পরিবর্তনের হাওয়ায় প্রাপ্তি ১৫ লাখ কোটি

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:০২ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই বছর ধরেই নিম্নগামী। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় কমে যাওয়া, অর্থ পাচার প্রভৃতি কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থছাড়ে গড়িমসি করেছিল। ৫ আগস্টের পর এ চিত্র পাল্টে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্য উন্নয়ন সহযোগীরা তো আছেই, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগীরা ইতিমধ্যে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশ যে সংকটে আছে, তা দ্রুতই কেটে যাবে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।

নতুন সরকার গঠনের পর উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ড. ইউনূস সরকারকে সবচেয়ে বেশি ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে জুম প্ল্যাটফর্মে একটি বৈঠক হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারত, চীন প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনাররাও অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এক মাসেরও কম সময়ে তারা মোট ১ হাজার ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ খুব দ্রুত পাওয়ার আশ্বাসও মিলেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ এমনিতেই অনেক বেশি হয়েছে। যদিও জিডিপির তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে বর্তমান সংকটে আরও বেশি বিদেশি মুদ্রা প্রয়োজন। এখন প্রকল্প ঋণের চেয়ে নগদ সহায়তায়ই বেশি দরকার।

বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ ১০৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। রিজার্ভের নিরাপত্তায় বিদেশি মুদ্রা আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় দিয়ে সেটি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো বিদেশি ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছিল। এরপর চলতি বছর মার্চে তা কিছু কমলেও তিন মাসের ব্যবধানে ঋণসহায়তা সব রেকর্ড ভেঙেছে।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বিদেশি ঋণ এখন পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না বাড়েনি বলে বিদেশি মুদ্রা ব্যবহারে বাংলাদেশকে এখন সংকোচনমূলক নীতিতে চলতে হচ্ছে।

প্রতিশ্রুত ঋণের কিছু অংশ ডিসেম্বরের মধ্যে এলেও বাংলাদেশের নিম্নগামী বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা সচল হওয়ার আশা আছে। এক মাস আগেও উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণপ্রতিশ্রুতি ছিল মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

২০০৬-০৭ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বিদেশি ঋণ ছিল ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ। গত আওয়ামী লীগ সরকার ভিত্তিবছর পরিবর্তন করায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঋণের অনুপাত নেমে আসে ১০ দশমিক ১ শতাংশে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়। বাংলাদেশ সরকার বিদেশি ঋণ বাড়ার জন্য টাকার অবমূল্যায়নকে দায়ী করছে। তবু ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো বিপজ্জনক পর্যায়ে যায়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের সুদহার ছিল সর্বোচ্চ ১ শতাংশ, ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সেটি বেড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হবে।

বিদেশি সহযোগীদের হঠাৎ এত প্রতিশ্রুতি আমাদের অর্থনীতিকে কীভাবে সহায়তা করবে এমন প্রশ্নে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমাদের প্রচুর বকেয়া বিল বিদেশি মুদ্রায় পড়ে আছে। আবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু পণ্যের সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এলএনজি, ফার্টিলাইজারে আমাদের প্রচুর বকেয়া রয়েছে। বিদ্যুতের বকেয়াই ২০০ কোটি ডলার, ফার্টিলাইজারের বকেয়া ১০০ কোটির কাছাকাছি, ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি এলসির নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে আমাদের এখন নগদ সহায়তা খুব দরকার।’

তিনি বলেন, ‘এ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক ২০০ কোটি ডলার দেবে। ধারণা করছি, এতে প্রকল্পসহায়তাও আছে। বাজেট সহায়তা হিসেবে আর্থিক সংস্কারের জন্য ৭৫০ কোটি ডলার সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য যদি আরেকটি বাজেট সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে সেটি অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং আমদানি না করতে পারার কারণে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাবে। আমরা যদি ভালো প্রকল্প তৈরি করতে না পারি, তাহলে এ সহায়তা গলার কাঁটা হয়ে যায়। উদাহরণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্প শেষ না করে পিছু হটার রাস্তা নেই।’

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রাইজার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গত বুধবার পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছেন, বিশ^ব্যাংক আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেবে। এ টাকা বিভিন্ন প্রকল্পের পাইপলাইনে ছিল। তারা সেটি প্রকল্পে না দিয়ে বাজেট সহায়তা হিসেবে দিতে আগ্রহী।

নতুন সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে জ্বালানি খাতে খরচের জন্য বাজেট সহায়তা চেয়েছে। প্রায় ১০০ কোটি ডলার চেয়ে তাদের চিঠি দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এ ছাড়া আর্থিক খাত সংস্কারে বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা দিতে পারে বিশ্বব্যাংক। এ ঋণ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের পর্ষদে অনুমোদিত হওয়ার কথা। তবে ঋণ পেতে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, আন্তর্জাতিক মানদন্ডে খেলাপি ঋণের নতুন সংজ্ঞায়ন ও নবগঠিত টাস্কফোর্সের নিরীক্ষা কার্যক্রমের বিবরণী বিশ্বব্যাংককে দিতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে, আগামী এক-দুই বছর পর তা পরিশোধের চাপ বাড়বে। এসব ঋণকে বাণিজ্যিক বলা যায়, কারণ এসবের সুদহার বেশি এবং পরিশোধের সময়ও কম। যদিও আমাদের জিডিপি ও বিদেশি ঋণের অনুপাত খুব বেশি নয়; সমস্যা হচ্ছে, ঋণ পরিশোধ করার জন্য যে বিদেশি মুদ্রা দরকার, তার সংস্থান করা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আমাদের রিজার্ভ তেমন বাড়ছে না, রপ্তানি আয়ও বাড়ছে না। অথচ বিভিন্ন প্রকল্পে বিদেশি ঋণের দায়ভার আরও বাড়বে। বিদেশি মুদ্রার অর্জন যদি বেশি না হয়, রপ্তানি আয় দ্রুত না বাড়ে তাহলে সমস্যা আরও বাড়বে। নতুন সরকারকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে।’

গত রবিবার সচিবালয়ে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর এডিমন গিনটিংয়ের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থ উপদেষ্টা। জানা গেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে বাজেট সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে এডিবি। সংস্থাটি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি খাতে সংস্কারের জন্য দেবে ৫০ কোটি ডলার। এটা মিলবে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে। জ্বালানি খাতের উন্নয়নেও এডিবির কাছে ১০০ কোটি ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ। সংস্থাটি চলমান প্রকল্পগুলোও অব্যাহত রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে ২০ কোটি ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিচ্ছে। রবিবার সে দেশের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। স্বাস্থ্য, সুশাসন, মানবিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এ অর্থ কাজে লাগানো হবে।

আইএমএফের কাছ থেকে বাড়তি ৩০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী সরকার। আইএমএফের আবাসিক প্রতিনিধি জয়েন্দু দের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠকের পর অর্থ উপদেষ্টা ১ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের জানান, এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আগামী মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠেয় আইএমএফের বার্ষিক সাধারণ সভায় এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা হবে।

যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন ও জাপানের কাছ থেকে বাড়তি বৈদেশিক সাহায্যের আশ^াস না মিললেও অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে তারা আগ্রহী এবং চলমান বিভিন্ন প্রকল্প চলবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত