সংস্কারে সঙ্গী হবে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:৫৩ এএম

দেশ পুনর্গঠন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা এবং চুরি যাওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এখন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় এবং দেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ সহায়তা চান।

পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

২০০৬ সালে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, তার প্রশাসন অর্থনীতিকে ‘পুনর্গঠন, সংস্কার ও পুনরায় সচল করতে’ দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক খাতে সংস্কার এবং বিচার বিভাগ ও পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় এবং আমাদের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত।’

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিপ্লবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন আশার যুগের সূচনা করেছে।

অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে, যা ভোটে কারচুপি প্রতিরোধ, বিচার বিভাগ, পুলিশ, প্রশাসন, দেশের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধনের কাজ করছে।’

তিনি বলেন, পূর্ববর্তী ‘স্বৈরশাসনের’ সঙ্গে যুক্ত ‘দুর্নীতিবাজদের’ চুরি করা সম্পদ তার সরকার ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

দুর্নীতি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা দুর্নীতির এক বিশাল সমুদ্রে ছিলাম।’

যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ দপ্তরের আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল ড. ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং তার সংস্কার পরিকল্পনায় ওয়াশিংটন সমর্থন করতে পেরে আনন্দিত বলেও জানান।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, তারা অন্তর্র্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা দিতে আগ্রহী।

ঘণ্টাব্যাপী চলা বৈঠকে বাংলাদেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ, শ্রমবিষয়ক, রোহিঙ্গা সংকট এবং প্রধান উপদেষ্টার জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের জন্য আসন্ন নিউ ইয়র্ক সফর নিয়েও আলোচনা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলে ছিলেন দেশটির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু, সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চ, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার (ইউএসএআইডি) উপসহকারী প্রশাসক অঞ্জলি কাউর এবং ট্রেজারি বিভাগের পরিচালক জেরোড ম্যাসন।

বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, সিনিয়র সচিব ও এসডিজিবিষয়ক প্রধান লামিয়া মোরশেদ, পররাষ্ট্র সচিব মো. জসিম উদ্দিন এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র : ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঢাকা সফররত মার্কিন প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর দেশটির দূতাবাসের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা হয়, বাংলাদেশ যে ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে, সেই প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।

পোস্টে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠান গঠন ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন আমাদের প্রতিনিধিদল।

আর্থিক-প্রাতিষ্ঠানিক, মানবাধিকার ও জলবায়ু ইস্যুতে সহায়তার আশ্বাস : সফররত যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

মার্কিন দূতাবাস বলেছে, ‘আমরা আমাদের অংশীদার বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা, মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং জলবায়ু ঝুঁকি কমিয়ে আনতে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং মার্কিন প্রতিনিধিদলের মধ্যে বৈঠক শেষে দূতাবাস তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এ কথা জানায়। মার্কিন দূতাবাস পদ্মা হাউজে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিকে দারুণ বলে উল্লেখ করেছে।

‘বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র’ : মধ্যাহ্নভোজসভার পর পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি বিশেষ অগ্রাধিকারে রয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংস্কার নিয়ে সরকারের ধারণা ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এতে যুক্ত হতে পারে, তা নিয়ে ঢাকা সফররত মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাধারণ আলোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ দপ্তরের সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেগুলোর বিষয়ে প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়েছে। সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা সম্পর্কে তারা জানতে চেয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি এ সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকার বলে তাদের জানানো হয়েছে। আর্থিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রম পরিবেশ, মানবাধিকার সুরক্ষা, রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

কোন কোন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে জসীম উদ্দীন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এক মাসের কিছুটা বেশি। আজ (রবিবার) বৈঠকে পরিবর্তিত যে পরিস্থিতি ও সরকারের সংস্কার বিষয়ে যে ধ্যানধারণা এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, তা নিয়ে সাধারণ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য এ সফর একটি ভিত্তি। সামনে আমরা এ আলোচনা বিভিন্ন পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে যাব।’

পাচার হওয়া টাকা ফেরত নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘আমরা বড় আকারে আর্থিক খাতে সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেছি এবং পাচার হওয়া অর্থসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশেষায়িত জ্ঞান রয়েছে, সেটি হয়তো আমরা ব্যবহার করব, কিন্তু আলাপ-আলোচনা সবে শুরু হয়েছে। এর চূড়ান্ত রূপ পেতে কিছুটা সময় লাগবে।’

জসীম উদ্দীন বলেন, প্রতিনিধিদলের এ সফরে প্রথম যে আশ্বাস, সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করতে চায়। সেটারই প্রতিফলন হিসেবে সরকার গঠনের দ্বিতীয় মাসেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক সংস্কারের যেসব খাত চিহ্নিত করা হয়েছে, তার সবকটি খাতে তারা সার্বিকভাবে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। শ্রম আইন নিয়ে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো তাদের জানানো হয়েছে এবং এ আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকায় আসার আগে দিল্লি সফর করেছেন। এ সফরে ভারত থেকে কোনো বার্তা নিয়ে এসেছেন কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশন আছে এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশন আছে। আমরা যদি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই, এগুলো আমাদের জন্য প্ল্যাটফর্ম।’

গত শনিবার দুই ধাপে ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের ছয় সদস্য। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও প্রধানমন্ত্রীর ভারতে চলে যাওয়ার পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত