দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের বড় পতন রেখে গেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এর মধ্যে বড় ধাক্কা ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল পরিশোধ। এতে দুই মাস পর আবারও রিজার্ভ নেমেছে ১৯ বিলিয়নের ঘরে। গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে জুলাই-আগস্ট মাসের আকুর বিল ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে তা ২৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। গত ২৬ জুন রিজার্ভ নেমে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, রিজার্ভ আর কমবে না। তবে আকুর বিল পরিশোধের পর এটি এখন কমলেও যে পরিমাণের রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে তিন মাসেরও বেশি সময়ের আমদানির বিল পরিশোধ করার সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের।
আকু হলো একটি আন্তঃদেশীয় লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার লেনদেনের দায় পরিশোধ করা হয়। ইরানের রাজধানী তেহরানে আকুর সদর দপ্তর। এ ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি দুই মাস অন্তর আমদানির অর্থ পরিশোধ করে। তবে এখন আকুর সদস্যপদ নেই শ্রীলঙ্কার।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আমদানি ব্যয় পরিশোধের বিভিন্ন শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটির আকু সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের এশিয়া অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক কমিশনের (এসক্যাপ) ভৌগোলিক সীমারেখায় অবস্থিত সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য আকুর সদস্যপদ উন্মুক্ত।
এর আগে গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে মে-জুন মাসের বিল পরিশোধ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৪৬ বিলিয়নে। যদিও তার কয়েক দিন আগে আইএমএফের ঋণের তৃতীয় কিস্তিসহ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পেয়েছিল বাংলাদেশ।
এদিকে আমাদানি হ্রাস, ব্যয় সংকোচনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও কোনোভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। গত বছরের একই সময়ে রিজার্ভ ছিল ২৫ বিলিয়নের বেশি। সময় যত গড়িয়েছে রিজার্ভ তত কমছে। চলতি বছরের মে মাসে রিজার্ভের অবস্থা আরও খারাপ হয়। ওইসময় রিজার্ভ নামে ১৮ বিলিয়নের ঘরে। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়ানোর পর আর কখনো নিচে নামেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ২৫ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬-তে ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৩২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৩৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন। ২০২০-২১ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ৩১ বিলিয়ন ডলার এবং সর্বশেষ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।
সাধারণত একটি দেশের ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি খরচের সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। প্রকৃত রিজার্ভে সেই মানদ- হিমশিম খাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম সূচক হলো বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান সংকটের কারণে রিজার্ভ থেকে বাজারে প্রচুর ডলার বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া গত মাসে আকুর বিলও পরিশোধ হয়েছে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ কম এসব কারণেই মূলত রিজার্ভ কমছে।
মূলত প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ থেকে যে ডলার পাওয়া যায় তা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরি হয়। আবার আমদানি ব্যয়, ঋণের সুদ বা কিস্তি পরিশোধ, বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা, পর্যটক বা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় হয়ে থাকে, তার মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা চলে যায়। এভাবে আয় ও ব্যয়ের পর যে ডলার থেকে যায় সেটাই রিজার্ভে যুক্ত হয়। আর বেশি খরচ হলে রিজার্ভ কমে যায়।
