একটা সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থানে ছিল অগ্রণী ব্যাংক। কিন্তু খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি ছাড়াও নানা অনিয়মে জর্জরিত হয়ে পড়ে ব্যাংকটি। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হয়ে এসেছেন একসময়কার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। পূর্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাংকটিকে ঢেলে সাজাতে চান তিনি। দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সেসব পরিকল্পনা।
আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, অগ্রণী ব্যাংককে এগিয়ে নিতে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তবে চ্যালেঞ্জ যাই আসুক, ব্যাংককে এগিয়ে নিতে সবার প্রথমে ইচ্ছা থাকা জরুরি। সেই ইচ্ছা থাকলে আমাদের নির্ধারিত স্থান পৌঁছানো সম্ভব হবে। তবে তার আগে আমাদের তিনটি জিনিস থাকা বাধ্যতামূলক। সেগুলো সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি যা থাকলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক এক নম্বর হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে ভালো প্রতিযোগিতা হতে পারে। তবে আমার লক্ষ্য, অগ্রণী ব্যাংক যেন দেশের এক নম্বর ব্যাংক হয়, আর তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, যখন অগ্রণী ব্যাংক ছেড়ে গিয়েছিলাম, তখন প্রায় শীর্ষ ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি ছিল। ২০১০-এর দিকে আমরা সবার চেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা পেতে শুরু করেছিলাম। এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্সপ্রাপ্তদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছি। তবে রেমিট্যান্সপ্রাপ্তদের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের একটি আমাদের ওপরে রয়েছে।
আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, প্রতিটি বোর্ড কিংবা ম্যানেজমেন্টের জন্য খেলাপি ঋণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেও আমরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। যখন আমি ২০১০ সালে ছেড়ে গিয়েছিলাম, তখন খেলাপি ঋণ ৩৮ থেকে ১১ শতাংশের নিচে নামিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, এটি আবার বেড়ে ২৮ শতাংশ হয়েছে। এই খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ ডান কিংবা বাম পাশ দিয়ে ঋণ দিয়েছে বটে, কিন্তু তা আর ফলোআপ করা হয়নি। তবে এখানে আমার কাজ হবে, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য নিয়মিত তদারকি করা।
ব্যাংকের মুনাফা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি যখন ২০০৪-এ ছিলাম, তখন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে বলেছিলাম, মূলধন আমার আয় দিয়ে পরিপূর্ণ করব। তা ২০১০ সালে করেছিলামও। কিন্তু এখন আবার ঘাটতি বেড়ে গেছে। এটিও আমার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’
ব্যাংকের বিনিয়োগের বিষয় নিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের পেছনে ব্যাংকের যে বিনিয়োগ রয়েছে, তা নিয়ে ঝুঁকি এখন যেমন রয়েছে, আগামীতেও থাকবে। তবে এসব বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার যে রাস্তা বা প্রক্রিয়া থাকবে, তার দিকে আপনাকে ঝুঁকতে হবে। অনেক ইন্ডাস্ট্রির পরিচালনা পর্ষদ নেই। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আদালতের নিয়োগ করা পর্ষদ হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নতুন পরিচালনা পর্ষদ হচ্ছে এবং মন্ত্রণালয় থেকে নতুন পরিচালনা পর্ষদ হচ্ছে। এদের সফল হতে হবে। তবে আমি বিশ্বাস করি, যারা আসছেন তারা তাদের নিজস্ব পেশা থেকে আসছেন। অতএব সফল হবেই।’
অগ্রণী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের ভাষ্য, ‘বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেকে বসতেন। এরা তাদের নিজস্ব ব্যক্তিদের মাধ্যমে নামে-বেনামে ঋণ নিতেন। এসব ঋণ না দিতে চাইলে ম্যানেজমেন্টের ওপর বলপ্রয়োগ করা হতো। এটি আমার সময়ও হয়েছিল। কিন্তু এসব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে শক্তভাবে সমস্যার সমাধান যারা করবে, তারা সফল হবে। আর যাদের দুর্বল কিংবা যাদের মেরুদ- নরম, তারা বিপদে পড়বে।’
খেলাপি ঋণ আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য আপনাকে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে হবে। ঋণ আদায়ের প্রথম শর্ত ব্যাংক ও খেলাপি ঋণকারীর মুখোমুখি বসতে হবে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তা ছাড়া তাদের আয়ের উৎসগুলো যেমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি ও বাড়ি বিক্রি করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এজন্য ম্যানেজমেন্টকে কাজ করতে হবে। শুধু ঋণখেলাপি ব্যক্তির বিরুদ্ধে চিঠি ইস্যু করে বসে থাকলে হবে না।’
বর্তমানে ব্যাংকঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চলমান এ সময়ে কোনো নতুন গ্রাহককে ব্যাংক লোন দেওয়া হবে না। তবে চলমান গ্রাহকদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বড় লোনের দিকে যেতে হলে কয়েকটা ব্যাংক মিলিয়ে যাব, তাও শর্তসাপেক্ষে।’
