কিছুদিন আগেও জামালপুর মানেই যেন ছিল মির্জা আজমের রাজত্ব। জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের সাতবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তিনি। পুরো জেলার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য, সাংগঠনিক যেকোনো সিদ্ধান্তে তার কথাই ছিল শেষ কথা। জেলার রাজনীতিতে যে কাউকে টেনে ওপরে তোলা বা নিচে নামানোর ক্ষমতা রাখতেন তিনি। প্রভাবশালী এই আওয়ামী লীগ নেতাকে তুষ্ট করতে জামালপুর পৌরসভার নিজস্ব ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশনের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে ধনাঢ্যদের বিনোদনের জন্য ‘জামালপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া অনুমোদন অনুযায়ী সেখানে সাধারণ মানুষের সুস্থ চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা ও ব্যায়ামের জন্য আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র গড়ার কথা ছিল। শুধু তা-ই নয়, ওই ক্লাবের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে পাশের ৬টি গ্রামের ২০ হাজার মানুষের চলাচলের রাস্তা। এখন তাদের যাতায়াত করতে হয় দেড় কিলোমিটার ঘুরপথে।
জামালপুর রিক্রিয়েশন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজম। অভিযোগ রয়েছে, জামালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানু ঠাকুরকে (মির্জা আজমকে ঠাকুর বলে সম্বোধন করেন ছানু) খুশি করতে ওই ক্লাবের উন্নয়নে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের (ভিআইপি) ওই ক্লাবের জন্য প্রকল্প দিতে পিছিয়ে নেই জেলা পরিষদও। এভাবে হাতেগোনা কিছু মানুষের বিনোদনের জন্য গড়ে ওঠা একটি ক্লাবের উন্নয়নে পৌরসভা ও জেলা পরিষদের কোটি কোটি টাকা ব্যয়কে অনৈতিক ও দুর্নীতি বলে উল্লেখ করেছেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানু জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জামালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র। তিনি জামালপুর রিক্রিয়েশন ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ। মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় ছানুরও প্রভাব ছিল জেলা জুড়ে। দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকার পর সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা মির্জা আজমের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় জ্যেষ্ঠ সব নেতাকে টপকিয়ে হয়ে যান পৌরসভার মেয়র। এরপর থেকেই তিনি মির্জা আজমকে ঠাকুর বলে সম্বোধন করেন। আর সেই ঠাকুরকে সন্তুষ্ট করতেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ক্লাব গড়তে পৌরসভা থেকে দিয়েছেন একের পর এক প্রকল্প। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই জেলা পরিষদও। জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ক্লাবের মূল ফটক।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে জেলা প্রশাসন ১ একর ৪৬ শতাংশ জমি পৌরসভাকে দেয়। সেই জমিতে ১৯৯৫ সালে ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশন গড়ে তোলা হয়। পরে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ও সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য ২০০৯ সালে জেলা প্রশাসন পলাশগড় মৌজায় ২ একর ৮৫ শতাংশ ও সিংহজানী মৌজায় আরও সাড়ে ৩১ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করে পৌরসভাকে দেয়। এতে পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশনের জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ একর সাড়ে ৬২ শতাংশে। সেই জমির ওপর ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশনের জন্য ছাউনি তৈরি করা হয়। ওই ভাগাড়ের উত্তর পাশ দিয়ে পলাশগড় এলাকার লোকালয় পর্যন্ত চলাচলের রাস্তা নির্মাণ করা হয়। দেওয়ানগঞ্জ বাইপাস সড়ক হওয়ার পরে ওই ভাগাড়ে নজর পড়ে মির্জা আজমের। পরিকল্পনা হাতে নেন সেখানে ভিআইপিদের বিনোদন ক্লাব গড়ার। তারপর ২০২০ সালে তৎকালীন মেয়র তার (মির্জা আজমের) চাচা মির্জা সাখাওয়াতুল আলম মনির মাধ্যমে পৌরসভার মালিকানাধীন অধিগ্রহণকৃত জমিতে নিজস্ব (পৌরসভার) উদ্যোগে সর্বসাধারণের সুস্থ চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা ও ব্যায়ামের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অনুমোদন নেন। ওই বছরই সেই জমি ইজারার জন্য পৌর কর্র্তৃপক্ষ দরপত্র আহ্বান করে। এতে অংশ নেয় সাবেক মেয়র মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানুর মেসার্স মাসুম অ্যান্ড ব্রাদার্স, আয়ান এন্টারপ্রাইজ ও জামালপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব। রিক্রিয়েশন ক্লাব সর্বোচ্চ দরদাতা হয় এবং ২০ বছরের জন্য ৩ একর সাড়ে ১৬ শতাংশ জমি ইজারা পায়। ২০২১ সালে ডাম্পিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে শহরের ময়লা ফেলার জন্য ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২২ সালে ১০ একর জমিতে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের কম্পপুর এলাকায় স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ডাম্পিং স্টেশনের জমি ইজারা দেওয়ার পর মির্জা আজমকে সন্তুষ্ট