জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে বিপর্যয়ের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস (ইউএনডিআরআর)। গত শুক্রবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসকরণ ইস্যুতে এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের দেশগুলোর মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে জাতিসংঘের বৈশ্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ু নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) এক প্রতিবেদনে বলেছিল, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়া মহাদেশভুক্ত দেশগুলো। চলতি বছর (২০২৪) এবং আগামী বছরগুলোয় অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় এ অঞ্চলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব বেশি পড়বে।
এদিকে গত শুক্রবার ম্যানিলায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিআরআরের এশিয়া ও প্রশান্ত অঞ্চলের শাখার প্রধান মার্কো তোসকানো-রিভালতা। সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১৫ সালে আমরা বিশ্ব জুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসের সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক নামের যে চুক্তি আমরা করেছিলাম, তা থেকে ইতিমধ্যে আমরা অনেকটাই সরে এসেছি। আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে গত কয়েক বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি ও দক্ষতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’
এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসকরণবিষয়ক এই সম্মেলনটি এশিয়া-প্যাসিফিক মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন বা এপিএমসিডিআরআর নামে পরিচিত। আগামী অক্টোবরে যে সম্মেলন হবে, সেখানে এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের ৬২টি দেশের ২ হাজার ৫০০ জন প্রতিনিধি অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মার্কো তোসকানো-রিভালতা বলেন, জাতিসংঘ প্রত্যাশা করছে যে এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসকরণ কর্মসূচিতে নেতৃত্বের জায়গায় থাকবে ফিলিপাইন। এই প্রত্যাশার পক্ষ যুক্তিও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয় এবং অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে ফিলিপাইন একটি মডেল। ফিলিপাইন দেখিয়েছে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিহ্রাস ইস্যুতে কীভাবে সরকার, স্থানীয় সরকার, সিভিল সোসাইটি, বিজ্ঞান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে সংযুক্ত বা অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
এদিকে গত এপ্রিল মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের বৈশ্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ু নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯১ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে এশিয়ার গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ৮৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমনকি ২০২০ সালের তুলনায় গত বছর এশিয়ার গড় তাপমাত্রা ছিল দশমিক ৯১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
ডব্লিউএমও বলছে, গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টানা ও দীর্ঘ তাপপ্রবাহে একদিকে এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহগুলো গলে যাচ্ছে, অন্যদিকে শুকিয়ে যাচ্ছে জলাশয়গুলো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অদূরভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পানি নিরাপত্তা ব্যাপক সংকটের মুখে পড়বে।
ডব্লিউএমওর শীর্ষ নির্বাহী কেলেস্টে সাউলো বলেছেন, এশিয়ার অধিকাংশ দেশের ইতিহাসে ২০২৩ সাল ছিল উষ্ণতম বছর। বিশ্বে খরা, তাপপ্রবাহ, ঝড়, বন্যার মতো যত বিপর্যয় ঘটেছে, সেসবের বেশিরভাগই ঘটেছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর প্রভাব ইতিমধ্যে জনজীবন ও পরিবেশের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতিতেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এভাবে অব্যাহত থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রভাব আরও ব্যাপক হবে।
ডব্লিউএমওর তথ্য অনুয়ায়ী, গত বছর (২০২৩ সালে) প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ এশীয় অংশের তাপমাত্রা ছিল সর্বোচ্চ। তাপমাত্রা বাড়ছে সাইবেরিয়া থেকে মধ্য এশিয়া ও পূর্ব চীন থেকে জাপান পর্যন্ত। গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে এশিয়ার হিমালয় পর্বতমালা এবং এই পর্বতমালার হিন্দুকুশ ও তিব্বত রেঞ্জের ২২টি হিমবাহের মধ্যে অন্তত ২০টির বরফের মজুদ ২০২৩ সালে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এদিকে জলবায়ুর এই বিরূপ পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলসৃষ্ট দুর্যোগও মোকাবিলা করতে হচ্ছে এশিয়াকে। ২০২৩ সালে এশিয়ায় বড় আকারের ঝড়, বন্যা ও তুমুল বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৭৯টি। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৯০ লাখ।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলোর আবহাওয়াকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন হ্রাসে জোর দেওয়া হয়েছে ডব্লিউএমওর সবশেষ প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, আবহাওয়াকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে খানিকটা হলেও সহায়তা করবে। তবে গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন কমানোর কোনো বিকল্প নেই। এই মুহূর্তে গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন হ্রাস শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং জরুরি কর্তব্য।
