ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিন মুক্ত গণমাধ্যম চাই

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:৩৩ এএম

যেসব আইনে সাংবাদিক নিপীড়নের ধারা আছে, সেগুলো (ধারা) এখনই বাদ দিয়ে পরবর্তী সময়ে তা সংস্কার, গণমাধ্যম কমিশন গঠনসহ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকরা। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান দেশের শীর্ষ সম্পাদকদের বলেছেন, তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং একটি প্রাণবন্ত মিডিয়া জগৎ দেখতে চান। তিনি চান গণমাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করুক এবং অন্তর্বর্তী সরকার কোনো ভুল করলে নির্দ্বিধায় লিখে যাক।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সম্পাদকদের এক বৈঠকে এসব আলোচনা হয়। যেখানে ২০ জন সম্পাদক অংশ নেন। পরে যমুনার সামনে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম এবং ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে সাংবাদিকের কাছে বৈঠকের তথ্য তুলে ধরা হয়।

মাহ্ফুজ আনাম বলেন, ‘তারা চান, দেশে একটি জাতীয় ঐক্য স্থাপিত হোক। বৈঠকে তারা সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যত্রতত্র খুনের মামলা বন্ধ করতে বলেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আশা করছি। সেই সংস্কারের মধ্যে সংবিধান পরিবর্তন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো, অ্যান্টিকরাপশন কমিশন, হিউম্যান রাইটস কমিশন ও নির্বাচন কমিশন এগুলো সংস্কার করা।’

মাহ্ফুজ আনাম বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে গণমুখী সংস্থা আমরা চাই। নির্বাচন কমিশন যাতে ভবিষ্যতে ভোটারদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটায়, এ রকম একটা সংস্থা চাই। আমরা এমন দুর্নীতি দমন কমিশন চাই, যেন তারা স্বাধীনভাবে দেশের দুর্নীতি দমন করতে পারে।’

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিরোধী সব কালাকানুন বাতিলের দাবি করা হয়েছে জানিয়ে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, সাইবার সিকিউরিটি আইনের মধ্যে সাংবাদিক নিপীড়নের যে অধ্যায়গুলো আছে, সেগুলো কার্যকর হবে না এমনটা যাতে ঘোষণা করা হয়। এটা সংস্কারের জন্য তারা সময় নিয়ে করতে পারেন।’

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সূত্র ধরে মাহ্ফুজ আনাম বলেন, ‘তিনি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করেন। আমাদের বিশেষ আবেদন করেছেন, আমরা যেন আমাদের লেখনীর মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করি। এ সরকারের ভুলত্রুটি সোচ্চারভাবে, নির্দ্বিধায় সেটা যেন কাগজে ছাপি। এ সরকারকে সাহায্য করি। আমরা এখন মিডিয়াবান্ধব সরকারপ্রধান পেয়েছি। সেজন্য অত্যন্ত আনন্দিত।’

ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা যদি মনে করেন, একটা গ্রুপ করে দেওয়া বা একটা বিশেষ কমিটি করে দিয়ে সব ধরনের আইনের যে পরিবর্তন, সেটা করা। আমরাও সংবিধান সংস্কার চাই। আমরা গণতান্ত্রিক রিফর্ম চাই।’

এদিকে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের কাছে ব্রিফ করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও অপূর্ব জাহাঙ্গীর।

শফিকুল আলম বলেন, ‘অনেকগুলো বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। যার মধ্যে আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা। প্রধান উপদেষ্টা ও সম্পাদকদের মধ্যে আলোচনাটি রেকর্ড করা হয়েছে, যেটি অন্য উপদেষ্টাদেরও অবগত করা হবে।’

তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা সম্পাদকদের কাছে জানতে চেয়েছেন এ সরকারকে রাষ্ট্র সংস্কারে কী কী কাজ করতে হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ‘যৌক্তিক’ সময় কতটুকু হওয়া উচিত। বৈঠকে মেয়াদের বিষয়ে আলোচনার সময় দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে হওয়ার ব্যাপারে মত দেন সম্পাদকদের কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য যৌক্তিক মেয়াদ হিসেবে দুই বছরের কথা বলেছেন। অনেকে বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্র সংস্কার উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করে এর যৌক্তিক মেয়াদ নির্ধারণ করা উচিত। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো মেয়াদের কথা উল্লেখ না করলেও প্রধান উপদেষ্টা সবার মতামত নিয়েছেন। মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া সম্পাদকরা সরকারের মধুচন্দ্রিমা সময়ের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম বা কার্যপদ্ধতি ঠিক করে ফেলারও পরামর্শ দেন।

শফিুকল আলম বলেন, এ ছাড়া সংবিধান পুনর্লিখন বা সংশোধন-সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে, যেখানে কারও মত ছিল এখনই সংবিধান সংশোধন করার আবার কেউ মত দিয়েছেন সংসদ গঠনের পর সংবিধান রিরাইট করার।

ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, এটি রাষ্ট্র মেরামতের একটি বড় সুযোগ, যা ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তৈরি হয়েছে। এই সুযোগের যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে।

সম্পাদকরা সম্মিলিতভাবে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নসহ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তারা দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে গণমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য পুনর্গঠনের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন নিয়ে কথা বলেছেন তারা, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচন ভোটারদের ইচ্ছার সত্যিকারের প্রতিফলন হতে পারে। দেশে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশ সংস্কারসহ আরও সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন সম্পাদকরা।

শফিকুল আলম বলেন, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারের স্বায়ত্তশাসিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যাতে সেখানকার সাংবাদিকরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দোষত্রুটি নিয়ে লেখার অনুরোধ জানিয়ে ড. ইউনূস সম্পাদকদের বলেছেন, ‘আপনারা লিখবেন, প্রচুর লেখেন, আপনারা জানান। আমাদের যদি দোষত্রুটি থাকে এগুলো নিয়েও আপনারা বলেন। আমরা আপনাদের কাছ থেকে শুনতে চাই।’

মিডিয়া কমিশন করার প্রস্তাব এসেছে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যাতে কোনো সাংবাদিক কোনো অসুবিধায় না পড়েন, সে বিষয়ে একটা মিডিয়া কমিশন করার প্রস্তাব এসেছে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের বিবেচনাধীন আছে।’

মোট ২২ জন সম্পাদককে মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দুজন বিদেশে থাকায় আসতে পারেননি। বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির, সংবাদ সম্পাদক আলতামাশ কবির, ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, আমাদের সময় সম্পাদক আবুল মোমেন, যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সম্পাদক ইনাম আহমেদ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান, আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, কালবেলা সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম. রমিজউদ্দিন, করতোয়া সম্পাদক মোজাম্মেল হক এবং দেশ রূপান্তর সম্পাদক মোস্তফা মামুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত