প্রায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও হাসপাতালগুলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির সরকার এবার সশস্ত্র বাহিনীকেও মাঠে নামিয়েছে। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে বিমানবাহিনীর ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে, আর সেনা ও পুলিশ সদস্যরা বাড়িঘর, নির্মাণাধীন ভবন, স্কুলসহ বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শন চালিয়ে জমে থাকা পানি অপসারণে সহায়তা করছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ডেঙ্গুতে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ৪৪ জনে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সংক্রমণের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৭ সালের এক লাখের বেশি আক্রান্তের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক সংক্রামক ডিইএনভি-২ ধরন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তরের নেগোম্বো অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সেখানকার জেলা হাসপাতালের পরামর্শক চিকিৎসক ডা. লালিন্দ্রা দিয়াস জানান, হঠাৎ বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে আসায় চিকিৎসকদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জুনের পর থেকে দুই মাসেরও কম সময়ে হাসপাতালটিতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালে একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহেই ১৮ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতালে অতিরিক্ত শয্যা যুক্ত করা, নতুন ওয়ার্ড চালু করা এবং চিকিৎসক ও নার্সদের কর্মঘণ্টা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৫৩৭, যা মে মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। তবে এখনো দেশটিতে ডেঙ্গুর টিকা চালু করা হয়নি।
গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে স্বাস্থ্যসেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এ দুর্যোগে দেশটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক কপিলা কান্নানগারা বলেন, জনস্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমায় কাজ করছেন। আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি গুরুতর রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী ডিইএনভি-২ ধরনে আক্রান্ত।
সরকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছে। বাড়িঘর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে। বিমানবাহিনীর ড্রোনের মাধ্যমে ছাদে জমে থাকা পানি ও বিস্তৃত এলাকায় সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে রোগীদের পর্যবেক্ষণেও সহায়তা করছে বিমানবাহিনী।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে প্রায় ১১ হাজার মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া প্রজননস্থল পাওয়ায় চার হাজারের বেশি স্থাপনার বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে।
হাসপাতালের চাপ কমাতে মৃদু উপসর্গ থাকা রোগীদের বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ২৩ বছর বয়সী শালিনি আলোকা পেরেরা রয়টার্সকে জানান, তার রক্তের প্লাটিলেটের মাত্রা খুব বেশি কমে না যাওয়ায় চিকিৎসক তাকে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিতে বলেছেন।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভাইরাসটির একাধিক ধরন একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ায় টিকার কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
চিকিৎসক লালিন্দ্রা দিয়াসের আশা, আগস্টে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে এলে সংক্রমণও কিছুটা কমতে পারে। তবে এ বছর ভাইরাসের ভিন্নধর্মী সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, ঠিক কখন এ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসবে।
আফগানিস্তানে আকস্মিক বন্যায় ২০ জনের মৃত্যু