সচিবের বন্ধুত্বে ফারুকের গম সাম্রাজ্য

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৪, ১০:১০ এএম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগের দিন রাজধানীর খামারবাড়িতে ‘শান্তি সমাবেশে’ কর্মকর্তাদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামান কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ওয়াহেদা আক্তার। এর রেশ ধরে তাকে বরখাস্ত করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে তার অনুগত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা দিনাজপুরের গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. গোলাম ফারুক বহাল তবিয়তে আছেন। তিনি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ও কর্মচারীদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ওয়াহেদা আক্তার ও গোলাম ফারুক ক্লাসমেট ছিলেন। ক্লাসমেট হওয়ায় তাকে এ পদে বসানো হয়েছে বলে স্বীকারও করেছেন গোলাম ফারুক। তার দাবি, নতুন এই সংস্থাটিকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্যই তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন সচিব (তখন অতিরিক্ত সচিব) ওয়াহিদা আক্তার।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিয়োগ-বাণিজ্য ও দলবাজির অভিযোগে ১৪ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ওয়াহিদা আক্তারকে বরখাস্ত করা হয়। তার অনুসারী ও অপকর্মের সহযোগীরা নিজে থেকে পদত্যাগ করেছেন। অনেকে আবার আত্মগোপনে গেছেন। সচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠে নামান তিনি।

৪ আগস্ট ফার্মগেটের খামারবাড়িতে ‘শান্তি সমাবেশ’ করেন তিনি। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াহিদা ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ছাত্রলীগ নেত্রী ছিলেন। তিনি শেখ হাসিনার উপদেষ্টা মসিউর রহমানের ভাগ্নি। তিনি প্রায় চার বছর প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব এবং পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এ কারণে কৃষি মন্ত্রণালয়ে তার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন অধিদপ্তরে নিজের পছন্দের লোককে বসিয়েছেন। ওয়াহিদা দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে নিজের ক্লাসমেট গোলাম ফারুককে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিজি পদে বসান।

২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর ড. গোলাম ফারুককে মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. মো. আবু জামান সরকার ও পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) এবং ড. সালাহ্উদ্দিন আহমেদ, পরিচালক (পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর)-কে ডিঙিয়ে তাকে এ পদে বসানো হয়।

অভিযোগ আছে, গোলাম ফারুকও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কর্মকর্তাদের পদায়ন করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত জুনিয়র কর্মকর্তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। সব জায়গা থেকে সাবেক সরকারের আশীর্বাদপুষ্টরা বিদায় নিলেও ড. গোলাম ফারুক বহাল তবিয়তে আছেন। ওয়াহিদা আক্তারকে অন্তর্বর্তী সরকার বরখাস্ত করলেও ড. গোলাম ফারুক তার রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন।

একাধিক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহেদা আক্তারকে ম্যানেজ করতে বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালকদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ নিতেন ড. গোলাম ফারুক। প্রতি মাসে দু-তিনবার ঢাকায় (সচিবালয়ে) আসতেন। প্রতিবারই সচিবের নাম করে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা নিতেন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ২০১৭ সালে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে আলাদা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সরকার। এটি প্রতিষ্ঠার আগে কৃষ্ণ কান্তি রায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সেই কর্মকর্তাকেই গোলাম ফারুক পিএইচডি স্কলারশিপের জন্য সুপারিশ করেন।

ইনস্টিটিউটের গম প্রজনন বিভাগের দুজন সিনিয়র বিজ্ঞানী প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুল হাকিম ও রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জাহেরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে আস্থাভাজন অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ রেজাউল কবীরকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্ব দেন গোলাম ফারুক।

সম্প্রতি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন ও অস্ট্রেলিয়ার একটি সংস্থার যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয় রেজাউল কবিরকে। প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে রেজাউল তার স্ত্রীকে নিয়োগ দেন। প্রকল্পের সব কাজ যশোর আঞ্চলিক কেন্দ্রে হলেও রেজাউল কবীর সস্ত্রীক দিনাজপুরে অবস্থান করেন। ডিজির আস্থাভাজন হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।

গোলাম ফারুকের অপসারণের দাবিতে প্রতিষ্ঠানটিতে আন্দোলন চলছে। গত রবিবার অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন করতে গেলে সেখানে ডিজির লোকজন হামলা করে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনায় দুজন বিজ্ঞানীসহ কয়েকজন আহত হন।

আন্দোলনরতরা জানান, রবিবার বেলা ১১টার দিকে ইনস্টিটিউটের সামনে দিনাজপুর-দশমাইল মহাসড়কে মানববন্ধন কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতে গেলে এসএ রুবেল ও ডিজির গাড়িচালক মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে ইনস্টিটিউটের একজন কর্মকর্তা শ্রমিক-কর্মচারী বন্ধনে হামলা চালান। হামলায় ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী মো. আসাদুজ্জামান চৌধুরী ও মো. নূরে আলম আহত হন। পরে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ইনস্টিটিউটের কর্মচারী মো. আসাদুজ্জামান বুলেট, শ্রমিক নেতা মো. সুলতান আলী মজনু, মো. মোখলেছুর রহমান, মো. মতিউর রহমান প্রমুখ।

আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠানটির খামার বিভাগের কর্মচারী আসাদুজ্জামান বুলেট দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোলাম ফারুক পতিত সরকারের খাস লোক ছিলেন। তিনি ঢাকায় ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে মাঠে নেমে আন্দোলন করেছেন। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করেছেন। আমরা তার অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করছি। ডিজির লোকজন আমাদের ওপর হামলা করেছে।’

গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কখনোই কোনো দলের হয়ে কাজ করিনি। কোনো দলের সঙ্গে আমার সম্পর্কও নেই। তবে সাবেক সচিব ওয়াহেদা আক্তার আমার ক্লাসমেট ছিলেন। নতুন এ সংস্থাটিকে ঢেলে সাজানো এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেন তিনি।’

সচিব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তিনি আমার ক্লাসমেট ছিলেন। আমাকে ভালো করে চিনেন-জানেন। এ পরিচিতি কাজে লাগিয়ে ইনস্টিটিউটের উন্নয়নে কাজ করেছি। তাকে ম্যানেজ করা বা ঘুষ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি কাউকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করিনি। দুদকে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলাকালে কৃষ্ণ কান্তি রায়ের পদোন্নতি আমি দিইনি। তবে স্কলারশিপের জন্য সুপারিশ করেছি।’

মানববন্ধনে হামলার অভিযোগ সম্পর্কে ড. গোলাম ফারুক বলেন, কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী তার সঙ্গে বসতে চেয়েছিলেন। তিনি তাদের জন্য অপেক্ষা করেছেন, কিন্তু তারা আসেননি। মানববন্ধনে বহিরাগত কিছু লোকের সঙ্গে কর্মচারীদের ধাক্কাধাক্কির কথা শুনেছেন। তাদের পরিচয় তিনি জানেন না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত