গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যের পেছনে এক ‘আড্ডা’

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৮:০৬ এএম

আড্ডা দিয়ে কী হয়! কথাটি হরহামেশা শোনা যায়। বিশেষ করে মুরুব্বিগোছের মানুষদের কাছে। অথচ আড্ডায় কী না হয়। রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়, বড় লেখক জন্ম নেয়, চেপে বসা স্বৈরশাসকের খুঁটি নড়বড়ে হয়ে যায়...। আড্ডা থেকে চিন্তার জন্ম হয়। চিন্তা ছিনতাইও হয়। আড্ডার স্থান পীঠস্থানে পরিণত হয়। আড্ডা থেকে ‘জুলাই মাস ৩৬ দিনের’ হয়। দুনিয়া কাঁপানো বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের আন্দোলনের চিন্তাটাই আসে এ আড্ডা থেকে।

মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী এ আড্ডা শুরু করেন। তারা প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসতেন। বৃহস্পতিবারকে হিন্দিতে বলা হয় গুরুবার। তারা তাদের আড্ডার নামও রাখেন ‘গুরুবার’। নামে গুরু আছে, যা দরকার যেকোনো চর্চিত বিষয় মীমাংসায়। তারা বিষয়টি পাঠচক্রে রূপ দেন। যেখানে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে বোঝাপড়া হয়। ২০২১ সালে শুরু হয়। দেড় বছরে প্রায় ১০০টি আড্ডা শেষে তারা আইডিয়াভিত্তিক রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সূচনা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল ছাত্র-নাগরিক সংহতির মাধ্যমে ফ্যাসিজমের বিলোপ করা। লেজুড়বৃত্তিহীন ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

এ আড্ডাবাজদের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম। সমন্বয় করতেন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজ আবদুল্লাহ। যিনি মাহফুজ আলম নামেও পরিচিত। তাদের মধ্যে নাহিদ ইসলাম বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা। আর মাহফুজ আলম বিশেষ সহকারী।

ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর তখন খুব আলোচনায়। নুরের দল গণ অধিকার পরিষদে কোন্দল। ছন্নছাড়া নুরের ছাত্র সংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদেও। একদল তরুণ নেতা গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ওই ছাত্র সংগঠন ছেড়ে দেন। পদত্যাগ করা এসব কর্মী গিয়ে ঠাঁই নেন গুরুবারে। চাঙ্গা হয়ে ওঠে গুরুবার। পদত্যাগ করা কর্মী ও গুরুবার আড্ডার শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি’। ওই বছরের, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, রাজনৈতিক ব্যক্তি, পরিসর ও সংস্কৃতি নির্মাণ, শিক্ষার্থী কল্যাণ, ছাত্র-নাগরিক রাজনীতি নির্মাণকে ও রাষ্ট্র-রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। যার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার নেতৃত্বে ছিলেন সরকারের আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার।

করোনা মহামারী-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন কোণঠাসা অবস্থায় ছিল। তখন ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক এবং জাতীয় সমস্যা ও সংকট নিয়ে আন্দোলন করত গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। নতুন এ সংগঠনের অনেকেই ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট যখন সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের রায় দেয়, তখন আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত নেন ঢাবির শিক্ষার্থীরা। যার সামনের সারিতে ছিলেন ছাত্র শক্তির নেতাকর্মীরা। পরবর্তীকালে সমন্বয়ক, সহ-সমন্বকদেরও যে কমিটি ঘোষণা করা হয়, সেখানেও তাদের আধিপত্য ছিল।

গুরুবার আড্ডা এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের যোগসূত্র নিয়ে কথা হয় এই আড্ডার মূল সমন্বয়কারী মাহফুজ আলমের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, কীভাবে এই গুরুবার আড্ডার শুরু এবং কতটা প্রভাব রেখেছে এ আন্দোলনে।

মাহফুজ আলম বলেন, ‘২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর আমরা কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিলে বটতলায় বসে এই আড্ডা শুরু করেছিলাম। আড্ডাটা এক্সক্লুসিভ রেখেছিলাম গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ও ইতিহাসসমৃদ্ধ টেক্সটগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য। তরুণদের মধ্যে ইতিহাস ও দর্শনের পোক্ত বোঝাপড়া তৈরি করতে। প্রথম আড্ডায় আমরা ঠিক করেছিলাম কোন বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আড্ডা দেব। সেখানে সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব এ চারটি বর্গ ধরে টেক্সটভিত্তিক আড্ডার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বেশিরভাগই ২০১৮ সালে কোটা আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করেছিলাম। এরপর ছাত্রলীগের অপতৎপরতার কারণে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক স্পেস কমে যায়। তখন আমরা ভাবলাম যে, এত বড় আন্দোলনের পরও বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসেনি। তখন আমরা বিষয়টা নিয়ে ভাবা শুরু করি, গবেষণা করতে থাকি। আলোচনার ভিত্তিতে ভাবার চেষ্টা করেছি কী করা যেতে পারে বাংলাদেশের জন্য। তখন আমরা কিছু লেখালেখি করেছি, কিছু প্রস্তাবনা করেছি। তখনো আমরা ভাবিনি যে, ছাত্র সংগঠন গঠন করা হবে। পরে একটা সময় আমরা দেখলাম যে, আড্ডায় মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিষয়গুলো বোঝাপড়ার জন্য ছাত্রদের ব্যাপক আগ্রহ।’

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘যখন আমরা ৩০ থেকে ৩৫ জন হলাম, তখন ভাবলাম যে এটাকে রাজনীতিতে রূপান্তর ঘটানো যায় কি না। তখন আমি এটার আইডিয়া নিয়ে বুদ্ধিভিত্তিক কাজ শুরু করে দিলাম। এর মধ্যে ছাত্র অধিকার পরিষদ ভেঙে যাওয়ায় আলোচনার পর তারাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেখান থেকে আমরা রাজনীতির কথা ভাবলাম। ঠিক করা হলো, এটা হবে আইডিয়াভিত্তিক রাজনীতি। কোনো ধরনের লেজুড়বৃত্তিক না হয়ে শুধু আইডিয়ার ভিত্তিতে রাজনীতি করব। তারপর আমরা রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সামনে আসি। এরপর আমরা দেখি, ৮ থেকে ৯ মাস ধরে ছাত্র সংগঠনগুলো কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। তখন এই ছাত্র শক্তিই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ ছাত্রদের দাবি আদায় নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল। এর মধ্য দিয়ে ছাত্র শক্তি ক্যাম্পাসে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। গবেষণাধর্মী পলিটিক্যাল একটা শ্রেণি গুরুবার আড্ডায় যুক্ত হলে আমাদের শক্তি বেড়ে যায়। ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী হলেও তারা ক্যাম্পাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’

মাহফুজ আলম বলেন, ‘ছাত্র শক্তির আইডিয়াভিত্তিক রাজনীতি এবং পলিসিভিত্তিক পলিটিকস; এটাকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া ছিল আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। আমাদের সংগঠন ঘোষণায় বলা ছিল ছাত্র-নাগরিক সংহতি। আমাদের যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল সেগুলো মূলত ফ্যাসিজমকে বিলোপ করার জন্য। এখনো ছাত্র শক্তির ঘোষণাপত্রে তা আছে। যখন ছাত্র শক্তি গঠন হয়, তখন গুরুবার আড্ডা তিনটি ফরম্যাটে ভাগ হয়ে যায়। একটা অ্যাকাডেমিক, একটা ইন্টেলেকচুয়াল এবং অন্যটা কালচারাল। এটার ভিত্তিতে আমরা ক্যাম্পাসে কাজ করছিলাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম দিকে যারা বিভিন্ন ফরম্যাটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে, তারা মূলত এ আড্ডাগুলোর অংশীজন। এ আন্দোলনের যে ইন্টেলেকচুয়াল এবং পলিটিক্যাল ফিল্ডের অভিজ্ঞতা এ দুটোর সংমিশ্রণ অন্য কোনো সংগঠনে ছিল না। ছাত্র শক্তির নেতারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সফলতার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকার অন্যতম কারণ পলিটিক্যাল ও আইডিয়ার ট্রেনিংটার সংমিশ্রণ ঘটা। এরপর যা ঘটেছে, সেই ইতিহাস সবার জানা।’

এই আড্ডার আরেক উদ্যোক্তা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আড্ডা আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন হতে পারে, পরিবর্তন কীভাবে ঘটানো যায় এসব বোঝাপড়া করার চেষ্টা করছি। ৫ জুন যখন হাইকোর্ট রায় দিল তখন আমাদের সবারই মনে হলো যে, একটা প্রোগ্রাম করা প্রয়োজন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এটা আলোচনা করছিলেন। তখন আমরা সাধারণ জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা করি এবং আলোচনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে আন্দোলন শুরু করি। যদিও প্রথম দিকে ছাত্র শক্তির নেতাকর্মীরা সামনে ছিলেন এবং সমন্বয়কের সংখ্যাও ছিল বেশি। তবে কেউ ছাত্র শক্তির নেতাকর্মী হিসেবে অংশগ্রহণ করেননি। তারা সামনে এসেছেন কারণ তাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। আরও অনেকেই ছিলেন, যারা কাজ করেছেন কিন্তু নাম প্রকাশ করতে চাননি। আমি মনে করি, এ আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের এবং তারাই সফল করেছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত