সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের স্বপ্ন নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসাইন জিহাদ। অধিকার আদায়ের এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীসহ কয়েকশ মানুষকে জীবন দিতে হয়, এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ ও সংঘর্ষে মারাত্মক আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে, দায়িত্ব নিয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার, তবে এখনো যন্ত্রণার দিন শেষ হয়নি হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের। গুলিবিদ্ধ ও সংঘর্ষে যারা আহত হয়েছেন, তাদের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় কাটছে একেকটা দিন, যে তালিকায় রয়েছে জিহাদের নামও।
আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর থেকে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে জিহাদকে। হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা যেমন পাননি, তেমনি অস্ত্রোপচার শেষে সুস্থ না হতেই গ্রেপ্তার আতঙ্কে হাসপাতাল ছাড়তে হয় তাকে। রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকার অজুহাতে তার অস্ত্রোপচার করা হয়নি, নগরীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ঘুরে ঘুরেও গুলিবিদ্ধ হওয়ায় চিকিৎসা পাননি তিনি। একপর্যায়ে পুলিশের ভয়ে গ্রেপ্তার এড়াতে দুর্গম চরে আত্মগোপন করতে হয়েছে তাকে। এই দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার কঠিন সময়ে তার শিক্ষক বাবার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
রংপুরে পুলিশের গুলিতে আহত হন ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসাইন জিহাদ। তিনি বর্তমানে রাজধানীর কল্যাণপুরে বেসরকারি ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গতকাল বুধবার যখন এ প্রতিবেদন লেখা হচ্ছিল, তখনো জিহাদের একটা অস্ত্রোপচার চলছিল।
কোটা আন্দোলনের শুরু থেকে জিহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভ স্লোগানে সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই গত ১৬ জুলাই অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। সেদিন রাতে শিক্ষার্থীদের খুঁজতে বাসায় বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। ফলে রাতেই ঢাকা থেকে একটি বাসে রংপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান জিহাদ। তার বাসা রংপুর শহরের বাহারকাছনা এলাকায়। তবে রংপুরে গেলেও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় রংপুর শহর তখন উত্তাল।
উত্তাল সেই সময়ে বড় বোন শামীমা সুলতানাকে সঙ্গে নিয়ে রংপুরের আন্দোলনে ১৮ জুলাই থেকে যুক্ত হন জিহাদ। সেদিন রংপুরে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্র-জনতার ব্যাপক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেদিন পুলিশের টিয়ার শেলে মিছিলেই কিছুটা অসুস্থ হন জিহাদ। সেখান থেকে বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে বাসায় নিয়ে যান। পরদিন পরিবারের সদস্যদের আপত্তি উপেক্ষা করে আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন রংপুর শহরের পৌরবাজার এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের একটি গুলি এসে লাগে জিহাদের পায়ে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে রমেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভাইয়ের গুলি খাওয়ার খবর শুনে বাসা থেকে উন্মাদের মতো রমেক হাসপাতালে ছুটে যান বড় বোন শামীমা সুলতানা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিহাদের জন্মের পর আমার কী যে খুশি লাগছিল। চোখের সামনে দিয়ে দিনে দিনে বড় হয় জিহাদ। সেই ভাইটা যখন গুলি খায় তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হয়েছিল। উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে আমি হাসপাতালে উপস্থিত হই। সেখানে গিয়ে দেখি ফ্লোরে জিহাদকে রাখা হয়েছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তার সঙ্গে কথা বলার যেন কোনোভাবেই জ্ঞান না হারায়। তখন আমি শুধু একটা প্রশ্নই করে যাচ্ছিলাম, ডাক্তার আমার ভাইটা কি বাঁচবে?’
১৯ তারিখ রাতেই জিহাদের একটি অস্ত্রোপচার হয় রমেকে। অস্ত্রোপচার শেষে তাকে যখন ওয়ার্ডে ফেরানো হয় তখন তার এক হাত দিয়ে স্যালাইন ও অন্য হাত দিয়ে রক্ত দেওয়া চলছিল। তাকে ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ামাত্র নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে পড়ে জিহাদের পরিবার। জিহাদের মাদ্রাসাশিক্ষক বাবার কাছে খবর যায়, হাসপাতালে রাতে গ্রেপ্তার অভিযান চালাবে পুলিশ। ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাৎক্ষণিক তাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে যান। সারারাত জিহাদ ব্যথায় কাতরাচ্ছিল, তার পা ফুলে যায়। ফলে সকালেই তাকে আবারও হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় পরিবার। সেখানে এক্স-রেতে ধরা পড়ে গুলি বের করা হলেও জিহাদের পায়ে একটা প্লেট রয়ে যায় (গুলির খোসার মতো অংশ)। ফলে তার পুনরায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় চিকিৎসক না থাকায় দুদিন অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকবে।
এর পরের ঘটনার বর্ণনা দেন বোন শামীমা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও যখন রমেকে অপারেশন করানো সম্ভব হচ্ছিল না, তখন আমরা সারা দিন রংপুরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ছোটাছুটি করি। কিন্তু গুলিবিদ্ধ রোগীকে তারা চিকিৎসা দিতে অপারগতার কথা জানায়। সব হাসপাতাল আমাদের ফিরিয়ে দেয়। আমি শুধু অঝোরে কেঁদে যাচ্ছিলাম। নানা ভয় আশঙ্কা মাথায় ভর করে, জিহাদের পা কেটে ফেলতে হয় কি না, তাকে বাঁচানো যাবে কি না। তাকে রমেকেই ভর্তি রাখতে বাধ্য হই।’
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ফের পুলিশের এক সোর্স তাদের খবর দেন যে, জিহাদকে যেন রংপুরের বাইরে নিয়ে যাই, তা না হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এমন তথ্য জানিয়ে শামীমা সুলতানা বলেন, ‘পুলিশের ওই সোর্স বলে শিবিরকর্মী হিসেবে জিহাদের নাম তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। ভয় ও আতঙ্কে বাড়িতে থাকা সব ইসলামি বই আমরা পুড়িয়ে ফেলি। যেহেতু তার (জিহাদ) মুখে দাড়ি ছিল তাই গুলিবিদ্ধ ছোট ভাইকে হাসপাতালেই ফোম ও রেজার দিয়ে আমি নিজ হাতে ক্লিনসেভ করে দিই, যাতে শিবির বলে ধরে নিয়ে না যায়। এভাবেই এক সপ্তাহ কেটে যায়। এরপর ২৬ জুলাই শুক্রবার আমাদের কাছে খবর আসে হাসপাতালে তাকে গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দা পুলিশ যাবে। ৩০ মিনিটের মধ্যে যেন তাকে নিয়ে রংপুরের বাইরে কোথাও চলে যাই। বাধ্য হয়ে চরাঞ্চলে থাকা এক আত্মীয়ের বাসায় জিহাদকে আত্মগোপনে নিয়ে যেতে হই।’
শামীমা সুলতানার অভিযোগ, ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় তার শিক্ষক বাবা শাহাদাত হোসাইনকে মোবাইল ফোনে কল করে ডেকে নিয়ে ভয় দেখান এক পুলিশ সদস্য। এমন পরিস্থিতিতে ওই পুলিশ সদস্যকে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয় যাতে তিনি পুলিশের হাত থেকে জিহাদকে রক্ষা করেন। এরপর ওই পুলিশ সদস্য পরামর্শ দেন, জিহাদের কাছে যেন মোবাইল ফোন রাখা না হয়, তাকে যেন আত্মগোপনে রাখা হয়। এভাবেই সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত জিহাদকে আত্মগোপনেই রাখতে হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সরকারের বিদায়ের পর আবারও জিহাদকে রমেক হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হিসেবে তাকে তালিকাভুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়। তারা মনে করেছিলেন যেহেতু শিক্ষার্থীদের পক্ষের সরকার গঠন হয়েছে, তাই ভালো চিকিৎসা দেওয়া হবে। কিন্তু কর্তব্যরত মৃদুল নামে এক চিকিৎসক তাদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন।
পরে গত ১০ আগস্ট জিহাদকে ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেন পরিবারের সদস্যরা। ইতিমধ্যে জিহাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাদের প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার থেকে তারা চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো সহযোগিতা পাননি। বোন শামীমা বলেন, জিহাদের স্কুল থেকে শিক্ষকরা কিছুটা সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়া ঢাকায় নিয়ে আসার পর তার বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো সহযোগিতা পাননি।
