ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের দৃশ্যপটে ঘটে চলেছে আমূল পরিবর্তন। প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে পদত্যাগ এবং স্বেচ্ছায় বা বাধ্যতামূলক অবসরের নানা ঘটনা। ব্যতিক্রম শুধু দেশের দুই শীর্ষ ক্রীড়া সংস্থা বিসিবি ও বাফুফে। আইসিসি ও ফিফার সরাসরি নীতিমালার কারণে এই দুই সংস্থায় হাত দেওয়ার অধিকার নেই তৃতীয় কোনো পক্ষের, এমনকি রাষ্ট্রের। এমনটা হলে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিয়ম মেনে এ দুই সংস্থায় পরিবর্তনের কী কোনো সুযোগ রয়েছে! সেই তত্ত্ব উদঘাটনের চেষ্টাই করেছেন।
আগামী ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনী কংগ্রেসের তারিখ আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। সালাউদ্দিনবিরোধীরা অবশ্য সেই পর্যন্ত তাকে বাফুফের চেয়ারে দেখতে চাইছেন না। একদল সমর্থক নিয়মিত কর্মসূচি দিয়ে পদত্যাগ দাবি জানাচ্ছেন। আবার বাফুফের বাইরে থাকা বঞ্চিত সাবেক ফুটবলার, সংগঠকরা ফিফার গাইডলাইন মেনে আগেভাগে সালাউদ্দিনকে সরানো যায় কি না, সেই পথ খোঁজার আহ্বান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে জানাচ্ছেন। তবে কোনো হুমকিতেই টলছেন না সালাউদ্দিন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো হুমকির মুখে তিনি পদত্যাগ করবেন না। শুধু তা-ই নয়, আগামী নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন শেখ হাসিনা সরকারের ভীষণ আস্থাভাজন এই সাবেক ফুটবলার। তাহলে আগেভাগে সালাউদ্দিন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কী? আবার তিনি আগেভাগে সরে গেলে বাফুফের ভবিষ্যৎই-বা কী হবে?
ফিফা-এএফসির গাইডলাইন অনুযায়ী, একটি দেশে মূলত দুটি পক্ষ মিলে ফুটবল পরিচালনা করে। প্রথমপক্ষ ফিফা, দ্বিতীয়পক্ষ তার সদস্যদেশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়পক্ষ বাফুফে। এই দুই পক্ষের বাইরে সরকারসহ বাকি সবাই তৃতীয়পক্ষ। বাফুফেকে যেহেতু সরকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে কাজ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপটা সরকারেরই দিক থেকেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে এর বাইরেও ফিফা অনেক কিছুকেই তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ হিসেবে মেনে নেয়। যেমন সমর্থকদের আন্দোলনে বাফুফের কোনো সদস্যকে সরে যেতে হলে কিংবা স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন ঘটলে, সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক সংবাদে কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হলেও ফিফা সেগুলোকে তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ হিসেবে ধরে নিতে পারে।
এখন সালাউদ্দিন যদি পদত্যাগ করেন এবং পদত্যাগের কারণ হিসেবে সমর্থকসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা রকম চাপকে দায়ী করেন, এর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ ফিফার কাছে দেখাতে পারেন, তবে ফিফা চাইলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে ফিফা সাধারণত দুটি সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমত, সরকারি কিংবা কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ হলে তারা নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দিয়ে একটি স্বাধীন নরমালাইজেশন (স্বাভাবিকীকরণ) কমিটি গঠন করে। যে কমিটিতে বিভিন্ন অঙ্গনের বিশেষজ্ঞদের রাখা হয়। এই কমিটির সদস্য হতে হলে ফিফার কাছে অভিজ্ঞতার পরীক্ষাও দিতে হয়। এই কমিটির কাজ হলো সরকার কিংবা তৃতীয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সমাধানের পথ বের করা এবং নির্বাচনের সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা। আর যদি এই কমিটিও তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন ফিফা সেই দেশকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে। নিকট অতীতে যেটা ঘটেছে পাকিস্তান, মালদ্বীপ, কুয়েত, ইরান ও ইরাকের ক্ষেত্রে।
আর নিষিদ্ধ হওয়ার মানেই ফিফা-এএফসির সব বরাদ্দ স্থগিত হয়ে যাওয়া, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো আসরে খেলার সুযোগ হারানো। সর্বোপরি নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দেশের ফুটবলে চরম বিপর্যয় নেমে আসা; অর্থাৎ সালাউদ্দিন যদি চাপের মুখে পদত্যাগ করেন এবং ফিফার কাছে যদি প্রমাণ দিতে পারেন যে তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদচ্যুত করা হয়েছে, তবে দেশের ফুটবলে নেমে আসতে পারে ভয়ংকর পরিণতি। ফিফা নরমালাইজেশন কমিটি না করে সরাসরি অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করতে পারে বাংলাদেশকে। সে ক্ষেত্রে ২৬ অক্টোবর নির্বাচনও পড়বে অনিশ্চয়তায়।
এটা গেল তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপের পরিণতি। আর যদি কাজী সালাউদ্দিন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, তবে করণীয়টা লেখা রয়েছে বাফুফের গঠনতন্ত্রের ৩৬ নম্বর ধারায়। এই ধারায় সভাপতির দায়িত্বগুলো লিপিবদ্ধ থাকার পাশাপাশি সভাপতি যদি অনুপস্থিত থাকেন বা পদ শূন্য হয়, তবে কী করতে হবে, সেটিও উল্লেখ রয়েছে। ধরা যাক, সালাউদ্দিন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন, তবে বাফুফের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র সহসভাপতির (সালাম মুর্শেদী) দায়িত্ব নেওয়ার কথা। কিন্তু এই সিনিয়র সহসভাপতি সালাম মুর্শেদী হাসিনা সরকার পতনের দুদিন পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তো এই মুহূর্তে সালাউদ্দিন যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, তবে সালাম না থাকায় নিয়ম অনুযায়ী বাফুফে সভাপতির দায়িত্ব চলে আসবে সহসভাপতি বিগত নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পাওয়া ইমরুল হাসানের ওপর। এ ছাড়া ফিফার গাইডলাইনে আছে, শূন্য পদে নির্বাচন করতে হলে পরবর্তী সাধারণ সভা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু বাফুফের পরবর্তী সাধারণ সভা হবে নির্বাচনী সভা, সেহেতু অন্যান্য পদে আগাম নির্বাচনের সুযোগ নেই।
ফিফার কোনোভাবেই তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ সমর্থন করেন না বলেই এ মুহূর্তে ফুটবল সমর্থক, সাবেক ফুটবলার-সংগঠকদের সালাউদ্দিনের পদত্যাগের দাবি জানানোর চেয়ে অপেক্ষা করাই হবে শ্রেয়। সেটা না করে উল্টোটা করলে লাভটা হবে সালাউদ্দিনেরই।
বিসিবিতে পরিবর্তন কোন পথে : ক্রিকেট প্রশাসনে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের সর্বশেষ ঘটনা ২০২৩ সালের। সে সময় শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডকে নিষিদ্ধ করেছিল আইসিসি। নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৪ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের আয়োজক স্বত্ব হারায় শ্রীলঙ্কা। অক্টোবরে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক বাংলাদেশ। এই মুহূর্তে বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্যদের ওপর সরাকরের যেকোনো হস্তক্ষেপে সেই বিশ্বকাপের আয়োজক স্বত্ব হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে, সেই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্ধ হয়ে যেতে পারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজাও।
