হেফাজতের ২০৩ মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৩২ এএম

২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়েছে। মোট ২০৩টি মামলায় হেফাজতের শীর্ষপর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। কিছু মামলার চার্জশিট দেওয়া হলেও বেশিরভাগ মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ওইসব মামলার কথা বলে হেফাজতকে জিম্মি করে রাখত পুলিশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছিল। তারা কথা দিয়েও তা করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার তাদের জিম্মি করে ফায়দা নিয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশার আলো দেখছে হেফাজত। তারাও চাচ্ছে দ্রুত সময়ে মামলাগুলোর প্রত্যাহার করতে। সরকারও আশ্বাস দিয়েছে নেতাদের। আগামী তিন মাসের মধ্যে হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহার করার ইঙ্গিত মিলেছে।

পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহার করার ইঙ্গিত মিলেছে। সেজন্য পুলিশও কাজ শুরু করে দিয়েছে। সহিংসতার পর থানাগুলোর কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ ছিল। বর্তমানে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হওয়ায় মামলাগুলোর তদন্ত শুরু করে ফাইনাল প্রতিবেদন দেবে। আর যেসব মামলার চার্জশিট হয়েছে, সেগুলোও আদালতের মাধ্যমে সুরাহা করা হবে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হেফাজতের মামলাগুলো নিয়ে আমাদেরই কিছু কর্মকর্তা নাটক করেছেন। তারা সরকারকে খুশি করতে এসব মামলা করে হেফাজতের নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করেছেন। এখন সময় এসেছে যেকোনো হয়রানি করা থেকে পুলিশ বিরত থাকবে। হেফাজতের মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে সিগন্যাল এসেছে। আশা করি, আগামী তিন মাসের মধ্যে সব কটি মামলা প্রত্যাহার হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, হেফাজতের কোনো নেতা বা কর্মী কারাগারে থাকলে তারা জামিন নিয়ে মুক্তি পাবেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যেসব শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তারা সবাই মুক্ত হয়েছেন। মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তা ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মামলাও প্রত্যাহার হচ্ছে। আসামিরা জামিনে মুক্ত হয়েছেন। 

হেফাজত নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছিল। তারা কথা দিয়েও তা করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের জিম্মি করে ফায়দা নিয়েছে। কোনো প্রতিবাদ করা যায়নি। কোনো কিছু বললেই তারা মামলার ভয় দেখাত। নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। শাপলা চত্বরে নিরপরাধ মাদ্রাসাছাত্রদের মেরে রক্তাক্ত করেছে।’

নাম প্রকাশ না করে মামলার কয়েকজন তদন্তকারী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাগুলো দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বেশ কিছু নির্দেশনা এসেছে। এ নিয়ে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় সমালোচনা হচ্ছে সবখানে। এগুলোর দ্রুত সুরাহা চাচ্ছি আমরাও। ২০১৩ সালের ৬ মে বাগেরহাটে হেফাজতকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে হেফাজতের দুজন কর্মী মারা যান। ওই ঘটনায় ফকিরহাটে চারটি ও সদর থানায় দুটি মামলা করে পুলিশ। এতে হেফাজত, জামায়াত, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীসহ অন্তত ১২ হাজার জনকে আসামি করা হয়। তার মধ্যে একটি মামলার বিচার হয়েছে। রায়ে আসামিরা খালাস পেয়েছেন। ২০১৩ সালের ৫ মে তাণ্ডবের পর ঢাকাসহ ৭টি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। দুটি মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। আর ১৮টি মামলার অভিযোগপত্র দিলেও এর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।’

ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, ‘শাপলা চত্বরের ঘটনার পর ২০২১ সালে বেশি মামলা হয়েছে হেফাজতের বিরুদ্ধে। তার মধ্যে ঢাকার মতিঝিল, পল্টন ও যাত্রাবাড়ী থানায় ১৪টি মামলা হয়। তা ছাড়া চট্টগ্রামে ১১টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে সদর থানায় ১২, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৩৭, সরাইল থানা-পুলিশ বাদী হয়ে ২, আশুগঞ্জ থানা-পুলিশ বাদী হয়ে ১, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৩ ও আখাউড়া রেলওয়ে পুলিশ ১, নারায়ণগঞ্জে ৮, মুন্সীগঞ্জে ১০ ও কিশোরগঞ্জে ৪টি মামলা করা হয়। আশা করি, এই মামলাগুলো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালের শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে সক্রিয় হয় হেফাজতে ইসলাম। তারা ওই বছরের ৫ মে ঢাকার ছয়টি প্রবেশমুখে অবরোধ করে। একপর্যায়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় তারা। এ সময় হেফাজতের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। আবার ২০২১ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন। এ সময় তার সফরের বিরোধিতা করে মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম। ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু, পুলিশসহ সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হন। হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। এসব ঘটনায় সারা দেশে ১৫৪টি মামলা করা হয়। তবে কোনো মামলারই তদন্তের পাশাপাশি অভিযোগপত্রই দেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি, হেফাজতের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো সুরাহা করতে। আমরা আশ্বাস পেয়েছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সব কটি মামলা সুরাহা করা হবে। এসব মামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সঙ্গে অভিনয় করেছে। তারা মামলাগুলো প্রত্যাহারের কথা বললেও তা করেনি।’

সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক মুফতি কেফায়েত আযহারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা জিম্মি করে রেখেছিল আমাদের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা হয়। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করার আশ্বাস দিয়েও তা করেনি। আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের আশ্বাস দিয়েছে মামলাগুলো সুরাহা করবে। আশা করি, তাড়াতাড়ি মামলাগুলো মীমাংসা করে দেবে সরকার।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত