ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের পর রাজধানীতে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের সমাবেশ করল বিএনপি। বাধা-বিপত্তিহীন এ সমাবেশ পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। স্বস্তির বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে। সমাবেশে আসা দলটির নেতাকর্মীরা জানান, আগে সমাবেশে আসতে পথে পথে বাধার সম্মুখীন হতে হতো। অনেক সময় হামলার শিকারও হতেন। সমাবেশস্থল থেকে কিংবা আসা-যাওয়ার পথ থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কা থাকত। আজ সেই ভয় নেই। সমাবেশে বাধাহীন আসতে-ফিরতে পারছেন। নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আতঙ্ক। নিজ বাসাবাড়িতে শান্তিতে ঘুমাতে পারছেন, মন খুলে কথা বলতে পারছেন। দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা উপভোগ করছেন।
সরেজমিনে সমাবেশস্থলে দেখা যায়, অনেকটাই বদলে গেছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশের পরিবেশ। গত এক দশক ধরে কার্যালয় ঘিরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিত লক্ষ করা যেত। সেই দৃশ্যটি চোখে পড়েনি। ছিল না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কোনো উপস্থিতি, ছিল না রায়ট কার বা প্রিজনভ্যান। গোয়েন্দাদের কার্যক্রমও চোখে পড়েনি। বরং সমাবেশস্থলের পুরো এলাকা জুড়ে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন শোভা পেতে দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংখ্য মানুষের পদচারণায় নয়াপল্টন হয়েছে জনসমুদ্র। নেতাকর্মীদের মধ্যেও ছিল বিজয়ের উত্তেজনা। প্রাণ-মন খুলে কথা বলেছেন তারা।
মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রিন্স নাদিম বলেন, ‘নিজ জেলা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে নয়াপল্টনের সমাবেশে আসতে অন্তত চার থেকে পাঁচ জায়গায় তল্লাশির মুখোমুখি হতে হতো। কেরানীগঞ্জ টোল প্লাজা, পোস্তগোলা, গুলিস্তান হয়ে সমাবেশস্থলের প্রবেশমুখে যেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাধার মুখ পেরিয়ে আসতে হতো। অনেকটা যুদ্ধ জয়ের মতো। আজ (গতকাল) বাধাহীন ছিলাম। বরং জেলা থেকে মিছিল করে এসেছি।’
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে আসা কর্মী অহিদুল বলেন, ‘নানা বাধা পেরিয়ে সমাবেশে অংশ নিয়ে বাড়ি ফিরেও আতঙ্কে থাকতে হতো। এই বুঝি ক্ষমতাসীন দলের হামলার ও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হলো। ৫ তারিখের পর থেকে শান্তিতে আছি।’
এর আগে গত ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সমাবেশ করেছিল বিএনপি। এরপর গতকাল আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির দ্বিতীয় সমাবেশ করল দলটি। যেখানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দুপুর আড়াইটায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা বিএনপি এবং এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী খ- খ- মিছিল নিয়ে আসতে থাকেন। রাজধানীর আশপাশের জেলা থেকেও উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মী অংশ নেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগীয় শহর থেকে নেতাকর্মীরা এ কর্মসূচিতে যোগ দেন।
সরেজমিন দেখা যায়, আগত নেতাকর্মীদের হাতে ছিল দলীয় ও জাতীয় পতাকা, ব্যানার এবং ফেস্টুন। ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদলসহ দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হলুদ, লাল রঙের ক্যাপ পরে অংশ নেন। সমাবেশে আসা নেতাকর্মীদের সেøাগানে সেøাগানে প্রকম্পিত ছিল পুরো নয়াপল্টন এলাকা। কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়। দুপুর আড়াইটায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশের কাজ শুরু হওয়ার আগে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন।
দুপুর আড়াইটার দিকে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে গণসমাবেশ শুরু হলে শুরুতে বক্তব্য রাখেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরাসহ সিনিয়র নেতারা বক্তব্য দেন। সমাবেশ যৌথভাবে সঞ্চালনা করছেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সদস্য সচিব আমিনুল হক এবং তানভীর আহমেদ রবিন।
সরেজমিন আরও দেখা যায়, তীব্র রোদ উপেক্ষা করে একের পর এক মিছিলে থাকা নেতাকর্মীদের ঢল নয়াপল্টন ছাড়িয়ে কাকরাইল, মালিবাগ, শান্তিনগর, বিজয়নগর, ফকিরাপুল, আরামবাগ এলাকা ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে ছিল বিজয়ের উল্লাস। দলের চেয়ারপারসনের সুস্থতা ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফিরে আসার জন্য কাউকে কাউকে মোনাজাত করতেও দেখা যায়।
তবে সমাবেশে আসা নেতাকর্মীরা কাকরাইল থেকে ফকিরাপুলমুখী সড়কের উভয় অংশে অবস্থান নেওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আশপাশ এলাকায়ও ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হতে দেখা যায়।
গত রবিবার সমাবেশটি হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছিল বিএনপি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দুদিন পিছিয়ে সমাবেশের তারিখ গতকাল মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) পুনর্র্নির্ধারণ করা হয়।