করতে ২০২১-২২ অর্থবছরে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেওয়ানগঞ্জ বাইপাস থেকে পলাশগড় পর্যন্ত সড়ক, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেন মেয়র ছানু, যা বাস্তবায়নে ২ কোটি ৯০ লাখ ৩১ হাজার ৭৬৪ টাকায় এসআরএস কনস্ট্রাকশন এবং উজ্জল এন্টারপ্রাইজের (জেভি) সঙ্গে চুক্তি হয়। এ ছাড়া নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেওয়ানগঞ্জ বাইপাস থেকে পলাশগড় মোড় পর্যন্ত ৮৫০ মিটার ডিবিসির উন্নয়ন সড়ক এবং দেওয়ানগঞ্জ বাইপাস থেকে পলাশগড় মোড় পর্যন্ত ১৫০ মিটার আরসিসি উন্নত সড়ক নির্মাণের আরেকটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫২ টাকায় মেসার্স উজ্জল এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রকৃতপক্ষে এসব প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা রিক্রিয়েশন ক্লাবের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। প্রকল্পের টাকায় ক্লাবের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ১২ ফুট উচ্চতার সীমানাপ্রাচীর তোলা হয়। এতে ছয় গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তা বন্ধের বিষয়ে প্রতিবাদ করলে মেয়র ছানু সন্ত্রাসীদের দিয়ে নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ তুলেছে এলাকাবাসী। তারা বলছেন, ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা মির্জা আজমের নির্দেশে এসব কাজ করেছেন সাবেক মেয়র মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানু। মির্জা আজমের ভাতিজির জামাই (স্ত্রীর ভাতিজির স্বামী) ও ডান হাত হিসেবেই সবাই চিনতেন তাকে।
এই ক্লাবের সদস্য হতে মাথাপিছু গুনতে হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা। আর উদ্বোধনের পরে সদস্য ফির সেই টাকার পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় সাত লাখে। এ ছাড়া সদস্যদের মাসিক চাঁদা দিতে হয় এক হাজার টাকা করে। মির্জা আজমকে খুশি করতে দলের অনেক নেতাকর্মী পাঁচ বা সাত লাখ টাকা দিয়ে সদস্য হয়েছেন এই ক্লাবের। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই সদস্যদের আয়ের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এ প্রসঙ্গে জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘যারা লাখ লাখ টাকা দিয়ে ওই ক্লাবের সদস্য হয়েছেন, তাদের আয়ের উৎস ও সম্পদের পরিমাণ জানা প্রয়োজন। তাদের সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখার দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্লাবটি ১২ ফুট উঁচু সীমানাপ্রাচীর তুলে সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করেছে। এতে ৬ গ্রামের ২০ হাজার মানুষের চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাটি বন্ধ হওয়ায় এখন দেড় কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করতে হয়। ওই ক্লাবে বসত মদ আর হাউজির আসর। এসব বন্ধ করে রাস্তাটি খুলে দেওয়াসহ সেখানে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
পৌর শহরের পলাশগড় এলাকার মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘রাস্তা বন্ধ করে প্রাচীর করার সময় আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। মেয়র ছানু সন্ত্রাসী দিয়ে আমাকে পৌরসভায় তুলে নিয়ে মারধর করেছেন। রাস্তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করা হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন মেয়র।’
একই এলাকার আপেল মাহমুদ বলেন, ‘বন্ধ হওয়া ওই রাস্তা দিয়ে ছয় গ্রামের মানুষ চলাচল করত। রিক্রিয়েশন ক্লাব করার সময় রাস্তার ওপর প্রাচীর করা হয়। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষের দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। কৃষকরা ফসল নিয়ে যেত। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনগণ যাতায়াত করত। এখন প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয়। আমাদের চলাচলের রাস্তাটি খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি করছি।’
জামালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, ‘ওই ক্লাবের সঙ্গে পৌরসভার বা জনগণের কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা নেই। সেখানে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। ক্লাবের কার্যকরী কমিটিতে শহরের অত্যন্ত প্রভাবশালীরা রয়েছেন। তাদের স্বার্থেই ক্লাবটি হয়েছে। পৌরসভা এভাবে জায়গাটি দিতে পারে না। আর পৌরসভার প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা ক্লাবের উন্নয়নে ব্যয় অযৌক্তিক।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও জামালপুর পৌরসভার প্রশাসক শীতেষ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে নিয়ে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
জামালপুর রিক্রিয়শন ক্লাব ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এ ক্লাবের সদস্যসংখ্যা ৪৬৯ জন। গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ক্লাবটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে ক্লাবের প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