এমন অবস্থায় বিসিবির সভাপতির পদে থাকা সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন এবং তার কৃতকর্মের দোসর দুর্নীতিবাজ বিসিবি পরিচালকদের বিসিবির গঠনতন্ত্র মেনেই বিতাড়ন করা সম্ভব এবং এতে আইসিসির নিষেধাজ্ঞার খড়গও নেমে আসার আশঙ্কা নেই বলে মনে করেন বিসিবির সাবেক পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোনীত এই বিসিবি কাউন্সিলর দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, তলবি সভা ডেকে বিসিবির গঠনতন্ত্রের ২৭ অনুচ্ছেদের ‘গ’ ধারার মাধ্যমে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পর্ষদ গঠন করা সম্ভব।
বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, একজন পরিচালক যদি মৃত্যুবরণ করেন, মানসিক ভারসাম্য হারান (এর পক্ষে চিকিৎসকের সনদ থাকতে হবে) কিংবা শৃঙ্খলাজনিত শাস্তি পান, তাহলেই তার পদ শূন্য হতে পারে। না হলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্তির আগেই কোনো পরিচালক অব্যাহতি নিতে পারেন। এই সব নিয়ম ছাড়াও কোনো পরিচালক যদি পরপর ৩টি পরিচালনা পরিষদের সভায় শারীরিক অসুস্থতা, বিদেশ গমন এবং যথাযথ কারণ ব্যতিরেকে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে তার পরিচালকের পদের অবসান হবে। তবে এই নিয়ম কার্যকর হতে হলে সময় লাগবে কমপক্ষে ৮ মাস।
এই পন্থার বাইরে আরেকটি উপায়ে নাজমুল হাসানকে অপসারণ সম্ভব। বিসিবির গঠনতন্ত্রের ১২.৩ ধারায় বলা আছে, ‘সাধারণ পরিষদের মোট সদস্যের এক-তৃতীয়াংশের লিখিত অনুরোধে সভাপতি ১৫ দিনের মধ্যে তলবি সভা আহ্বান করিবেন। সভাপতি তা না করিলে নোটিস প্রদানকারী সদস্যদের ন্যূনতম দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতিতে সভায় যেকোনো সদস্যকে সভা আহ্বানের কর্র্তৃত্ব প্রদান করা যাইবে। এরূপ ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য নোটিস জারির মাধ্যমে তলবি সভা আহ্বান করিবেন।’ সিরাজউদ্দিন আলমগীর মনে করেন, তলবি সভা ডেকে ২৭ অনুচ্ছেদের ধারা ‘গ’ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব, ‘পরিচালনা পরিষদের ব্যাখ্যায় কেউ সন্তুষ্ট না হলে সাধারণ পরিষদে আবেদন জানাইতে পারবে। তবে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের পূর্ব পর্যন্ত পরিচালনা পরিষদের ব্যাখ্যাই কার্যকর থাকবে। গঠনতন্ত্রের কোন ধারা-উপধারার ব্যাপারে সাধারণ পরিষদের প্রদত্ত ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।’
আলমগীর জানান, ‘সাধারণ পরিষদই হচ্ছে সংস্থার সর্বোচ্চ জায়গা, তারাই পারে সংবিধান পরিবর্তন করতে। ধরে নেওয়া যাক, আপনি তলবি সভা ডেকে সংবিধানের ব্যাখ্যা দেবেন। কোথায় এই সুযোগ আছে? গঠনতন্ত্রের ২৭-এর গ-তে আছে, “পরিচালনা পরিষদের ব্যাখ্যায় কেউ সন্তুষ্ট না হলে সাধারণ পরিষদে আবেদন জানাইতে পারবে। তবে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের পূর্ব পর্যন্ত পরিচালনা পরিষদের প্রদত্ত ব্যাখ্যাই কার্যকর থাকবে। গঠনতন্ত্রের কোন ধারা-উপধারার ব্যাপারে সাধারণ পরিষদের প্রদত্ত ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।” অর্থাৎ আমি যদি সব কাউন্সিলরকে ডাকি এবং ডেকে বলি যে সংবিধানের এই ক্রাইসিস মোমেন্টে একটা ইন্টেরিম বোর্ড গঠন না করলে বোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাধারণ সদস্যদের দিয়ে গঠনতন্ত্রের এই ধারা সংশোধন করি, তাহলে শতভাগ বৈধভাবে এই বোর্ডকে সরানো সম্ভব। এখানে বিসিবি সভাপতিকে লাগবে না, সিইওকেও লাগবে না। এরপর যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, বোর্ড ভেঙে দেওয়া হোক কিংবা অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন হোক। শুধু এই সভাকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অনুমোদন দিলেই হবে।’
