদের অর্থের অপচয় রোধ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। এ ছাড়া চ্যালেঞ্জ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জীবন-জীবিকা সচল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কথা বলেন তিনি।
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন : স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের নানা ভুলের কারণে মানুষের হয়রানি হচ্ছে জানিয়ে উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফ বলেন, ভুলগুলো যতটা কমানো যায়, তা করা হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের এক হাজারের বেশি মামলা রয়েছে হাইকোর্টে। মনে হয় সপ্তাহখানেক আগেও একটা মামলা হয়েছে। প্র্যাকটিকালি যে কাজকর্মগুলো হচ্ছে, কী কারণে এই মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে হচ্ছে। যে ভুলগুলো হচ্ছে যাতে মানুষ হয়রানি হয়ে কোর্টে আসতে হয়, সেটা যতটা মিনিমাইজ করা যায়।
কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কাজের ধরন কী, সেটা বুঝতে হবে। এখনই বলা যাবে না, কোন কাজটা অগ্রাধিকার পাবে, কোনটা পাবে না। আগে বুঝি তারপর অগ্রাধিকার দেব। পুরো সরকারটাই একটা চ্যালেঞ্জ। দেশের চলমান অবস্থাই চ্যালেঞ্জের।
দূষণ রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপনের ঘোষণা রিজওয়ানার : আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের দিনই বিভিন্ন ধরনের দূষণ রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে বলে জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অধিকতর জনবান্ধব মন্ত্রণালয়ে পরিণত করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে নিয়মিত জাতীয় পরিবেশ কমিটির সভা আহ্বানের পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত নিয়মিত ওয়েবসাইটে হালনাগাদ করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে গতিশীলতা বৃদ্ধিতে ‘মোটিভেশনাল’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
অগ্রাধিকার কাজের বিষয়ে ধারণা দিয়ে উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘ম্যান্ডেটেড’ কর্মকাণ্ড চলমান রেখে বর্তমান জনপ্রত্যাশার আলোকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।
পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার রোধ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, গাড়ির হর্নজনিত শব্দদূষণ বন্ধ, নদীদূষণ রোধে উদ্যোগ গ্রহণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের উন্নয়ন, পাহাড় রক্ষা, বন সংরক্ষণ, জলাশয় ভরাট রোধ, উচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন ইত্যাদি কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে বলেন তিনি।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে ইন্টারনেট বন্ধে তদন্ত : কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় দেশ জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, তা জানতে চান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। এজন্য ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছেন তিনি। এ সময়ের মধ্যে তার কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মুশফিকুর রহমানকে নির্দেশ দেন।
তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে উঠে আসে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়টি। এ সময় তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ করা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আন্দোলনের সময় মানবাধিকার ক্ষুণ হয়েছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গত ১৭ জুলাই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট ও ১৮ জুলাই রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় শেখ হাসিনা সরকার। পাঁচ দিনের মাথায় ২৩ জুলাই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত পরিসরে চালু করা হয় এবং ১০ দিন পর ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়। এরপর ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন ঘিরে আবারও সরকারের নির্দেশে মোবাইল অপারেটররা দেশ জুড়ে ফোর-জি নেটওয়ার্ক সেবা বন্ধ করে দেয়।
বৈঠকে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, কার নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়, তা বের করতে হবে। মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির কোন কোন কর্মকর্তা অতি উৎসাহী হয়ে ইন্টারনেট বন্ধে সহযোগিতা করেছেন, তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে। তদন্ত করতে ২৪ ঘণ্টা সময় দেন তিনি।
উপদেষ্টার নির্দেশের পরপরই ইন্টারনেট বন্ধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (টেলিকম) একেএম আমিরুল ইসলামকে কমিটির প্রধান করা হয়।
বৈঠকে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, দেশে ইন্টারনেট প্যাকেজের দাম অনেক বেশি। তিনি ইন্টারনেট প্যাকেজের দাম কমাতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, দেশের কোথাও কোথাও এখনো মোবাইল নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক হয়নি। মোবাইল নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক করারও নির্দেশ দেন তিনি।
অস্বচ্ছতা দূর করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা : কর্মক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা দূর করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা জানালেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য তিনি প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কথাও জানান।
শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ‘আমাকে যে বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা আমি মাথায় রাখব। সেই পলিসিটাই আমি মাথায় রাখব। আমাদের মন্ত্রণালয়কে চেষ্টা করব বোঝাবার, চেষ্টা করব শোধরাবার, পরিবর্তন করার। একটা বিষয় হচ্ছে যে অস্বচ্ছতা যেখানে আছে, সেটা আমরা দূর করব, ই-স্টেকহোল্ডারদের আমরা অংশীদার করব, যাতে স্বচ্ছতা তৈরি হয় এবং অ্যাকাউন্টিবিলিটি আমরা নিশ্চিত করব। সেখানে কী পলিসি মেকানিজম আছে, আমি এটা বুঝব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুর্নীতির যে জায়গাটা দূর করব, ব্যক্তিপর্যায়ে স্টাফদের ইন্টিগ্রিটি, সেটা আমরা নিশ্চিত করব। আর একটা বড় জায়গা আমার জন্য হচ্ছে এই যে একটা মাস এই বাচ্চারা এভাবে লড়ল, তারা নিজেরাই কিন্তু দুর্বল পরিবারের সন্তান। দুর্বল পরিবারের অবহেলিত। আবার আমি দুর্বল পরিবার বলে ফেললাম, এটা আমি বলতে চাই না। ওরা আমাদের বীর সন্তান। ওদের মতো সাহসী আর কেউ নেই দেশে। আমরা যে পরিবর্তনগুলো আনব তার একটি হবে তরুণদের কেন্দ্র করে। বড় পরিকল্পনা নেওয়ার আমার ইচ্ছা আছে। তাদের মন্ত্রণালয়ে আমাদের সঙ্গে কাজ করা একটা সুযোগ আমি দেব।’
ইলিশ আগে পাবে দেশের মানুষ, পরে রপ্তানি : স্বল্প আয়ের মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়া ইলিশ মাছের দাম নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। গতকাল সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে যোগ দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে তারপর ইলিশ মাছ বিদেশে রপ্তানি করা হবে।
‘সিন্ডিকেট চাঁদাবাজির’ কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় জানিয়ে ফরিদা আখতার বলেছেন, ‘এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সেই সঙ্গে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ালে দাম কমে আসবে। এজন্য সরবরাহ বাড়াতে হবে।’
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা বিবেচনায় খাদ্যপণ্য ভেজালমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন উপদেষ্টা।
দুধ, ডিমের মতো পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করতে হবে। পারব কি না, সেটা পরের কথা। কিন্তু আমার দায়িত্ব হলো দাম কমানো। এখানে অনেক সিন্ডিকেট আছে অনেক লেভেলে। যেমন একটি জায়গায় শুনেছি যে চাঁদাবাজির কারণে দাম বেড়ে যায়। সরবরাহের ক্ষেত্রে যেখানে উৎপাদন হচ্ছে, সেখান থেকে বাজার পর্যন্ত আসতে গিয়ে অনেক জায়গায় পয়সা দিতে হয়, যেটা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। সেসব জায়গায় একটা মন্ত্রণালয় একা কাজ করতে পারবে না। এটা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় সবাই মিলে করতে হবে।’
