শাহবাগে সম্প্রীতি সমাবেশ

ছাত্র-জনতা হত্যায় কমিশন গঠনের প্রস্তাব

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৪, ০৩:২০ এএম

গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচারে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও আহত করায় শেখ হাসিনা ও এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারে কমিশন গঠনের প্রস্তাব জানিয়েছেন ছাত্র ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। গতকাল বুধবার রাজধানীর শাহবাগে ‘একতার বাংলাদেশ’ নামক একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের উদ্যোগে সম্প্রতি সমাবেশ থেকে এ প্রস্তাব করা হয়। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সব ধর্ম ও ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা একাত্মতা পোষণ করে বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে সবাই ঐকমত্য পোষণ করেন। 

কমিশন গঠনের বিষয়ে ছাত্র সংগঠক আলী আহসান জোনায়েদ বলেন, আমরা মরতে যখন শিখে গেছি কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আমার ভাই-বোনেরা এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার নিশ্চিতে কমিশন গঠন করতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার করতে হবে। আমাদের প্রধান কর্তব্য এখন সব ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করা, আহত ভাই-বোনদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, খুনি হাসিনা ভারতে পালালেও তার দোসররা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে মরিয়া হয়ে আছে। দেশব্যাপী আমরা পাহারা বসিয়েছি। সব ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করা হবে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শই হলো জাতি-ধর্ম-বর্ণকে সবাই মিলে ধারণ করা। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কেউ সংখ্যালঘু নয়। আমরা সবাই বাংলাদেশি।

সমাবেশে ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধি সীবগাতুল্লাহ বলেন, এই বাংলাদেশ সম্প্রীতির বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ একতার বাংলাদেশ। কোনো দল, সংগঠন বা ছাত্র এটা বলতে পারবে না যে আমি একাই এই দেশটাকে স্বাধীন করেছি। দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে দেশের সাধারণ মানুষ, প্রাইভেট, পাবলিক, ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা জীবন দিয়েছে। আমাদের ভাই আবু সাঈদ বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছেন। আমরা আবু সাঈদ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বলতে চাই, আগামীতে যদি কোনো ষড়যন্ত্র হয় তাহলে আমরা জীবন দিয়ে সে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করব।

জাগপা ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রহমান ফারুকী বলেন, শাহবাগকে ব্যবহার করে হাসিনা এদেশের আলেম সমাজকে নিশ্চিহ্ন করতে জুডিশিয়াল কিলিং চালিয়েছে। এই শাহবাগ থেকেই তোমার পতন ঘণ্টা বেজেছে। যারা এদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ভাঙতে যায়, তাদের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া হবে।

সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সাদিক কায়েম বলেন, আমরা হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বৌদ্ধ চাকমা মারমা ত্রিপুরা রাখাইনসহ সব সম্প্রদায়কে নিয়ে একতার বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমাদের বাংলাদেশ এমন হবে যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, যেখানে কোনো অতিরঞ্জন থাকবে না। যেখানে থাকবে সামাজিক সুবিচার, যেখানে থাকবে সাম্য, যেখানে থাকবে সব মানুষের অধিকার।

সমাবেশে ধর্ম ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাফি মো. মোস্তফা বলেন, ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত চার হাজারেরও বেশি মাইনোরিটির ওপরে আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে দুই-একটি হামলা ছাড়া কোনো সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার বিগত সরকার করেনি। আপনারা লক্ষ রাখবেন সংখ্যাটা চার হাজারেরও বেশি। আপনাদের মনে রাখতে হবে কারা এদেশে ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি প্রতিষ্ঠিত করে এদেশে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত করেছিল। শুধু রাজনৈতিকভাবেই ডিভাইড অ্যান্ড রুল প্রতিষ্ঠা করেনি সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরুদের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে এক ধরনের প্রচারণা চালিয়েছে। এই প্রচারণাকে আমাদের দমিয়ে দিতে হবে। আমি মনে করি, সংখ্যালঘুদের ওপরে আক্রমণ যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একতার বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক বৈষম্য থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভাইদের বলতে চাই, যেহেতু আমি মুসলিম, আমার কোনো মুসলিম ভাই যদি আপনার হাত, জিহ্বা দ্বারা অনিরাপদ হয় তাহলে আপনি মুসলিমের সীমারেখা থেকে বের হয়ে গেলেন। আমরা সবাই যেমন রক্ত দিয়ে এই বাংলাদেশ স্বাধীন করলাম তেমনি সবার রক্ত আমরা হেফাজত করব ইনশাআল্লাহ।

এদিকে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ফায়াজসহ সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি ও মোমবাতি প্রজ¦ালন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই ডাকে সারা দিয়ে হাজারো ছাত্র-জনতা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে জড়ো হন। এরপরে শিক্ষার্থীরা রাফা প্লাজা অভিমুখে পদযাত্রা, মোমবাতি প্রজ¦ালন করেন। তাছাড়া, সারা দেশে যেসব স্থানে ছাত্র-জনতা শহীদ হয়েছেন সেসব স্থানে পদযাত্রা, মোমবাতি প্রজ¦ালন ও দোয়া কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়।

আজ সর্বাত্মক অবস্থান কর্মসূচি : সপ্তাহব্যাপী ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’-এর অংশ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার সারা দেশে ‘সর্বাত্মক অবস্থান কর্মসূচি’ ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কর্মসূচি অনুযায়ী আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর শাহবাগে কেন্দ্রীয় জমায়েত করবে শিক্ষার্থীরা। গতকাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৫ আগস্ট ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে সপ্তাহব্যাপী ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’-এর অংশ হিসেবে সারা দেশে ‘সর্বাত্মক অবস্থান কর্মসূচি’। সারা দেশের সব ছাত্র-জনতাকে ওই কর্মসূচি সফল করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

এর আগে গত ১৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর ব্যানারে চার দফা দাবিতে সপ্তাহব্যাপী ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’-এর ঘোষণা দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত