কবি নজরুল তারুণ্যের শক্তির উপমায় বলেছিলেন— 'যে চাঁদ সাগরে জোয়ার আনে সে হয়ত তাহার শক্তি সম্পর্কে আজও না ওয়াকিফ।' আমাদের তরুণদের মাঝেও যে পূবাকাশে উদিত গনগনে সূর্যের তেজ, বাধ ভাঙা জোয়ার আর প্রবল সুনামির শক্তি আছে, তারাও কি ওয়াকিফহাল ছিলো?
এই তরুণেরাই শাসকদলের গুন্ডাপান্ডাদের ডান্ডার নিচে নখদন্তহীন হয়ে আধমরার মতো বেঁচেছিলেন। ভোটাধিকার হারানো কিংবা সরকারে কে এলো, কে গেলো এসব নিয়ে তাদের ভাবতে দেখা যায়নি আগে। দেশের বড় বড় দুর্নীতি-অনিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যাংক জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা যাদের বোধকে স্পর্শ করেনি, সেই তরুণদের সম্মিলিত ফুৎকারে এক দুর্দমনীয়, পরাক্রমশীল, কতৃত্ববাদীর সাম্রাজ্য মুহূর্তে উড়ে গেলো।
দিকেদিকে সাড়া পড়ে গেলো, তারুণ্যের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হলো অলিগলির আনাচ-কানাচ। পতাকা উঠলো নতুন স্বাধীনতার। দিল্লি, নিউইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডনের কর্তারা চোখ কচলিয়ে ফের তাকালো। বুঝতে চাইলো কী ঘটেছে বাংলাদেশে।
ঘটনা যা ঘটেছে তা সত্যিই। বিপথে চালিত দেশটাকে সঠিক পথে আনতে রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে চালকের আসন ফাঁকা করে তার দখল নেয় তরুণেরা। ঘুষখোর পুলিশ বাহিনী ছাত্র-জনতার আক্রোশে পড়ে আত্মগোপনে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলায় যে বিপর্যয়ের সূচনা হয় তা সামাল দিতে শত শত তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছায় পথে নেমে আসে। রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক পুলিশিং করে। নগরের জঞ্জাল সাফ করতে হাত লাগায় দলে দলে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মমতার আঁচড়ে রাজধানীর জীর্ণ দেয়ালগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আশা জাগে সুন্দর আগামীর।
তারুণ্যের এই অপরিমেয় শক্তি কীভাবে কাজে লাগাবে বাংলাদেশ, এই প্রশ্নটা উঠানো এখন জরুরি বলেই মনে করি। নিঃসন্দেহে তারুণ্যের এই শক্তি একটি সম্পদ। এই সম্পদ দেশকে গড়ার কাজে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করতে হবে। এর ভুল ব্যবহার ভবিষ্যতে ভিন্ন ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাগণ দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। দেশের প্রায় সব থানা সচল হয়েছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্লাসে ফিরে যাবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ গঠন করে সেটি সচল রাখবে। এই সংসদ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কাউট, গার্ল গাইড, বিএনসিসি ও স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে সেগুলোকে সক্রিয় রাখবে। দেশের যে কোন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে এরা মানুষের পাশে দাঁড়াবে, দেশ পুনর্গঠনে কাজ করবে। সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে উচ্চকিত থাকবে সর্বদা।
দেশব্যাপী একটি স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রতিটি থানায় দুর্নীতিবিরোধী কমিটি গঠন করে সেখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধির সাথে শিক্ষার্থীদের রাখা যেতে পারে। এই কমিটি আওতাভূক্ত এলাকার যে কোন রকমের অনিয়ম ও দুর্নীতি চ্যালেঞ্জ করে তা জনসমক্ষে নিয়ে আসবে। এভাবে সমাজে চোরাকারবারি, মজুদদারি, মাদক ব্যবসায়ী, জবদস্তিমূলক আচরণ, ঘুষ-দুর্নীতি ঠেকানো যাবে।
বর্তমান অন্তর্বতীকালীন সরকার ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ফসল। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে গঠিত হয়েছে এই সরকার। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর দুইজন প্রতিনিধি এই সরকারে রয়েছেন। দেশবাসী আশায় বুক বেঁধেছে, এই সরকার দেশ থেকে চিরতরে অপশাসন দূর করবে। সর্বত্র জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। দেশে শান্তির সুবাতাস বইবে। তবেই ছাত্র-জনতার অসীম আত্মত্যগের স্বার্থকতা মিলবে।
শিক্ষক ও লেখক।
