শুল্ক কমলেও শঙ্কা সিন্ডিকেটে

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:৪২ এএম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘিরে জুলাই ও আগস্ট মাসে সৃষ্ট অচলায়তন, পণ্য পরিবহনের বিঘœ এবং সাম্প্রতিক বন্যার কারণে তৈরি হওয়া উচ্চমূল্যের বাজারে স্বস্তি দিতে পেঁয়াজ, আলু ও কীটনাশক আমদানিতে সাময়িকভাবে শুল্ক ছাড় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কীটনাশকের ওপর প্রযোজ্য ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আলু আমদানিতে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর পেঁয়াজের ওপর যে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রযোজ্য ছিল, তাও সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তবে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আগের মতোই থাকবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর আগেও বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি নানান ভোগ্যপণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছিল। কিন্তু এর কোনো সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উল্টো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এর পুরো সুবিধা গ্রহণ করেছে। ফলে এ শুল্ক ছাড়ের সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু নিয়ন্ত্রণহীন আমলা-সিন্ডিকেটের কারণে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে শুল্ক কমিয়েও কোনো ফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, এর আগেও সরকার পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করেছিল। কিন্তু শুল্ক ছাড়ের পুরো সুবিধা পকেটে পুড়েছিল আমলা-ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। সেই সময়ে যেসব আমলা সুবিধা দিয়েছিলেন তারা এখনো রয়েছেন। সেদিক থেকে ভোক্তাদের সুবিধা পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। তবে নতুন সরকারের আমলে এর পরিবর্তন প্রত্যাশা করা যায়। এর জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামানের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, পেঁয়াজে ৫ শতাংশ শুল্ক ছাড় বাজারে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। কেননা ভারত থেকে আসা পেঁয়াজের কেজিতে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকা শুল্ক ছাড় পাচ্ছে কেজিপ্রতি। কিন্তু এ শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে কার্যকর করা দরকার ছিল। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে যখন বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ছিল তখন পেঁয়াজ আমদানির ছাড়পত্র দিলে এখন পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকত।

তিনি আরও বলেন, সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বাজার মনিটরিং করার চেষ্টা করছি। এ ধারাটা ধরে রাখতে পারলে ভোগ্যপণ্যের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে আসবে। এ ছাড়া সরকার পতনের পর বাজারগুলোতে চাঁদাবাজি ছিল না। কিন্তু এখন আবার নতুন মোড়কে সেই চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গেল ১৫ বছরের শাসনামলে সরকার পণ্য আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়েছিল। তার কোনো সুবিধা ভোক্তা পায়নি। পাশাপাশি আইনের যথাযথ শাসন না থাকায় আমলা ও ব্যবসায়ীরা মিলে সব ধরনের সুবিধা নিয়েছিল। সরকার আবারও পণ্য আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়েছে। আগে যারা সুবিধা নিয়েছে সেসব ব্যবসায়ী এখন সুর পাল্টে নতুন সরকারের আশপাশে ঘুরঘুর করছে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ কতটা সুবিধা পাবে, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। তাই নতুন সরকারের আমলে আমরা নতুন করে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করতেই পারি। এর জন্য সরকারকে দেশের প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

এদিকে গতকাল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আলু ও পেঁয়াজ এবং চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় কীটনাশক আমদানি শুল্কহ্রাস করেছে সরকার, যা চলতি বছর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, বিগত জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে দেশে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটেছে, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। উপরন্তু দেশের পূর্বাঞ্চলে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কীটনাশক, আলু ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের মূল্য কমানোর ব্যবস্থা নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ করেছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সার্বিক বিশ্লেষণ-পূর্বক কর ছাড়ের মাধ্যমে উল্লিখিত পণ্যগুলোর আমদানি সহজ করে সরবরাহ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব পণ্যের শুল্ক কমানোর কারণ হিসেবে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আলু ও পেঁয়াজ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মোট চাহিদার সিংহভাগ মেটানো হয়। আমদানি শুল্ক বেশি থাকলে দেশীয় উৎপাদকরা সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নেওয়া কার্যক্রমের ফলে উল্লিখিত পণ্য দুটির বাজারমূল্য সহনশীল পর্যায়ে থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে কৃষকদের আলু ও পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতেও যেকোনো রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে নীতি সহায়তা প্রদানে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় রাজস্ব জোগানে মূল ভূমিকা পালনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একইভাবে সচেষ্ট থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত